এ দেশে পেশাদারি ফটোগ্রাফির স্রষ্টা তিনিই, বিস্মৃতির অতলে লক্ষ্মীনারায়ণ রায়চৌধুরী

“একটু সোজা তাকান, মুখটা তুলুন, এবার একটু হাসুন, হ্যাঁ হ্যাঁ পারফেক্ট” বলেই শাটারের ‘খিছিক’ শব্দ। আর সঙ্গে সঙ্গে আপনি বন্দি হয়ে গেলেন চারচৌকো ফ্রেমে। আর যিনি বন্দি করলেন, তিনি? তাঁর নামটাও আজকে আমাদের খুবই পরিচিত, তিনি হলেন ফটোগ্রাফার। ঘুরতে যাওয়া থেকে বিয়েবাড়ি, জন্মদিন থেকে উৎসব, আমাদের ফেলে রাখা মুহূর্তরা প্রতিনিয়ত বন্দি হয় তাঁদের হাতযশেই।
আজকাল কথায় কথায় আমরা ফোন করে ডেট নিই তাদের, কিংবা বুকিং দিই অনুষ্ঠানের। আর পেশার তাগিদে তাঁরাও ব্যাগপত্র, যন্ত্রপাতি গুছিয়ে নেমে পড়েন কাজে। কিন্তু এই পেশাদারি ছবি তোলার শুরুটা ঠিক কোথায়? সে খবর ঘাঁটতে ঘাঁটতে চোখ পড়ে এক অন্যরকম ইতিহাসে। ভারতে প্রথম এই পেশাদারি আলোকচিত্রীর শুরুটা হয় এক বঙ্গ সন্তানের হাত ধরেই। ১৮৬৬ সালের ১১ জানুয়ারি, জন্মগ্রহণ করেন আলোকচিত্রের সেই জাদুকর। বাঙালির ইতিহাসের অনন্য নাম লক্ষ্মীনারায়ণ রায়চৌধুরী, হাংরি আন্দোলনের পরিচিত মুখ মলয় রায়চৌধুরীর দাদু। দাদুর স্মৃতিচারণে আক্ষেপের সুর ফুটে উঠেছে লেখকের কলমে, “এখন পূর্বপুরুষ ফটোগ্রাফারদের কথা বলতে গিয়ে স্মৃতির মিউজিয়াম ঘাঁটা ছাড়া উপায় বা কি!” কিন্তু যে স্মৃতির ছাই ঘাঁটলে অমূল্য রতনের খোঁজ মেলে, তা ঘাঁটতে তো ক্ষতি নেই। বরং একরাশ তৃপ্তি আছে। তাই, আসুন না ফিরে দেখি সময়টা।
ভারতে তখনও রমরমিয়ে চলছে ব্রিটিশ জমানা। কলকাতার সাবর্ণ রায়চৌধুরী বংশের উত্তরপাড়া কোতরং শাখার রত্নেশ্বর রায়চৌধুরীর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন লক্ষ্মীনারায়ণ রায়চৌধুরী। পিতা যদুনাথ রায়চৌধুরী এবং মাতা মাতঙ্গিনীদেবীর কনিষ্ঠ পুত্র ছিলেন লক্ষীনারায়ণ। মাত্র ষোলো বছর বয়সে কলকাতার পটুয়াটুলি নিবাসী মুখোপাধ্যায় পরিবারের অপূর্বময়ীর সঙ্গে বিবাহ হয় লক্ষ্মীনারাণের। এই বিবাহসূত্রেই লক্ষ্মীনারায়ণ, কলকাতার তদানীন্তন বুদ্ধিজীবী সমাজের সদস্যদের সঙ্গে পরিচিত হন। আর এখানেই তাঁর প্রথম হাতেখড়ি হয় আঁকার খাতায়। রং, তুলি আর ছবির প্রতি যে অকৃত্রিম টান ছিল তাঁর, তার সূত্রপাত এখান থেকেই।
পরবর্তীকালে তিনি কলকাতায় ব্রিটিশদের সঙ্গে দেখা করতে আসা বাহওয়ালপুরের আমিরের এক প্রতিনিধির মাধ্যমে ওই রাজ্যের রাজপরিবারের সদস্যদের ছবি আঁকার জন্য আমন্ত্রণ পান। তাঁর কাজের জাদুতে খুশি হয়ে তাঁকে প্রশংসাপত্রও প্রদান করে রাজপরিবার। শুরু হয় তাঁর পেশাদারি ছবি আঁকার যাত্রাপথ। মলয় রায়চৌধুরীর আত্মজীবনী থেকে জানা যায়, বাহওয়ালপুরের সেই সময়ের দুটি ডাকটিকিটের প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন লক্ষ্মীনারায়ণ। তাঁর কাজের জাদুকাঠিতে আফগানিস্তানের রাজপরিবারের সদস্যদের ছবি আঁকার জন্যও আমন্ত্রণ পান। বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি আরবি আর পার্শি ভাষাতেও সমান সাবলীল ছিলেন তিনি। ফলে দেশান্তরের পথে খানিক বাড়তি সুবিধা ছিল তাঁর ঝুলিতে।
পরবর্তী জীবনে লাহোরে মেয়ো কলেজ অফ আর্টসের অধ্যক্ষ হন এবং সাহিত্যিক রুডইয়ার্ড কিপলিং-এর বাবা জন উড কিপলিং-এর স্টুডিওতে কাজ করার সুযোগ পান। এই সময় থেকে ফটোগ্রাফির প্রতি ঝোঁক বাড়ে তাঁর। শিখতে শুরু করেন প্রথাগত ফটোগ্রাফি। ১৮৮০ সাল নাগাদ নতুন বেলোলেন্স ক্যামেরার আবির্ভাব ঘটে। এ ধরনের ক্যামেরায় ফোটোগ্রাফির জন্য প্রথম ডার্করুমের প্রয়োজন পড়ে। এরপর ১৮৮৬ সালে লক্ষ্মীনারায়ণ একটি বেলোলেন্স ক্যামেরা এবং ছবি তোলার সব সরঞ্জাম কিনে বাড়িতেই একটি ছোটো ঘরকে ডার্করুম হিসাবে ব্যবহার করে কাজ শুরু করেন। লাহোর শহরেই শুরু হয় ফটোগ্রাফির স্থায়ী ব্যবসা। নতুন সংস্থার নাম রাখেন, ‘রায়চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি – ফটোগ্রাফার অ্যান্ড আর্টিস্টস’। বাঙালির তৈরি প্রথম ফটোগ্রাফির ব্যবসা হয় এটি। নিজের ছেলেদের হাত ধরে আলো আর লেন্সের দুনিয়ায় দাপিয়ে বেড়াতে লাগলেন এই বাঙালি। আর্থিক স্বচ্ছলতার অভাবে প্রথমে নির্দিষ্ট দোকান করতে পারেননি লক্ষ্মীনারায়ণ। যেসব রাজপরিবারের সদস্য এবং ধনী ব্যক্তিরা ছবি তোলাতে চাইতেন, তিনি তাদের বাড়ি গিয়ে গিয়ে ছবি তুলে আসতেন। মুখাকৃতি থেকে তৈলচিত্র তৈরি করে দেওয়ার কাজে ইতিমধ্যেই নিযুক্ত ছিলেন তিনি। ফলে রাজপরিবারের সদস্যদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা শিল্পীর সামনে বসে থাকতে হত। সেকারণে তারা বিরক্ত হতেন। এমনকি পর্দাপ্রথার কারণে রাজপরিবারগুলিতে মহিলা সদস্যদের তৈলচিত্র আঁকতে লক্ষ্মীনারায়ণের অসুবিধা হতো। কিন্তু হাতে ক্যামেরা এসে গিয়ে সেই জটিলতা কমিয়ে দেয়। এরপর থেকে লক্ষীনারায়ণ তাদের ছবি তুলে এনে তা দেখে ছবি এঁকে দিতে আরম্ভ করেন।
লক্ষ্মীনারায়ণ রায়চৌধুরী একটি বেলোলেন্স ক্যামেরা এবং ছবি তোলার সব সরঞ্জাম কিনে বাড়িতেই একটি ছোটো ঘরকে ডার্করুম হিসাবে ব্যবহার করে কাজ শুরু করেন। লাহোর শহরেই শুরু হয় ফটোগ্রাফির স্থায়ী ব্যবসা।
স্ত্রী, ছয় পুত্র এবং এক কন্যা নিয়ে লক্ষ্মীনারায়ণের ছিল ভরপুর সংসার। কাজের সূত্রে ঘুরে ঘুরে বেড়াতে হলেও তিনি ছিলেন আদ্যপান্ত বাঙালি ঘরের ছেলে। কাজের সূত্রে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় থাকতে হয়েছে। কখনও আফগানিস্তানের কাবুল কিংবা কান্দাহারে, আবার কখনও পাকিস্তানের লাহোর, চিত্তরঞ্জন ইত্যাদি জায়গায়। অথচ কোনোদিনই ভুলতে পারেননি শিকড়ের টানকে। এই পিছুটানের তাগিদে প্রতিবছর দুর্গাপুজোয় তিনি দেশের বাড়ি অর্থাৎ উত্তরপাড়ায় ফিরে আসতেন। ছেলে মেয়েদের বিয়েও দিতেন এখানে। এরপর পৈত্রিক সম্পত্তির ভাগ পেলে লাহোরের পাট গুটিয়ে পাকাপাকি ভাবে চলে আসেন উত্তরপাড়ায়। শুরু হয় বাংলার মাটিতে নতুন করে পথ চলা। কিছুদিনের মধ্যেই দ্বারভাঙ্গা মহারাজার আমন্ত্রণে পাটনা যেতে হয় তাঁকে, আর সেখানেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে লক্ষ্মীনারায়ণ ১৯৩৩ সালের ৮ নভেম্বর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
সময়ের হিসেব মেনে চলে যান বাঙালির ফটোগ্রাফির সর্বকালের নায়ক, কিন্তু রেখে যান তাঁর কাজকে। আর বাঙালিকে দিয়ে যান অহংকার করার নতুন হাতিয়ার। রোজগারের নতুন দিশা। আজ প্রায় ৮৭ বছর পেরিয়ে এসে, যখন জেনারেশনের গলায় নানান নতুন মডেলের ক্যামেরা, আর তার মধ্যে রয়েছে নতুন নতুন ফিল্টার, তখন হয়তো রোজনামচা থেকে হারিয়ে গেছে সেই পরিচিত ছবির নায়ক। কিন্তু তাও উত্তরপাড়ার ইতিউতির খোঁজ নিলে আজও সেই নামটা ঠিকই মনে পড়ে যায় বাঙালির। আর ছবিপ্রেমী বাঙালির নস্টালজিয়া হয়ে থেকে যায় আলোকচিত্রের চিত্রকর লক্ষ্মীনারায়ণ রায়চৌধুরী।
তথ্যসূত্রঃ
মলয় রায়চৌধুরী, ছোটোলোকের ছোটোবেলা, চর্চাপদ প্রকাশনী
সমীর রায়চৌধুরী, অপূর্বময়ী স্মৃতি পাঠাগার, কবিতা ক্যাম্পাস