No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    ‘ছবির সঙ্গে সহবাস করুন, বিয়েতে শাড়ি, আলমারি না দিয়ে ছবি উপহার দিন’ : কলকাতার প্রথম চিত্রমেলা

    ‘ছবির সঙ্গে সহবাস করুন, বিয়েতে শাড়ি, আলমারি না দিয়ে ছবি উপহার দিন’ : কলকাতার প্রথম চিত্রমেলা

    Story image

    র্মতলার চৌধুরী কেবিনে সান্ধ্য আড্ডায় সেদিন অনেকে এসেছিলেন, আমি ও রতনও ছিলাম, ‘সোসাইটি অফ কন্টেম্পরারি’র অনেক সদস্যই ছিলেন সঙ্গে। ‘ক্যালকাটা পেইন্টারস্‌ গ্রুপ’-এর পক্ষ থেকে শিল্পী প্রকাশ কর্মকার এবং রবীন মণ্ডল সহ আরও কয়েকজন। যাঁরা কোথাও সদস্য নন যেমন অমরেন্দ্রলাল চৌধুরী, অমল চাকলাদার, আর সোসাইটির শ্যামল দত্তরায়, সনৎ কর, বিকাশ ভট্টাচার্য, গণেশ পাইন, অনিলবরণ সাহা, শৈলেন মিত্র সহ আরও অনেকেই। অহীভূষণ মালিক প্রস্তাব দেন কলকাতা কর্পোরেশনের সামনের মাঠে অর্থাৎ মার্কেট স্কোয়ারে শিল্পীরা সবাই মিলে যদি ‘আর্ট ফেয়ার’ করা যায়, তাহলে সাধারণ মানুষকে ছবি দেখাবার একটা ভালো সুযোগ গড়ে উঠতে পারে, আর সস্তায় ছবি যদি থাকে তবে সাধারণ মানুষও উৎসাহী হবেন কিনতে। অনেক আলোচনার পর এই প্রস্তাবে সকলেই এক কথায় রাজি হলেন, কিন্তু কীভাবে কী হবে? কে বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে?

    রবীনদা (রবীন মণ্ডল) রাজি হলেন তৎকালীন মেয়র গোবিন্দ দে-র সঙ্গে কথা বলতে, ওনার বন্ধু পার্বতী মুখার্জি ওখানে কাজ করেন আর তিনি শিল্পীদেরও ঘনিষ্ট বন্ধু। অহীদা বললেন তবে চলো আমিও যাবো আর গৌরকিশোর ঘোষকেও সঙ্গে নিয়ে যাবো। গৌরদা এসব ব্যাপারে বেশ উৎসাহী ছিলেন বরাবর, ওঁনার মদতেই মুক্তমেলা চলতো। এই ভাবনা নিয়ে কাজ শুরু হয়ে গেলো, ঠিক হলো সোসাইটির স্টুডিও ঘরেই হবে এই মেলার নিয়মিত মিটিংগুলো।

    শিল্পীদের এই ভাবনাকে মহানাগরিক গোবিন্দ দে সম্মতি দিলেন, সময়টা ১৯৬৯ সাল। ব্যস, কাজ শুরু হয়ে গেলো; সবার সঙ্গে আলোচনা করে একটা কমিটি করা হলো। লেটার হেড, বিল বই এসব দ্রুত ছাপার ব্যবস্থা হয়ে গেল, সবাই মিলে কিছু অর্থ সংগ্রহের চেষ্টায়ও লেগে পড়া হলো। অনেকের সঙ্গে অনেকের যোগসূত্র এবং সেই সূত্র ধরেই মেলার বিপুল খরচ তোলার চেষ্টায় পাওয়া গেল অনেকেরই সহযোগিতা। আমরাও অনেক দায়িত্ব নিলাম, ছাত্রদেরও এর সঙ্গে যুক্ত করা হলো। ফিলিপস কোম্পানি আলো দিয়ে সাহায্য করবেন, বাটা কোম্পানি টিকেট ছেপে দেবেন আর মেলাকে সাজিয়ে দেবেন, এর জন্য পৃথ্বীশ গাঙ্গুলির ভূমিকা ছিল অনেকটাই। ডেকরেটর, মাইক এসবও বন্দোবস্ত হয়ে গেল। শিল্পী লালুপ্রসাদ সাহু, তিনি আবার ঠিক করে ফেলেন চায়ের দোকান দেবেন। কবিরা কবিতা পাঠ করবেন। ওখানে আমি শুভা (শুভাপ্রসন্ন ভট্টাচার্য)-কে নিয়ে এলাম। ও মাঠে পোর্ট্রেট করবে, রতনও করবে আমিও প্রয়োজন হলে করবো। আমরাও ছবি দেবো, তবে আলাদা এক অংশে, কেন না আমরা তখন ছাত্র। তবে, এই যজ্ঞে এইসব কাঠবিড়ালিরাই ছিল অনেক কাজের, মাঠে প্রতিদিন ছবি টাঙাতে হবে আবার শেষ হলে খুলে রেখে দিতে হবে নির্দিষ্ট জায়গায়। অতএব, ১৯৬৯ সালে শীতের শেষে কালীঘাটের শেষ পটুয়ার হাত দিয়ে এই মেলার শুভ সূচনা হয়ে গেল।

    কলকাতা কর্পোরেশনের সামনের মাঠে অর্থাৎ মার্কেট স্কোয়ারের মুক্তাঙ্গনে চলছে ‘আর্ট ফেয়ার’​ (১)

    (২)

    প্রকাশ কর্মকার মাইকে ঘোষণা করছেন ‘ছবির সঙ্গে সহবাস করুন, বিয়েতে শাড়ি, আলমারি না দিয়ে ছবি উপহার দিন’ লালুদা মাথায় গামছা বেঁধে দিব্যি চায়ের দোকান খুলে চা বিক্রি করছেন, সস্তা ছিল ছবির দাম।  তোগণেশ পাইনের ছবি বিক্রি হয় ১০০ টাকা করে, শ্যামল দত্তরায়ের গ্রাফিক প্রিন্ট বিক্রি হয় ৩০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে। আমরা দাদাদের ছবি তাঁদের অনুপস্থিতিতে টাঙিয়ে দিতাম আবার খুলেও দিতাম। সানাই বাজত সবসময়। ফাঁকে ফাঁকে কবিতা পড়া বা নানা ঘোষণা তো ছিলই। ওই নিউ মার্কেট চত্বরে যত মানুষ আসতেন, টিকিট কেটে এই মেলা দেখতেন। আমরা রাতে হিসেব করতাম কত টিকিট বিক্রি হয়েছে। তাতে বোঝা যেত কত লোকের সমাগম ঘটেছে। এভাবে এত মানুষের যে এমন সমাগম ঘটতে পারে তা কেউই আন্দাজ করতে পারেনি। তবে অনেক কবি সমাগম আর শিল্পীদের এই মিলনে কলকাতার শিল্প মহল যেন নতুন করে এক বার্তা পেলো – গ্যালারি সর্বস্ব মন থাকলে সাধারণ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়, সুতরাং মানুষের কাছাকাছি আসতে হবে।

    আনন্দবাজারে প্রকাশিত ছবি, মেলায় মেয়র গোবিন্দ দে-র পোর্ট্রেট আঁকছেন শুভাপ্রসন্ন

    সন্দীপন চট্টপাধ্যায়ের মিনি বুক সবাইকে বেশ মাতিয়েছিল, এই মেলাতে এনে বিক্রি করেছেন তিনিও। সন্দীপনের পরে অনেকেই মিনি পত্রিকা প্রকাশ করতে শুরু করলো। অমিয় চট্টোপাধ্যায়-এর ‘পত্রানু’ যথেষ্ট ভালো পত্রিকা ছিল, রেডিওতে ঘোষকের চাকরি সামলে তিনিও এই প্রতিযোগিতায় নিজেকে সামিল করেন। তবে সন্দীপনের চমকের কাছে কেউ দাঁড়াতে পারতো না। সে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত যেখানে বাংলার শিল্পীরা ও লেখকরা একত্রিত হয়ে নিজেদের কথা, নিজেদের শিল্প সরাসরি মানুষের সামনে তুলে ধরছেন, শিল্পের ইতিহাসে এর গুরুত্ব অনেক, সে অর্থে কেউই সাংগঠনিক কাজে অভ্যস্থ নন, তবে স্বতঃস্ফুর্ততার অভাব ছিল না বলে এই মেলার আলাদা এক প্রাণ তৈরি হতে পেরেছিল। একবার মকবুল ফিদা হুসেন চলে এসেছিলেন মেলা দেখবার জন্য, সে কথায় পরে আসছি। মেলা চলেছিল প্রায় পনেরো দিন।

    পরের বছরগুলোতেও এই মেলার বহু দায়িত্ব নিয়ে সকলের সঙ্গে মেলা সাফল্যমণ্ডিত করে তুলতে পেরেছিলাম। এর পর আমি পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে অন্যত্র চলে যাই। আমি তখনও ছাত্র ও পুরো দমে শিল্প চর্চা করে চলেছি। আমি তখন ত্রিপুরাতে রয়েছি, দেখি দেশ পত্রিকায় দ্বিতীয় চারুকলা মেলা নিয়ে চিত্রপ্রিয়-এর সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছে যেখানে তিনি আমার নাম উল্লেখ করেছেন অন্যতম আয়োজক হিসেবে। সে নিয়ে নীহাররঞ্জন রায়ের পুত্র প্রণবরঞ্জন রায় প্রতিবাদ পত্রও পাঠান, আমার পরিচয় নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন এবং তাঁর আপত্তি প্রকাশ কর্মকারকে নিয়েও। এই পত্র যুদ্ধ কয়েকদফা হয়েছিল। প্রথম মেলার সভাপতি অমরেন্দ্রলাল চৌধুরী, তিনি প্রথমে প্রণবরঞ্জন-এর চিঠির প্রতিবাদ করেন, যেখানে আমার অবদানের কথা উল্লেখ করে বলেছেন যে, প্রণবরঞ্জন একপেশে কিছু কথা বলতে চাইছেন যা অনৈতিক। দেশ পত্রিকার সমালোচকও উল্লেখ করেছেন আবার প্রনবরঞ্জনের চিঠির সূত্র ধরে। আমিও ত্রিপুরা থেকে প্রতিবাদ পত্র পাঠাই এটা জানিয়ে যে আমার ঠিক কী ভূমিকা ছিল। চিঠির তলায় আমার নামের পাশে লেখা ছিল ত্রিপুরা, এর ফলে অনেকেই ভাবতে শুরু করে দিলেন আমি বোধহয় ত্রিপুরার বাসিন্দা।

    শিল্পীরা একসঙ্গে অনেক কাজ করতে পারতেন তবে শিল্পীদের মধ্যে বিভেদ গড়ে দেবারও লোকজনের অভাব ছিল না। আমি কোনোদিনই এসব বিভেদকে গুরুত্ব দিইনি। আমি কী করতে পারি তার আন্দাজ ধীরে ধীরে শিল্পী মহলে গড়ে উঠতে শুরু করেছিল। আসলে সামনে দাঁড়িয়ে কিছু মানুষ আছে অনেক ঝড় ঝাপটা সহ্য করেও কিছু করতে চায়, তাদেরকেই কিছু সমালোচক পেছন থেকে টেনে ধরে, কিন্তু মনের জোর যাদের আছে তারা ঝড়ে টিকে থাকে, আমিও ঝড়ে ঝরে যায়নি।

    সে যাই হোক, আবার মেলা প্রসঙ্গে ফিরি। ১৯৭২ সাল। সে বছর ফেব্রুয়ারি মাসের ৯ থেকে ২৪ তারিখ অবধি চলবে মেলা। কর্পোরেশনের সামনের মাঠে, প্রায় শতাধিক শিল্পীরা যোগ দিচ্ছেন। এবার উদ্ভোধন করবেন মেয়র শ্যামসুন্দর গুপ্ত। মেলা জমে ওঠার ক'দিনের মধ্যেই সন্ধ্যে বেলায় হটাৎ ঝড় উঠলো, মুহূর্তের মধ্যে সব কেমন করে দিল। ঝড়ের সঙ্গে বৃষ্টি ও শুরু হয়, সবাই ছোটাছুটি করে ছবি বাঁচাবার জন্য লেগে পড়লো, আমরা ভিজে গেছি কিন্তু বেশির ভাগ ছবিকে বাঁচাতে পেরেছিলাম, সেদিন দেখেছিলাম সব শিল্পীকে কেমন একসঙ্গে হাতে হাত লাগিয়ে ছবিকে বাঁচিয়েছেন। ছোটো বড়ো কোনো ভেদ ছিল না, এমনকি যার নিজের ছবি ছিলনা তিনিও ছুটে গিয়ে ভিজতে ভিজতে ছবি বাচাচ্ছেন। এমন অভিজ্ঞতা এই প্রথম ঘটলো, মাথার উপর ছাউনি নেই, ছাউনি করা হবে না কারণ তাহলে মেলার পরিবেশটাই পাল্টে যাবে। আগে শীতকালে হতো বলে কখনোই এই সমস্যার সম্মুখীন কাউকে হতে হয়নি। আমার কিছু ড্রইং ছিল ঝড় বৃষ্টির আগেই সব একজন কিনে নিয়ে গেছে, তখন আবার নতুন কিছু কাজ দিয়েছি।

    কলকাতা কর্পোরেশনের সামনের মাঠে অর্থাৎ মার্কেট স্কোয়ারের মুক্তাঙ্গনে চলছে ‘আর্ট ফেয়ার’ (৩)

    একদিন খবর এলো মেলা শুরু হতেই একজন বিশেষ দর্শক আসবেন, তাঁর পরিচয় আগে থেকে কাউকে জানানো হবে না, বিশেষ করে মিডিয়া তো নয়ই, মেলা শুরু হতে আর কিছুক্ষণ বাকি, কৌতূহল হচ্ছিল আবার কোনও প্রতিক্রিয়া দেখালাম না কারণ, এই মেলায় অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিরা প্রায় নিয়মিত আসেন, এবং তাঁরা আর অন্যান্যদের মতই সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকেন। আলাদা কোনও গুরুত্ব দেওয়া হয় না।

    মেলা শুরু হতেই সেই 'বিশেষ দর্শক' এসে গেলেন। জিনস্‌ পরা একটি রোগা মেয়েকে সঙ্গে করে বড়ো একটা ঘোমটা টেনে চোখে বড়ো ফ্রেমের রোদ চশমা লাগিয়ে দ্রুত ভেতরে ঢুকলেন এক মহিলা সঙ্গে আমাদেরই একজন শিল্পী। কেউ নজর করেননি ওঁদের, অনেক দর্শক-জমায়েত না হলেও অনেকেই ছিলেন। তরুণ শিল্পীরা মাঠে বসে পোর্ট্রেট আঁকছেন, তাঁরা কিছুক্ষণ ছবি দেখলেন ঘুরে ঘুরে, তারপর সেই তন্বী মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে মাঠের ঘাসের উপর বসে মেয়ের পোর্ট্রেট আঁকালেন। তাঁর ঘোমটা যথারীতি তাঁকে আড়াল করলেও কিছু ফটোগ্রাফারের নজর এড়িয়ে গেল না। বাংলা সিনেমার সম্রাজ্ঞীর সঙ্গে মুনমুন। এমনই সব ঘটনায় ভরা ছিল আমাদের এই মেলা। যেমন ফিদা হুসেন খালি পায়ে মেলায় ঢুকে সবার সঙ্গে এমন আড্ডা জুড়ে দিলেন যেন এ মেলা ওঁরও মেলা, তবে সই শিকারিদের উৎপাত কাউকেই পোয়াতে হত না কারণ, এখানে যাঁরা আসছেন তাঁরা সাধারণ দর্শক আর বিশেষ যাঁরা আসছেন তাদেরও কেউ আলাদা গুরুত্ব না দেবার ফলে কেউ জানতেও পারছেন না।

    মেয়ে মুনমুনের পোর্ট্রেট আঁকাচ্ছেন সুচিত্রা সেন, এক ইংরেজি দৈনিকে বেরিয়েছিল সেই ছবি

    আমরা ভেবেছিলাম মেলায় প্রতিদিন নানা ধরনের মানুষের আগমনে যে উৎসবের পরিবেশ গড়ে উঠেছিল তার রেশ থেকে যাবে ভবিষ্যতের জন্য। প্রতিটি সংবাদপত্র প্রায় নিয়মিত নানা প্রতিবেদন প্রকাশ করত ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও অন্য এক উৎসাহ গড়ে উঠেছিল। কর্পোরেশনের উল্টোদিকে প্রায় ৫ কি ৬ বছর, এরপর রবীন্দ্র সদনের অঙ্গনে হয়েছে আরও কয়েক বছর। তারপর বন্ধ হয়ে যায় আমাদের ‘আর্ট ফেয়ার’।

    ছবিঃ অসিত পাল

    Tags:

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @