No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    কলকাতায় দুষ্প্রাপ্য, পুরোনো বই খুঁজে পাওয়ার সেরা তিনটি রাস্তা

    কলকাতায় দুষ্প্রাপ্য, পুরোনো বই খুঁজে পাওয়ার সেরা তিনটি রাস্তা

    Story image

    লাই বাহুল্য বইপোকাদের কাছে বইয়ের থেকে মূল্যবান রত্ন আর কীই বা হতে পারে! তাদের জন্যই কলকাতার (Kolkata) বেশ কিছু রাস্তা এখনও পুরোনো বইয়ের আস্তানা। সেসব রাস্তা… ধরুন গোলপার্ক (Golpark) থেকে গড়িয়াহাটের (Gariahat) দিকে এগোলে বাঁ দিকের রাস্তার উপর হঠাৎ করেই পেয়ে গেলেন খাঁটি ২৪ ক্যারাটের সোনা, একেবারে জলের দরে! আমার মতো অনেকেই এই ঘটনায় অবাক হবেন না। কিছুদিন আগে ওই পথেই যাচ্ছিলাম, ভাবলাম একটু দাঁড়াই। তখনই পরিচিত এক দোকানদার লোভ দেখিয়ে তাঁর দোকানে নিয়ে গেলেন। প্রতিবারই এটা হয়, ডাকাডাকি পড়ে যায়। শুরু করলেন জাঁ পল সার্ত্র’র (Jean Paul Sartre) ‘ওয়ার্ডস্’ (Words) দিয়ে, তারপর থরে থরে সাজানো পুরোনো বইয়ের বান্ডিল থেকে ধুলো ঝেড়ে একে একে বের করলেন ইংরেজিতে দস্তোভস্কির (Fyodor Dostoevsky) চারটি গল্প, আর্ট এগেন্সট টেরোরিজম এবং ‘অনুস্বর’ নামে একটি চটি ম্যাগাজিন। পাঠকরা আমায় এ ব্যাপারে সরাসরি হিংসে করতে পারেন। কারণ সন্দীপন চট্টপাধ্যায়ের একটি দুর্মূল্য লেখা তো বটেই, সেই সঙ্গে পত্রিকাটি থেকে পেয়েছি শক্তি চট্টোপাধ্যায় (Shakti Chattyopadhyay), সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (Sunil Gangopadhyay), সুনীল বসু (Sunil Basu), প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত (Pranabendu Dasgupta), স্বপন মালাকার (Swapon Malakar), পূর্ণেন্দু পত্রী (Purnendu Potri) প্রমুখের অপ্রচলিত কিছু লেখা। মোট চারটি অমূল্য বই ঝোলায় ভরেছিলাম মাত্র ২০০টাকা মূল্যে।

    গোলপার্কে ৩০ বছরেরও পুরোনো বইয়ের দোকান মৃণাল কান্তি মণ্ডলের। তাঁর কৃপাতেই বহুবার ভাগ্যদোয় ঘটেছে আমার। মৃণালদা সহাস্য বদনে বললেন, “আপনি নিতে পারেন বলেই বের করলাম এগুলো, সকলে তো আর এসব বইয়ের মর্ম বোঝে না। আমরা লোক চিনতে ভুল করি না। এত বছরের অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি। এখন তো তেমন খরিদ্দারই পাই না। লকডাউন এর পর বাজার পড়ে গেছে। কত ভিড় হয় বইমেলায়, কত কত বই কেনে সবাই, আর সারা বছর আমরা মাছি তাড়াই। অনেকেই এখন পুরোনো বইয়ের ব্যবসায় নতুন কোনও ‘হিট’ বইয়ের নকল বিক্রি করে লাভ করছে। আমার মতো এখানে আরো কয়েকজন পুরোনো বই-ব্যবসায়ী আছে, যারা এটা এখনও করে উঠতে পারেনি। আমরা পুরোনোতেই আছি। এসব জিনিসের মর্যাদা আলাদা। যারা জানে তারা ঠিক নিয়ে যায়। তাদের সংখ্যাও কমেছে। এভাবেই চলছে।”

    গোলপার্কের পুরোনো বই-বিক্রেতা মৃণাল কান্তি মণ্ডল

    মৃণালবাবুদের এহেন মন্তব্য অনেকেই শুনে থাকবেন। প্রকৃতপক্ষেই তাঁরা পাঠকের নাড়ি-নক্ষত্র চেনেন। এঁদের দিকেই পাখির চোখ থাকে পড়ুয়া, লেখক, গবেষক, শিল্পী, অধ্যাপক, তরুণ কবি, হবু ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ারদের। কোনও কোনও খরিদ্দারের সঙ্গে বিক্রেতাদের এমন খাতির হয়ে যায় যে কারও জন্য একটু বেশি ছাড়, দুষ্প্রাপ্য কিছু হাতে এলে আলাদা করে সরিয়ে রাখা, ‘বিশেষ’ ক্রেতাটির চাহিদা অনুযায়ী কিছু বাছাই বই জোগানের বন্দবস্ত করে দেওয়া -এসব চলেই থাকে। দুষ্প্রাপ্য পুরাণ, দর্শন, সাহিত্য, পেন্টিং, কমিকস্‌ -জহুরী হলে আপনার রত্ন চিনতে অসুবিধা হবে না।

    মেডিকেল কলেজ (Medical College) আর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের (Calcutta University)  মধ্যিখান দিয়ে যে রাস্তাটা চলে গেছে, সেখানেই বিশ্ববিদ্যালয়ের গায়ে বহুবছর ধরে ফুটপাতের উপর বসে পুরনো বইয়ের বাজার। সেখানকারই একজন প্রবীণ বই বিক্রেতা রসিকতার সুরে বলছিলেন, “এখন সবাই অনলাইন বই-ব্যবসা করে, বই পড়ে, ঘরে বসেই সব পাওয়া যাচ্ছে। লকডাউনে আরও বেড়েছে। এই তো দেখুন না দু’বছর হতে চললো এখানকারই ইউনিভার্সিটির এক প্রফেসর ৫০০টাকা অগ্রিম দিয়ে সোভিয়েতের রাজনীতি-দর্শন-সাহিত্য বিষয়ে কয়েকটা বই বেছে গেছিলেন, তার পরপরই লকডাউন হল। দোকান খুলছি তা প্রায় অনেক দিনই হল, রাশিয়া যুদ্ধও বাধিয়ে ফেললো, সেই লোক আর বই নিয়ে গেলেন না! হা হা হা। আমি রেখে দিয়েছি, দেখি আর কটা দিন। আমার পরে আমার ছেলেরা আর এই ব্যবসায় থাকবে কী না, জানি না।”

    শুধুমাত্র পুরোনো বই নয়, বইয়ের ভিতর আবিষ্কার করা নামী-অনামী সই, ষ্ট্যাম্প সহ চিঠি, শুভেচ্ছাবার্তা, পাতা বা ফুলের ফসিল -এসবও পাওয়া যায়। পেয়ে গেলেই দেখবেন গুপ্তধন নিয়ে আপনি দিব্যি কল্পলোকে পৌঁছে যেতে পারছেন।

    আবার যদি আপনি মির্জা গালিবের নামাঙ্কিত রাস্তায় এসে পড়েন, তাহলে নিউ মার্কেট পর্যন্ত যেতে গেলে অনেকগুলো বইয়ের দোকান দেখতে পাবেন, যা পুরনো বই আর ম্যাগাজিন পাওয়ার সাবেক ঠিকানা। দোকানগুলোতে একটু একটু খোঁজাখুঁজি করলেই মিলতো খালিল জিব্রান থেকে মিলান কুন্দেরা, টমাস হার্ডি থেকে জেমস জয়েস এর বই, আরও অনেক কিছুই খুঁজে পাওয়া যেত ফ্রি স্কুল স্ট্রিট বা আজকের মির্জা গালিব স্ট্রিটের ওই সব বইয়ের দোকান থেকে। বর্তমানে বেশির ভাগ দোকানই বন্ধ। যেগুলো এখনও রয়েছে, সেগুলোতে আর ভালো বই নেই, ধুঁকছে।

    উত্তরে যদি হয় কলেজ স্ট্রিট, তাহলে মধ্য কলকাতায় মির্জা গালিব স্ট্রিট আবার দক্ষিণে গড়িয়াহাট থেকে গোলপার্ক। কলকাতায় পুরোনো বই খুঁজে পাওয়ার সেরা তিন রাস্তা। গেলেই টের পাবেন তা। এছাড়াও অজানা, অচেনা, অল্প-পরিচিত, অপ্রচলিত, অনামী বইয়ের রাস্তা এই শহরে রয়েছে। কেউ কেউ আজীবন পলিথিন পেতে বই বিক্রি করে গেলেন, কেউ কেউ দু-চারটে টেবিল, বেঞ্চ পেতে, কেউ আবার ছোটোখাটো দোকান করে। হ্যামিলনের বাঁশি বাজিয়ের মতো  প্রাক ইন্টারনেট-যুগের কলকাতার রোমান্টিজম ধরে রেখেছেন ফুটপাতের পুরোনো বই বিক্রেতারা।

    সবে সবে বই-পার্বন কাটিয়েছি আমরা। বইমেলায় পুরোনো বইয়ের একাধিক স্টল থাকলেও সবসময় মনে হয়েছে সেগুলো যেন একটু কোনঠাসা। যাদের না গেলে চলে না শুধুমাত্র তারাই ঢুঁ মারতে যায়। এছাড়া এখন নতুন বই, তার গন্ধ, মলাট, লেখা, ভিড়, আড্ডা, খানা-পিনা সব মিলিয়ে মন-মাথা জর্জরিত হয়ে আছে। এসবের মধ্যে পড়ে পুরোনো বই, তার গন্ধ, মলাট, লেখা, একাকীত্ব, অপেক্ষা এসব যেন ভুল না যাই। এছাড়া শুধুমাত্র পুরোনো বই নয়, বইয়ের ভিতর আবিষ্কার করা নামী-অনামী সই, ষ্ট্যাম্প সহ চিঠি, শুভেচ্ছাবার্তা, পাতা বা ফুলের ফসিল -এসবও পাওয়া যায়। পেয়ে গেলেই দেখবেন গুপ্তধন নিয়ে আপনি দিব্যি কল্পলোকে পৌঁছে যেতে পারছেন। সেকারণেই বলছি, এখন বসন্ত, চৈত্রের চোখ রাঙানি এড়িয়ে রোদ পড়ে এলে পুরোনো বইয়ের রাস্তা ধরে একটু হেঁটে আসলে মন্দ কী!

    Tags:

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @