নব কলেবরে ফিরল গ্লোব, বন্ধ হয়ে যাওয়া সিঙ্গেল স্ক্রিনগুলোর উলোটপুরাণ যাত্রা শুরু?

দল বেঁধে সপরিবারে সেজেগুজে সিনেমা হলে যাওয়া, ম্যাটিনি বা ইভনিং শোয়ে সিনেমা দেখা, তারপর মোগলাই-কাটলেট খেয়ে বাড়ি ফেরা; মধ্যবিত্ত কেতাদুরস্থ বাঙালির শনি-রবিবার বা অন্য কোনও ছুটির দিন এমনভাবেই কাটতো। মোটামুটি নয়ের দশক অবধি ছবিটা এমনই ছিল। তিন-চারের দশকে জন্ম হয়েছিল এই প্রবণতার। কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট অর্থাৎ আজকের বিধান সরণি ও তার আশপাশে একাধিক প্রেক্ষাগৃহ ছিল... মিত্রা, রূপবাণী, শ্রী, উত্তরা, রাধা, খান্না, দর্পণা, মিনার, বীণা, পূর্ণশ্রী, বিদুশ্রী, সুরশ্রী, টকিশো হাউস… হাতিবাগানের নামই হয়ে গিয়েছিল ‘সিনেমা পাড়া’। যেকোনও ছবিকে ‘হিট’ করানোর জন্য যথেষ্ট ছিল এ পাড়া।
একের পর এক পুরোনো হল বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবরের মধ্যেই নব কলেবরে ফিরে এল গ্লোব সিনেমা। বিখ্যাত সংস্থা এসএসআর সিনেমাসের কর্ণধার তথা পরিবেশক শতদীপ সাহা গ্লোব কিনে নতুন করে সাজিয়েছেন।
চমকপ্রদ চতুর্থ সপ্তাহ, দুরন্ত দশ সপ্তাহ ইত্যাদি লেখা পোস্টার ছাপা হত, টিকিটের লাইনের আশেপাশে ব্ল্যাকাররা ঘুরত, পরিবারের কর্তারা তাড়া দিতেন স্ত্রীদের, শো ভাঙার ভিড়ের কাছে হার মানতো একালের ঠাকুর দেখার লাইন; এরপর হঠাৎ করেই একদিন উল্টো হাওয়া বইতে শুরু করলো। চ্যাপলিন, টাইগার, লাইটহাউস, প্যারাডাইস, এলিট, হিন্দ, লোটাস, জ্যোতি, ক্রাউন, নিউ সিনেমা, ওপেরা শো হাউস, ম্যাজেস্টিক, ছায়াবনী, প্রাচী, পূরবী একে একে নিভতে আরম্ভ করলো সিঙ্গেল স্ক্রিনের আলো। গত তিন দশকে শহরের একের পর এক সিঙ্গেল স্ক্রিন উঠে গিয়েছে। সেগুলোর জায়গায় তৈরি হয়েছে শপিং মল। বাংলা সিনেমা গল্প বলার ধরন বলদে অনেক বেশি শহুরে হয়েছে, মানুষের ব্যস্ততা বেড়েছে, অর্থসামাজিকভাবে মধ্যবিত্ত শ্রেণিও সংকটে, সর্বপরি স্মার্টফোন, ইউটিউব, ওটিটির যুগে ধাক্কা খেয়েছে সিঙ্গল স্ক্রিন সিনেমা হলগুলো। শেষ পেরেক পুঁতেছে করোনা ও লকডাউন।
একের পর এক পুরোনো হল বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবরের মধ্যেই নব কলেবরে ফিরে এল গ্লোব সিনেমা (SSR Globe Cinemas)। বিখ্যাত সংস্থা এসএসআর সিনেমাসের কর্ণধার তথা পরিবেশক শতদীপ সাহা গ্লোব কিনে নতুন করে সাজিয়েছেন। শহরের বুকে ডুয়াল-প্লেক্স রূপে ফিরেছে গ্লোব।
শতদীপ সাহা বলেন, “নতুন জিনিসে মানুষ সব সময় আকর্ষণ অনুভব করে। মানুষের ভালো সাড়া পাচ্ছি। লোকে যত জানতে পারছে, তত আসছে।” শতদীপের পরবর্তী কাজ আমতলা প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে।
১৮২৭ সালে তৈরি হয়েছিল ওল্ড অপেরা হাউস। ১৯০৬ সালে যার নাম হয় গ্লোব। ২০০৪ সালে বন্ধ হয়ে যায় লিন্ডসে স্ট্রিট-এর বিখ্যাত প্রেক্ষাগৃহটি। তখন টাইটানিক ছবিটি দেখানো হয়েছিল। কুড়ি বছর পর ২০২৪-র পঞ্চমীর দিন এসএসআর গ্লোবের পথচলা শুরু হয়েছে। ‘টেক্কা’, ‘বহুরূপী’, ‘শাস্ত্রী’ তিনটি বাংলা ছবিই দেখানো হয়েছে। প্রেক্ষাগৃহে দেব ও সৃজিত মুখোপাধ্যায় তাঁদের ছবি ‘টেক্কা’-র টিকিট বিক্রি করেছেন। একদা গ্লোবে বিদেশি ছবির প্রাধান্য থাকত। ২০২৪-এ নতুন রূপের গ্লোবে নানা ভাষার ছবি দেখানো হচ্ছে।
বঙ্গদর্শন.কম-কে শতদীপ বলছিলেন, “একের পর এক সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সিনেমা হলগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার লক্ষ্য থেকেই গ্লোবকে খোলনলচে বদলে ফিরিয়ে আনা।” শতদীপ জানালেন, এসএসআর গ্লোবে এখন দুটো পর্দা রয়েছে। আসনের সংখ্যা যথাক্রমে ২৩৯ এবং ১৯৭। অন্যান্য মাল্টিপ্লেক্সের তুলনায় টিকিটের মূল্যও কম।
শতদীপ এক সংকল্প নিয়েছেন। বন্ধ হয়ে যাওয়া ইলোরা, চিত্রা, নটরাজের মতো প্রেক্ষাগৃহগুলো পুনরায় খুলতে চান তিনি। সে প্রসঙ্গে জানালেন, “বন্ধ হয়ে যাওয়া সিনেমা হলগুলোকে খোলার ইচ্ছে আছে। ব্যবসা বাড়ানোই মূল লক্ষ্য। আমাদের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি ততদিন টিকে থাকবে, যতদিন সিনেমা হল থাকবে। সিনেমা হল না থাকলে কী করে এগোবে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি!”
আরও পড়ুন: নতুন সাজে পুরোনো ‘প্রাচী’
আরও বলছিলেন, “বহু পুরোনো সিনেমার ডিজিটাল সংস্করণ নেই। সিনেমাগুলোকে চালানোর ইচ্ছে থাকলেও চালাতে পারছি না। এখন তো সব ডিজিটাল হয়ে গেছে, আগে রিলে চলতো। অনেক চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু এখনও অবধি বহু সিনেমা ডিজিটাল করা যায়নি। সেগুলো স্ক্রিন করা যাচ্ছে না। না-হলে হয়তো আমরা পুরোনো কোনও সিনেমা দেখিয়েই গ্লোবের সফর শুরু করতে পারতাম।”
শতদীপ বললেন, “নতুন জিনিসে মানুষ সব সময় আকর্ষণ অনুভব করে। মানুষের ভালো সাড়া পাচ্ছি। লোকে যত জানতে পারছে, তত আসছে।” শতদীপের পরবর্তী কাজ আমতলা প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে, তিনি প্রেক্ষাগৃহটিকে ফের খুলতে চান। নয়া নাম হবে আমতলা এসএসআর।
ইলোরা, চিত্রা, প্রাচী, পূরবীর মতো প্রেক্ষাগৃহের সঙ্গে বাঙালির বহু স্মৃতি জড়িয়ে আছে। শহরের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এরা। হোক না মাল্টিপ্লেক্স, তবুও তো ফিরছে প্রেক্ষাগৃহগুলো। বিংশ শতকের ইতিহাস নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এমন ঐতিহ্যবাহী সিনেমা হলগুলো নব কলেবরে ফিরলে আরও অক্সিজেন পাবে বাংলার চলচ্চিত্র জগৎ। পাশাপাশি ইতিহাসের সংরক্ষণও হবে। শতদীপের মতো চলচ্চিত্র ব্যবসায়ীরা যত এগিয়ে আসবেন, তত গতিশীল হবে এ কাজ, ঋদ্ধ হবে বাংলার চলচ্চিত্র শিল্প।