বর্ধমানের বুকে একটুকরো মরূদ্যান কৃষ্ণসায়র

ভারতের সবচেয়ে বড় 'আপগ্রোয়িং সিটি' বর্ধমান। এই দ্রুততম ক্রমবর্ধমান শহরের চারপাশ ক্রমশই ফ্যাকাশে হচ্ছে। চারপাশে গজিয়ে উঠছে বড় বড় বিল্ডিং, শপিং মল। চওড়া হচ্ছে রাস্তা। বাড়ছে ধুলো, ধোঁয়া, হর্নের আওয়াজ। কাটা পড়ছে গাছ। আর এ-সবের মধ্যেই সাক্ষাৎ মরুদ্যান হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে বর্ধমানের কৃষ্ণসায়র পরিবেশ উদ্যান। প্রায় ৩৩ একর জমির উপর নির্মিত কৃত্রিম জলাধার কৃষ্ণসায়র। তাকে ঘিরেই পার্ক।
“সেইখানে দারুচিনি-বনানীর ফাঁকে নির্জনতা আছে...”
শোনা যায়, ১৬৯১ সালে বর্ধমানের তৎকালীন রাজা কৃষ্ণরাম রাই দুর্ভিক্ষপীড়িত প্রজাদের কর্মসংস্থানের জন্য এই বিশাল সায়র নির্মাণ করান। তারপর থেকেই বর্ধমান রাজপরিবারের ইতিহাসে নানাভাবে জড়িয়ে আছে কৃষ্ণসায়রের নাম। জনশ্রুতি, কৃষ্ণসায়রের জল ছাড়া রাজপরিবারে নাকি কোনো শুভ অনুষ্ঠান শুরু হত না। রাজাদের ঠাঁটবাট এখন আর নেই। রাজার সম্পত্তি সরকারের হাত ঘুরে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে। আর সায়রের দেখভালের দায়িত্ব 'কৃষ্ণসায়র অছি পরিষদ'-এর।
এই সায়রকে কেন্দ্র করে থাকা মনোরম বিশাল উদ্যানের বারবার সংস্করণ হয়েছে। নানা সময়ে কৃষ্ণসায়রের পাড়ে তৈরি হয়েছে 'সর্প উদ্যান', 'পাখিরালয়', 'মীন আবাস'। সময়ের করাল গ্রাসে এ-সবই এখন বন্ধ। উদ্যানটি রয়ে গেছে। রাজকীয় মেজাজে নৌবিহারেরও ব্যবস্থা রয়েছে। তবে তা খরচসাপেক্ষ। কিছুদিন আগে পর্যন্তও বর্ধমান আর্ট কলেজের (College of Art and Design) মূল বিল্ডিং এবং ক্যাম্পাস ছিল কৃষ্ণসায়র পরিবেশ উদ্যানের একাংশে। এখনও সেদিকে গেলে হামেশাই নজরে পড়ে কত শিল্পীর আপন খেয়ালে বানানো নানা মূর্তি, স্থাপত্য পড়ে রয়েছে অগোছালোভাবে। ঘাস গজিয়ে উঠেছে কোনো কোনোটার উপর।
আরও পড়ুন
মালিক গরিব হলেও এ দোকানের চা আমিরী
তবে, কৃষ্ণসার পার্কের আসল চরিত্রটা অন্যত্র লুকিয়ে। কৃষ্ণসায়র পার্কে সব মিলিয়ে প্রায় ১৫০টি প্রজাতির বড়ো গাছ রয়েছে। গুল্ম-লতার হিসেব রাখা যায় না। আর আছে নাম-না-জানা বহুরকমের কীট,পতঙ্গ, জলজ প্রাণ। প্রায় ২২ রকমের প্রজাপতি পাওয়া যায় কৃষ্ণসায়রের পাড়ে। এখানে কাঠবেড়ালিদের অনন্ত আড্ডা। বেজিও আছে খানিক। সাপও থাকে। তবে সহজে চোখে পড়ে না। শীতকালের কৃষ্ণসায়রে দেশবিদেশ থেকে কতজন আসেন পাখি দেখতে। সাইবেরিয়া থেকে মাইগ্রেশনের সময় এখানে কিছুদিন কাটিয়ে যায় নানা পাখি। তখন বাইনোকুলারওয়ালাদের ভিড় লাগে। নৌবিহার নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
বর্ধমানকে যারা অল্প চেনে, তারাই জানে - বর্ধমানে উৎসব, মেলা, পরব, পুজো সারাবছর চলতেই থাকে। তার মধ্যে প্রথম সারিতেই থাকত ফুলমেলা। সেসময় এখানেই ফুলমেলা হত। তখন কৃষ্ণসায়রের রঙই বদলে যেত। গত বছর থেকে ফুলমেলা বন্ধ হয়েছে কিন্তু উদ্যানের জৌলুস এতটুকু কমেনি। শহরের তরুণ-তরুণীদের কাছে প্রেম মানেই এই পার্ক। আর যদি কখনো কোনো পরিচিত/পরিচিতা, ভাই বোনেদের কৃষ্ণসায়রের আশেপাশে দেখা হয়ে যায় তাহলে ঠাট্টার গন্ধটাই বদলে যায়। কত আড্ডা জমে গেটের সামনের চা-সিগারেটের দোকানগুলোয়। কতজনের কত হারিয়ে যাওয়া বন্ধুর স্পর্শ মাখা আছে কৃষ্ণসায়রের হাওয়ায়।
বর্ধমানে স্কুলজীবন কাটিয়েছে মানেই কৃষ্ণসায়র তার স্কুলবেলায় প্রেমের উপবন। আবার এখানেই কত প্রেমভাঙা কান্নারা উড়িয়ে যায় সিগারেটের পড় সিগারেট। শেষ স্মৃতি হিসাবে পার্কের গাছ-মাটি-জলকেই বুকে জাপটে নিয়ে নতুন করে আবার ভালোবাসে কতজন। কিছুদিন আগেই দেখছিলাম পার্কের দেওয়ালে শহরের কিছু কমবয়েসি এঁকে দিয়ে গেছে স্বপ্ন, লিখে রেখে গেছে কবিতা। গ্রাফিতির রঙ খেলে গেছে কৃষ্ণসায়রে দেওয়ালে দেওয়ালে। পার্কের পাশের রাস্তাটায় একটা আলাদা মায়া রয়েছে। লম্বা লম্বা রডোডেন্ড্রনের ছায়াঘেরা রাস্তাটা দিয়ে হাঁটলেই মনে হয়, এত দ্রুত শেষ হয়ে গেল!
তখনই দেখা যায়, কৃষ্ণসায়র পরিবেশ উদ্যানের দরজার পাশে লেখা, 'এক-পা হাঁটি, দু'পা হাঁটি, নেইকো হাঁটার শেষ/ রাস্তাজুড়েই খুঁজে নেব ভালোবাসার দেশ।'