ডাক্তারের স্টেথোস্কোপ ছেড়ে সিনেমার প্রেমে পড়লেন শুভেন্দু

সন্তান যদি ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার না হতে পারে, তাহলে আর পড়াশোনা করে কী লাভ! অনেক বাবা-মায়ের হয়তো লজ্জায় মাথা কাটা যাওয়ার জোগাড়। ঠিক এমন অবস্থাতেই বিশ শতকের ছয়ের দশকে ডাক্তারি পেশাকে সারাজীবনের জন্য বিসর্জন দিয়ে অভিনয়ের জগতে চলে আসা মানুষটি শেষ পর্যন্ত কী পেলেন, তা বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শক ভালোমতোই জানেন। আজ যখন আমরা প্রতিবছর শিল্পীদের জন্মদিন বা মৃত্যুদিন পালন করি বিভিন্ন মঞ্চে অনুষ্ঠান করে বা বিভিন্ন লেখায় স্মরণ করে, তখন একবারের জন্যেও শিল্পীর কাজের সময়টা নিয়ে ভাবি না। তিনি শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়। ডাক্তারি নিয়ে পড়াশোনা করলেও রূপোলি পর্দার প্রতি তাঁর টান ছোটো থেকেই।
১৯৬০ সালে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করেন শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়। তারপর সিভিল ডিফেন্স এবং কলকাতা পুরসভায় স্বাস্থ্যদপ্তরে চাকরি শুরু করেন। কিন্তু বেশিদিন মন টেকেনি। তখনই পরিচয় হয় প্রখ্যাত অভিনেতা জ্ঞানেশ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। আইপিটিএ আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন পরবর্তীকালে। থিয়েটার করে গেছেন বহু বহু বছর।
আরও পড়ুন: ৫০ বছরে সত্যজিৎ রায়ের ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’
১৯৬৫ সালে মৃণাল সেনের ‘আকাশ কুসুম’ ছবিতে প্রথমবারের জন্য অভিনয় করেন। সেখানে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও অপর্ণা সেনের পাশাপাশি নজর কাড়েন শুভেন্দু। ১৯৬৭ সালেই সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে কাজ। ‘চিড়িয়াখানা’ ছবিতে সেই প্রথমবার উত্তমকুমার এবং সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ এল। ১৯৬৮ সালে ‘চৌরঙ্গী’র সেই বিখ্যাত চরিত্র শংকর। আবার স্যাটা বোস উত্তমকুমারের সঙ্গে দুর্ধর্ষ কাজ। তারপর এক এক করে ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, ‘ছদ্মবেশি’, ‘কোরাস’, ‘গণশত্রু’, ‘লাল দরজা’, ‘দহন’, ‘আবার অরণ্যে’-এর মতো কালজয়ী ছবিতে অভিনয় করেন শুভেন্দু। ২০০৩ সাল অবধি চুটিয়ে কাজ করে গেছেন। কিন্তু ঠিকঠাক মূল্য পেয়েছেন কি! কালের স্রোতে ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে তাঁর নাম। আজ শুধুমাত্র বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শক ক’জনই বা মনে রেখেছেন শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের নাম! ইন্ডাস্ট্রিতে তিনি ‘দ্য গ্রেট ডক্টর’। লাইট ক্যামেরা অ্যাকশন কিংবা গলায় স্টেথোস্কোপ – শুভেন্দু থাকবেন শুভেন্দুতেই। আজ অভিনেতার মৃত্যুদিবস।
শুভেন্দু-পুত্র শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় স্মৃতিচারণায় লিখেছেন, “বাবা ডাক্তারি পড়েছিলেন দাদু চেয়েছিলেন বলে। পড়ার পাশাপাশি কিন্তু সমান ভাবে আইপিটিএ-তে অভিনয় করে গিয়েছেন। ফলে, বাবা আচমকা অভিনয়ে এসেছেন এটা বোধহয় বলা যায় না। বরং, তিনি দাদুর কথাও রেখেছিলেন, আবার নিজের স্বপ্নও পূরণ করেছিলেন, এটা বলা যেতে পারে।...এখন কারও হাতে সময় নেই। ফলে, আড্ডা নেই। কারও দিকে কারও চেয়ে দেখার সময়ই নেই। কে, কাকে এমন স্নেহমিশ্রিত শাসন করবে?”
উত্তম-সৌমিত্রদের সেই যুগেও শুভেন্দুর মহিলা ভক্তের সংখ্যা ছিল অসংখ্য। তার কারণ অবশ্যই দাপুটে সব অভিনেতাদের ভিড়ে স্বতন্ত্র অভিনয়ে সকলের মন জয় করতে পেরেছিলেন শুভেন্দু। এইসকল অভিনেতাদের আমরা কেউ যেন ভুলে না যাই।