গর্বের পদযাত্রায় পা মিলিয়ে দুর্গাপুজোর বিশ্বজনীন স্বীকৃতি উদযাপন করলো কলকাতা

গত বুধবারই জানা গিয়েছিল বাঙালির জন্য গর্বের খবরটি। ইউনেস্কোর ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে দুর্গাপুজোকে। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড, ব্রাজিল, বলিভিয়ার মতো বিশ্বের মাত্র ৬ দেশের উৎসব এখনও পর্যন্ত ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পেয়েছে। এবার সেই তালিকায় যোগ হল বাংলার দুর্গাপুজো। এহেন আনন্দবার্তাকে বাঙালি উদযাপন করবে না তা কি হয়! সেকারণেই দুর্গাপুজোর সঙ্গে যুক্ত শিল্পী থেকে শুরু করে পুজোকর্তারা এই বিশ্বজনীন স্বীকৃতিকে উদযাপন করতে ২২ ডিসেম্বর অ্যাকাডেমি থেকে ডোরিনা ক্রসিং পর্যন্ত দুপুর দু'টোয় তাঁদের সঙ্গে পা মেলানোর ডাক দিয়েছিলেন। আজ সেই ‘গর্বের বার্তা হোক পদযাত্রা’ অনুষ্ঠানের সাক্ষী থাকল আপামর কলকাতাবাসী।পদযাত্রার অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন বাংলার শিল্প-সংস্কৃতির গুণীজনেরা। এছাড়া বিভিন্ন জেলা থেকে এসেছিলেন লোকশিল্পীরা। ঐতিহ্যের পুজো হোক বা শিল্পের উৎসব, তিনশো বছরের ঠাকুরদালান হোক বা তিরিশ বছরের থিমপুজোর মণ্ডপ, কলকাতার দুর্গাপুজো আজ বিশ্বের আঙিনায়। দুর্গাপুজো হল কলকাতা তথা বাংলার বিভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে সংহতি ও বিশ্বাসের প্রতিফলন। জাতি-ধর্মে-বর্ণে বাঙালির দুর্গাপুজো সর্বজনীন। এছাড়াও এই পুজোকে কেন্দ্র করে অসামান্য শিল্পের বিকাশ হয়, তৈরি হয় কম-বেশি তিন হাজার কোটি টাকার অর্থনীতি। ইউনেস্কোর সিলমোহরে তারই স্বীকৃতি মিললো এবার।
প্রসঙ্গত, এর আগে সেপ্টেম্বরে, পশ্চিমবঙ্গের তরফে পর্যটন দফতর কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রকের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছিল। পরবর্তীতে রাজ্যের প্রস্তাবকে সমর্থন করে কেন্দ্র এবং বিষয়টি ইউনেস্কোর কাছে পেশ করা হয়। এরপর বৃহস্পতিবার ইউনেস্কোর নয়াদল্লি অফিসের টুইটার হ্যান্ডেল থেকে এই স্বীকৃতির কথা নিশ্চিত করা হয়। ইউনেসকোর ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে, “দুর্গাপুজোকে ধর্ম ও শিল্পের সর্বজনীন মিলন ক্ষেত্রের সর্বোত্তম উদাহরণ হিসাবে দেখা হয় এবং সহযোগী শিল্পী ও ডিজাইনারদের জন্য একটি সমৃদ্ধ ক্ষেত্র হিসাবে দেখা হয়। এই উৎসব শহুরে এলাকায় বড়ো আকারের পালিত হয় এবং মণ্ডপগুলির পাশাপাশি উল্লেখ্যযোগ্য হল বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢাক এবং দেবীর আরাধনা।” উৎসব চলাকালীন সব শ্রেণি, ধর্ম এবং জাতিগত বিভাজন ভেঙে দর্শকদের ভিড়ের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে এবং এই গোটা প্রক্রিয়াই ভীষণভাবে প্রশংসিত হয়েছে ইউনেস্কোর দরবারে।
২০১৮ সাল থেকেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ ব্যাপারে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর প্রচেষ্টায় সরকারি উদ্যোগে উৎসবের শেষে কলকাতায় বিসর্জন কার্নিভালের সূচনা হয়। কলকাতায় বিভিন্ন সংগঠনের ছোটো ছোটো বা ব্যক্তিগত উদ্যোগ, মহিলাদের অংশগ্রহণ এই উৎসবে বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে বলে মন্তব্য করেছে ইউনেস্কো। ইউনেস্কোর ঐতিহ্যবাহী উৎসবের হেরিটেজ তকমা পাওয়ার ফলে কলকাতার দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে পর্যটনের সম্ভাবনা অনেকটাই বেড়ে গেল, এমনটাই মনে করা হচ্ছে। অতীতে এই পুজোকে কী ভাবে পর্যটনের আওতায় আনা যায় সে বিষয়ে বহু পরিকল্পনা করেছে রাজ্য সরকার। রাজ্যের পর্যটন সচিব নন্দিনী চক্রবর্তী এই সুসংবাদ শুনিয়ে বলেন, ‘২০১৮ সালে রাজ্য এই স্বীকৃতির আবেদন করেছিল। এই প্রথম এশিয়া মহাদেশের একটি উৎসবকে এমন সম্মান দেওয়া হল।’
ছবিঃ অনির্বাণ প্যান্ডালওয়ালা