কৃষ্ণনগরের শিশু মৃৎশিল্পীর কাজে মুগ্ধ খোদ ছোটোলাট

মাটির পুতুল তৈরি হয় বাংলার একাধিক জায়গায়। কিন্তু কৃষ্ণনগরের পুতুল যেভাবে সারা পৃথিবীর কাছে পরিচিতি পেয়েছে, বাঁকুড়া, মুর্শিদাবাদ কিংবা অন্য কোনো জায়গার সেভাবে নাম হয়নি। মাটির পুতুল আর কৃষ্ণনগর যেন সমার্থক হয়ে গেছে। কৃষ্ণনগরের এই খ্যাতির কারণ কী? সেখানকারই জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত মৃৎশিল্পী তথা স্থপতি তড়িৎ পালের থেকে জানা গেল আসল রহস্য। রহস্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে কৃষ্ণনগরে তৈরি পুতুলে ব্যবহার করা মাটির ভেতরে। ঘূর্ণির পাশে জলঙ্গী নদীর দোয়াঁশ মাটি দিয়ে বানানো হয় এখানকার পুতুলগুলো। ‘বঙ্গদর্শন’-এর প্রতিনিধিকে তড়িৎবাবু বললেন, কেন্দ্রীয় সরকারি প্রতিনিধিদের সার্ভে থেকে জানা গেছে যে কৃষ্ণনগরের পুতুল যে মাটি দিয়ে তৈরি হয়, তার গুণগত মান ভারতের অন্যান্য জায়গার পুতুলে ব্যবহৃত মাটির চেয়ে অনেক উন্নত। টেকসই তো বটেই, এই নমনীয় মাটিতে সূক্ষ কারুকার্য অনেক সহজে ফুটিয়ে তোলা যায়। এই মাটির কারণেই কৃষ্ণনগরের জয়জয়কার।
লোকমুখে শোনা যায়, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র পূর্ব বাংলার নাটোর থেকে মৃৎশিল্পীদের কৃষ্ণনগরে আনিয়েছিলেন। অবশ্য ‘নদীয়া কাহিনী’-র রচয়িতা কুমুদনাথ মল্লিক জানিয়েছেন, প্রথমে কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পীরা ছিলেন কুমোর। তাঁরা দেবদেবীর প্রতিমা বানাতেন। খ্রিস্টান মিশনারি এবং ইংরেজ শিল্পরসিকদের পৃষ্ঠপোষকতাতেই মাটির পুতুল বানানো শুরু করেন তাঁরা। সে যাই হোক, ঘূর্ণি, নতুনবাজার, এবং ষষ্ঠীতলা এই তিনটে জায়গায় মৃৎশিল্পের চর্চা হয় কৃষ্ণনগরে। এর পাশাপাশি অন্যান্য পাড়াতেও অল্প কিছু মৃৎশিল্পী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকেন। কৃষ্ণনগরের শিল্পীদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেটের প্রয়োজন হয় না। বংশানুক্রমে তাঁরা আশ্চর্য দক্ষতা এবং সৃজনশক্তির পরিচয় দিয়ে আসছেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, “সেখানে ক্লাসরুম টেবিল চেয়ার লাইব্রেরি লেকচার হল কিছুই নেই, অথচ দেখা যায় সেখান থেকে পাকা পাকা কারিগর বেরিয়ে আসছে – পুরুষানুক্রমে আজ পর্যন্ত”।
১৮৫১ সালে ঘূর্ণির এক কারিগর শ্রীরাম পালের তৈরি পুতুল স্থান পেয়েছিল লন্ডনের এক প্রদর্শনে। সেই প্রথম কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্প পেল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এখন সারা পৃথিবীতেই এখানকার পুতুলের আকাশছোঁয়া চাহিদা। শ্রীরাম পাল এবং কালাচাঁদ পালই কৃষ্ণনগরের প্রথম নামকরা শিল্পী। কাউকে সামনে বসিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই এঁরা তাদের নিঁখুত মূর্তি বানিয়ে দিতে পারতেন। ১৯১৫ সালে ছোটোলাট লর্ড কারমাইকেল কৃষ্ণনগরের শিল্পী যদুনাথ পালের বাড়িতে একটি ছোটো ছেলেকে দক্ষ হাতে মাটির পুতুল তৈরি করতে দেখে অবাক হয়েছিলেন। সেই ছেলেটি পরবর্তীকালে মৃৎশিল্পী ও ভাস্কর হিসেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করেন। তাঁর নাম গোপেশ্বর পাল। তাঁর বংশেরই একজন শিল্পী কার্তিকচন্দ্র পাল ১৯৪০ সালে রবীন্দ্রনাথের সামনে বসে কবির একটি মূর্তি তৈরি করে দিয়েছিলেন। কবিগুরু খুশি হয়ে শংসাপত্র লিখে দিয়েছিলেন তাঁকে। সমকালীন মৃৎশিল্পীদের মধ্যে তড়িৎ পাল, বিপ্লব পাল, সঞ্জয় সরকারের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। পুতুল তৈরির সঙ্গে সঙ্গে দেবদেবীর প্রতিমা গড়ার ক্ষেত্রেও এখানকার শিল্পীদের জগৎজোড়া খ্যাতি।
তবে কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পী পরিবারগুলোর নতুন প্রজন্ম আর মাটির কাজে আগ্রহী হচ্ছেন না। ধীরে ধীরে অন্য পেশার দিকে ঝুঁকে পড়ছেন তাঁরা। এর পেছনে রয়েছে বেশ কয়েকটি কারণ। কৃষ্ণনগরের পুতুলের বিশ্বব্যাপী যতই চাহিদা থাক, পুতুলের বাজারমূল্য যা দেন, তা কোনোভাবেই যথেষ্ঠ নয়। কারিগর যতটা সময় এবং পরিশ্রম ব্যয় করে সূক্ষ কারুকার্যের একটা ছোটো পুতুল তৈরি করেন, সেই পুতুল বিক্রি করে তার উপযুক্ত আর্থিক লাভ হয় না এখন। তাই অনেক প্রবীন শিল্পীই আজকাল কৃষ্ণনগর রীতি ছোটো পুতুলের কাজ ছেড়ে অন্য ঘরানার বড়ো ভাস্কর্য তৈরিতে মন দিয়েছেন। যেমন ধরা যাক সঞ্জয় সরকারের কথা। কৃষ্ণনগরের নিজস্ব ধাঁচ থেকে বেরিয়ে গিয়ে জাতীয় স্তরের ৮ টি মিউজিয়াম তৈরি করেছেন তিনি। হরিয়ানার গীতা এবং মহাভারত গ্যালারিতে তাঁর বানানো স্থাপত্য ঠাঁই পেয়েছে। এছাড়া অনেক দক্ষ কারিগর বেশি রোজগারের আশায় পাড়ি দিচ্ছেন ভিন রাজ্যে। কৃষ্ণনগরের পুতুলশিল্প ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আরেকটা কারণ হল, জলঙ্গী নদীর পাড় ক্রমাগত ভেঙে যাওয়া। পুতুলের উপযুক্ত মাটি তাই এখন আর সহজলভ্য নয়। ইদানীং ফাইবার গ্লাস, স্টোন ডাস্ট, প্লাস্টার অফ প্যারিস দিয়েও পুতুল তৈরি হচ্ছে। তবে হতাশার ছাপ সর্বত্র নেই। অনেকেই মনে করছেন, অল্প হলেও আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়াছে কৃষ্ণনগর।