No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    ইন্দিরা গান্ধি, রাধাকৃষ্ণন থেকে ভানু বন্দোপাধ্যায় সকলেই মজেছিলেন কল্পতরুর পানের স্বাদে

    ইন্দিরা গান্ধি, রাধাকৃষ্ণন থেকে ভানু বন্দোপাধ্যায় সকলেই মজেছিলেন কল্পতরুর পানের স্বাদে

    Story image

    পেশায় ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, অথচ আইটির নিশ্চিন্ত মাইনের চাকরিতে মাথা গুঁজে থাকার মানুষ তিনি নন। মনের ইচ্ছে যে কাজের আনন্দ এনে দিতে পারে সেকথাই প্রমাণ করেছেন তিনি। কলকাতার একেবারে মধ্যস্থলে প্রায় কয়েক দশকের পুরোনো একটি পানের দোকান চালান তিনি, যা কলকাতার বুকে নিজের জোরেই আজ একটি পরিচিত আইকন। কিন্তু কেন একজন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সফল ভবিষ্যৎ ছেড়ে একটা পানের দোকানের লাগাম ধরলেন? বর্তমান সময়ে প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে হাঁপাতে থাকা প্রজন্মকে এ প্রশ্নটা ভাবায় বইকি! এসব কিছুর নেপথ্যে যে মানুষটা রয়েছেন, যাঁকে নিয়ে এতো কৌতূহল উঁকি দিচ্ছে, তাঁর নাম শ্যামল দত্ত (Shyamol Dutta)। শিক্ষাগত যোগ্যতায় ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার (Electric Engineer)। কিন্তু পেশায় তিনি কলকাতা (Kolkata) শহরের একজন পরিচিত পান (Paan) দোকানী। তিলোত্তমার কেন্দ্রে, কলেজস্ট্রিটে (College Street) রয়েছে তাঁর ‘কল্পতরু’ (Kolpotoru), পুরোনো এবং সবচেয়ে বিখ্যাত পানের দোকান। কেবল আবেগের বশে পানের দোকান নিয়েই দিব্যি রয়েছেন শ্যামলবাবু।

    শ্যামলবাবুর কথায়, “আজকাল তো থিকথিক করছে ইঞ্জিনিয়ার, এ যুগে আর ইঞ্জিনিয়ার হওয়া কোনো বড়ো কথা নয়”। তাঁর পানের দোকান যে তাঁর কাছে খুবই গর্বের, তার রেশ ছিল কথায়। তিনি বলেন, “কল্পতরু পানের দোকানের বয়স ৮২ বছরেরও বেশি। আমি উত্তরাধিকার সূত্রে এই পানের দোকানটি পেয়েছিলাম। আমার বাবার হাত বদল হয়ে আজ এ দোকান আমার। আমি নিজেই চেয়েছিলাম চাকরি না করে, এই দোকানের ঐতিহ্যের গল্পে জুড়ে থাকতে। আমার এ দোকান একচেটিয়া, কেউ চাইলেই সহজে এই দোকানের নকল করতে পারবে না”।

    দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মশলা ব্যবহার করি। সুপারি আসে মূলত উত্তর-পূর্ব রাজ্য এবং চেন্নাই (Chennai) থেকে। কানপুর (Kanpur) থেকে বিভিন্ন ধরনের মৌরি আসে। অন্যান্য মশলা আসে আসানসোল (Asansol) থেকে

    সত্যিই এ পানের দোকান অনন্য। এ দোকানের দেওয়ালে রয়েছে বিখ্যাত সব ব্যক্তিদের স্বাক্ষর করা বোর্ড। ইন্দিরা গান্ধি (Indira Gandhi), সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন(Radhakrishnan), ভানু বন্দোপাধ্যায় (Bhanu Bandyopadhyay) সহ আরও অনেকেই মজেছিলেন কল্পতরুর পানের স্বাদে। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় যখন প্রায়ই স্ত্রীকে নিয়ে আসতেন, তখন শ্যামল দত্তের বাবা দোকানে বসতেন। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় মজা করে বলতেন, ‘আমার মালটাকে নিয়ে এসেছি আজকে।’ তিনি প্রায়ই ওই এলাকায় আসতেন অনুষ্ঠান করতে। শ্যামল দত্তের বাবা এবং ভানু বন্দোপাধ্যায় দুজনেই ছিলেন বাংলাদেশের বাসিন্দা, ফলে তাদের মধ্যে সম্পর্কও ছিল খুবই ভালো।

    কল্পতরু পানের স্বাদ সত্যিই বাজার চলতি পানের থেকে অন্যরকম।“আমরা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মশলা ব্যবহার করি। সুপারি আসে মূলত উত্তর-পূর্ব রাজ্য এবং চেন্নাই (Chennai) থেকে। কানপুর (Kanpur) থেকে বিভিন্ন ধরনের মৌরি আসে। অন্যান্য মশলা আসে আসানসোল (Asansol) থেকে”, শ্যামলবাবু জানান। তবে মশলা যেমন ভালো, পানের দামও যে সমতুল্য হবে সেটাই স্বাভাবিক। একটি পানের দাম ৫ টাকা থেকে শুরু করে ৫০১ টাকা পর্যন্ত। একটি পানের দাম ৫০১ টাকা শুনলে মনে হতেই পারে ব্যয়বহুল, এ কথা ঠিকই। কিন্তু এই দামের পিছনে আসল কারণটি হল পানের জন্য ব্যবহৃত ব্যয়বহুল মশলা। এই মশলাগুলি বিশেষ পাত্রে সংরক্ষণ করতে হয়। পানে ব্যবহৃত সিলভার ফয়েলটির ব্যয়ও কিছু কম নয়। তবে দামের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার জন্য এখনও কিছু শৌখিন মানুষ রয়েছেন, যারা দামি পানের জন্য টাকা খরচ করতে আপত্তি করেন না। অনেকের কাছেই বিভিন্ন ধরনের পান রাখা এক ধরনের শখ, ঠিক যেমন বেশি দামের টিকিট কেটে দেখা কারোর কারোর শখ। শ্যামল দত্ত মনে করেন, “অনেকেই যেমন ভাবেন, আমি যদি কম দামে সিনেমার টিকিট না পাই, তবে আমি বেশি দামের টিকিট কেটেই দেখব, একইভাবে, এই দামি পানের গ্রাহকেরাও একটি সুস্বাদু এবং ভিন্ন পানের স্বাদ নিতে টাকা খরচ করতে কুণ্ঠা বোধ করেন না।”

    তবে যুগ বদলেছে, যান্ত্রিক সময়ে ঐতিহ্য নিয়ে আবেগ দেখানোর মানুষের বড়োই অভাব। তাই, সেকালের সেই বিখ্যাত পানের দোকানটিও আজ খানিক ধুঁকছে। শ্যামলবাবুর পরবর্তী প্রজন্ম আর এই ব্যবসায় আসতে চায় না। ফলে সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকার লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়ছে ‘কল্পতরু’। শ্যামলবাবুর কথায়, “আমি বেঁচে থাকা পর্যন্ত এ দোকান চালাব। তারপর কি হবে জানি না। লোক রেখে দোকান চালালে তো সেই কর্মীদের এ দোকান নিয়ে কোনোও আবেগ থাকবে না। তারা শুধুমাত্র ৮ থকে ১০ ঘন্টার নিয়মমাফিক দায়িত্ব পালন করেই দায় সারবে। কেউই অতিরিক্ত সময় অথবা শ্রম দিতে চায় না। কর্মীদের কাজের সবটাই হয়ে দাঁড়াবে দেওয়া-নেওয়ার হিসেবমাত্র। আর ঠিক এসব কারণেই আমি নিজে দোকান চালাতে পছন্দ করি। চাই এ দোকানের আরও শাখা বিস্তার ঘটুক”।  

     

    মূল প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে পড়তে এখানে ক্লিক করুন

    Tags:

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @