লামাহাট্টা ক্যাফে : মেঘ-পাইনে ঘেরা পূর্ব হিমালয়ে শুদ্ধ স্বাদের খোঁজ

পাঁচদিনের বিশুদ্ধ ছুটি নিয়ে দুই বন্ধুতে পৌঁছে গিয়েছিলাম তিনচুলে। কলকাতাবাসী যখন ৪৩ ডিগ্রি দাবদাহে ক্লান্ত, আমাদের ট্রেন তখন ছুটছে ১২২ কিলোমিটার গতিতে। মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে আসছে শহরের উষ্ণতম দিন। যদিও তিনচুলে পৌঁছে তার ছিটেফোঁটা আঁচও পেলাম না। বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টিপাত আর কনকনে ঠান্ডায় আমরা জুবুথুবু। বিকেলের পর ১২-১৩ ডিগ্রি তাপমাত্রা। গেস্ট হাউসের রাজেন্দ্র ভাই আমাদের দিয়ে গেলেন ধোঁয়া ওঠা দার্জিলিং চা আর পেঁয়াজি। তখনও কোনো পরিকল্পনা ছিল না বাকি দিনগুলো কোথায় যাব, কী করব। দুই রাত তিনচুলেতে থেকে তৃতীয় দিনে প্রাতঃরাশ সারতে গেলাম তিনচুলে থেকে মাত্র আধ ঘণ্টার দূরত্বে লামাহাট্টায়। উদ্দেশ্য, লামাহাট্টা ক্যাফে (Lamahatta Café)। এ প্রসঙ্গে বলে রাখি, লামাহাট্টা ক্যাফের ম্যানেজার আশিস বমনের সঙ্গে পরিচয় কর্মসূত্রে। বঙ্গদর্শন.কম-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মিঃ ইন্দ্রজিৎ সেনের সূত্রেই পরিচয়। তো সেই আশিস হঠাৎই একদিন দুপুরবেলা আমাদের তিনচুলের গেস্টহাউসে দেখা করতে এল। গল্প উঠল জমে। পরদিন লামাহাট্টা ক্যাফেতে সকালের খাবার খেতে যাওয়াটা প্রধান কারণ ছিল না, উদ্দেশ্য ছিল আড্ডা দেওয়া আর যে ক্যাফে আর হোমস্টে (দ্য ওক রিট্রিট/ The Oak Retreat) নিয়ে এত গল্প শুনেছি, তাকে চাক্ষুষ করা। যদিও ক্যাফের টেবিলে খাবার আসতেই এবং তা পেটে যেতেই উদ্দেশ্য-বিধেয় একাকার হয়ে গেল। সে খাবারের স্বাদ তুলনাহীন।
ক্যাফের ভিতর থেকে বাইরের দৃশ্য
এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, দার্জিলিং থেকে কালিম্পং (তিনচুলে, তাকদা এবং পার্শ্ববর্তী এলাকাও) রোডের সর্বপ্রথম চালু হওয়া এই লামাহাট্টা ক্যাফে। সেখানে হোমস্টে বা গেস্টহাউস বা রেস্তরাঁর ধারণা থাকলেও আদ্যোপান্ত ক্যাফে এই প্রথম। পেশক রোডের (তিস্তা থেকে জোড়বাংলো) উপর লামাহাট্টা ক্যাফে শুরু হয়েছে ২০২২ সালের অক্টোবর মাস থেকে। নেপালি, কন্টিনেন্টাল, চাইনিজ, ইংলিশ-সহ শুদ্ধ স্বাদে-গুণে ভরপুর খাবার এই ক্যাফেটির প্রধান বৈশিষ্ট্য।
লামাহাট্টা ক্যাফের মেনুকার্ড
নেপালি থালি
২০১২ সালের আগে লামাহাট্টাকে কেউ চিনত না। প্রকৃতির অসাধারণ সৌন্দর্য ধীরে ধীরে মন কাড়ে পর্যটকদের। পরিণত হয় উত্তরবঙ্গের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্রে। নির্মিত হয় লামাহাট্টার ইকো-ট্যুরিজম পার্ক। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫,৭০০ ফুট উঁচুতে পূর্ব হিমালয়ের কোলে শান্ত নিরিবিলি গ্রাম লামাহাট্টা। দার্জিলিং থেকে যার দূরত্ব ২৩ কিলোমিটার।
লামাহাট্টা ক্যাফেতে ইংলিশ ব্রেকফাস্ট খাওয়ার অভিজ্ঞতা একেবারেই অন্যরকম। নাগালে পাইন বন আর টেবিলে গরম ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ। সঙ্গে সসেজ, হ্যাশ ব্রাউন, সানি সাইড আপ পোচড এগ, বেকড বিনস, রোস্টেড টম্যাটো দিয়ে সকালটা শুরু হল। এই ক্যাফের বিশেষত্ব হল ব্যবহৃত ব্রেড তাঁরা নিজেরাই বেক করে থাকেন। মেঘের মধ্যে বসে গরম ব্রেডে কামড় দিলেই মন ভরে যায়। লামাহাট্টা ক্যাফেতে গেলে ব্রাউনি খেতে হবেই। এটাও তাঁদের নিজেদের বেক করা। চকলেট সিরাপ মাখা এই ব্রাউনি মুখে দিলেই একদম গলে যায়। আশিস আমাদের একটা বিশেষ চিজকেক খাওয়ালেন, যার মধ্যে চিজই নেই! টকদই, লেবু, কুকিজ, চিজস্প্রেড সহযোগে তৈরি এই পালকের মতো নরম চিজকেক। অন্যান্য চিজকেকের মতো তৈলাক্ত নয়, উপরন্তু জিভে লেবুর স্বাদ লেগে থাকে। খাস কলকাতার খুব কম জায়গাতেই লামাহাট্টা ক্যাফের মতো এত সুন্দর ব্রাউনি আমরা পেয়েছি, আর তাদের চিজ কেক তো অভূতপূর্ব! তার উপর খাবারের দাম কলকাতার যেকোনো ক্যাফের তুলনায় বেশ সস্তা। পাহাড়ের কোলে জন্মানো পাইন বনের শোভা দেখতে দেখতে এই জমজমাটি ব্রেকফাস্ট করার জন্য লামাহাট্টা ক্যাফে আমাদের অনেকদিন মনে থাকবে।
ক্যাফের ঠিক সামনেই লামাহাট্টা ইকো ট্যুরিজম পার্ক ও দৃশ্যমান পাইন জঙ্গল
ক্যাফের দোতলায় রয়েছে পরপর তিনটি ঘর। ঘন পাইন-ওক বন আর কাঞ্চনজঙ্ঘার অপূর্ব দৃশ্য পাওয়া যাবে তিনটি ঘর থেকেই। পাইন, জুনিপার, স্প্রুস – এই তিন গাছের নামে ঘরগুলির নামকরণ করা হয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন শহরের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে যেমন রাস্তার ঠিক পাশেই (ফুটপাথে) খুঁজে পাওয়া যাবে খোলা আকাশের নিচে ছোট্ট ছোট্ট সব ক্যাফে; লামাহাট্টা ক্যাফেটিও ইকো পার্কের নিচে রাস্তার ঠিক পাশেই। দেওয়ালের রং, মেঝের রং সবেতেই নিজস্বতার ছাপ। লামাহাট্টা ক্যাফে হওয়ার পর পাইন বন আরও জমজমাট হয়ে উঠেছে। পথচলতি মানুষেরা একবার অন্তত ঢুঁ মারছেন। পছন্দমতো খাবার খাচ্ছেন। আড্ডা দিচ্ছেন।
আরও পড়ুন: চলুন যাই লামাহাট্টা
২০১২ সালের আগে লামাহাট্টাকে কেউ চিনত না। প্রকৃতির অসাধারণ সৌন্দর্য ধীরে ধীরে মন কাড়ে পর্যটকদের। পরিণত হয় উত্তরবঙ্গের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্রে। নির্মিত হয় লামাহাট্টার ইকো-ট্যুরিজম পার্ক। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫,৭০০ ফুট উঁচুতে পূর্ব হিমালয়ের কোলে শান্ত নিরিবিলি গ্রাম লামাহাট্টা। দার্জিলিং থেকে যার দূরত্ব ২৩ কিলোমিটার। পাইন এবং ওক গাছে ঘেরা এই গ্রামে বিরাজ করে নিরবিচ্ছিন্ন এক নিস্তব্ধতা। আঞ্চলিক মানুষজন পর্যটকদের দেখে হাসি বিনিময় করেন। শহুরে বৈষম্যের দেখা মিলবে না কোত্থাও। কৃষিকাজ আর পশুপালন - মূলত এই দুই জীবিকা এই গ্রামের মানুষদের। প্রকৃতির আদিম সৌন্দর্য রক্ষা করতে লামাহাট্টা প্রায় বর্জন করেছে প্লাস্টিক। শেরপা, ভুটিয়া, তামাং, ইয়ালমো, দুকপা জনগোষ্ঠীর বড়ো উদ্যোগ প্লাস্টিককে নিষিদ্ধ করা। আকাশ পরিষ্কার থাকলে ইকো পার্ক থেকে দেখা যায় দূরের দার্জিলিং শহর, টাইগার হিল, রঙ্গিত নদী এবং পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা।
লামাহাট্টা ক্যাফের ব্রাউনি (বাঁদিকে) এবং লেমন চিজকেক (ডানদিকে)
লামাহাট্টা ক্যাফে পর্যটকদের, বিশেষ করে ভোজনরসিক পর্যটকদের নজর কেড়েছে। প্রায় চার ঘণ্টা আমরা সেখানে ছিলাম। ক্যাফে নিয়ে পথচলতি মানুষদের উৎসাহ চোখে পড়ার মতো। আজ ভেজালের বাজারে যখন চারদিকে প্রশ্ন উঠছে খাবারের বিশুদ্ধতা নিয়ে, তখন লামাহাট্টা ক্যাফে আমাদের পরিবেশন করছে ‘অথেন্টিক’ গুণমানের খাবার। তিনজন কর্মী হাসিমুখে খাবার পরিবেশন করছেন। তদারকি করছেন আশিস। হোমস্টে তাঁরাই আগলাচ্ছেন পরিবারের মতো।
ক্যাফের দোতলার দ্য ওক রিট্রিটের একটি ঘর থেকে দৃশ্যমান কাঞ্চনজঙ্ঘা (রাত ৯টা)
ঘণ্টাখানেকের এই ঝটিকা সফরে হিমশীতল আবহাওয়ায় আমরা উপভোগ করলাম অসামান্য খাবার। হেঁটে দেখলাম চারপাশ। কখনও চারদিক সাদা হয়ে বৃষ্টি নামল। কখনও পাইন গাছে উঁকি মারল সকালের আলো। চমৎকার একটা সেলফির পর আমরা রওনা দিলাম দার্জিলিং-এর উদ্দেশে।
আশিস ও অলোকপর্ণার সঙ্গে আমি
লামাহাট্টা যাওয়ার জন্য শিয়ালদহ বা হাওড়া স্টেশন থেকে উত্তরবঙ্গগামী ট্রেন ধরে নিউ জলপাইগুড়ি বা শিলিগুড়ি স্টেশন পৌঁছতে হবে। আকাশপথে গেলে নামতে হবে বাগডোগরা বিমানবন্দরে। তারপর ভাড়া করতে করুন লামাহাট্টা যাওয়ার গাড়ি। পৌঁছতে সময় লাগবে ঘণ্টা তিনেক। লামাহাট্টায় আগে সেভাবে পর্যটকদের থাকার জন্য কোনো বড়ো হোটেল বা রিসর্ট ছিল না দু-একটি হোমস্টে ছাড়া। এক বছর হতে চললো লামাহাট্টায় গড়ে উঠেছে দ্য ওক রিট্রিট। থাকার সুবিধের সঙ্গে সঙ্গে প্রপার্টির নিচে পেয়ে যাবেন উল্লিখিত লামাহাট্টা ক্যাফে। বিস্তারিত জানতে যোগাযোগ করতে পারেন: ফোন- ৯৩৮২৩৪২৫৯৭/৯৩৩০৮৩৪৭৭৬। মেইল- theoakhospitality.resv@gmail.com
_____
লেখাটিতে বিশেষভাবে সহযোগিতা করেছেন অলোকপর্ণা