No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    মনের একাকীত্বে বন্ধু হয়ে উঠছে বেহালার বাসিন্দা পার্থ মুখার্জি’র ‘কফি-আর্ট’

    মনের একাকীত্বে বন্ধু হয়ে উঠছে বেহালার বাসিন্দা পার্থ মুখার্জি’র ‘কফি-আর্ট’

    Story image

    ছোটোবেলায় খেলার ছলে ঠাকুর বানাতেন। অযাচিতভাবে কখন যে তাঁর চেতনায় শিল্পবোধ জন্ম নিয়েছিল, তা টের পাননি, সেভাবে আলাদা করে এ নিয়ে কিছু ভাববার অবকাশও আসেনি। কিন্তু ফুল, পাতা, আবীর, আলতা -হাতের নাগালে পাওয়া এসব সহজলোভ্য জিনিস দিয়ে রং বানিয়ে মনের খেয়ালে আঁকিআঁকি করাটা নেশায় পরিণত হয়েছিল। যে নেশা আজও ছাড়তে পারেননি আইটি কোম্পানিতে চাকরিরত বেহালার বাসিন্দা পার্থ মুখার্জি (Partha Mukherjee)। বিগত কয়েক মাসে তিনিই আবার হয়ে উঠেছেন ‘কলকাতার কফিম্যান’ (Kolkata coffee man)। কেন এবং কীভাবে সেই কথাতেই আসছি।

    প্রথাগত চিত্রকর্ম বা নিয়মমাফিক রং ব্যবহার করে ছবি আঁকার থেকে বরাবরই তাঁর ঝোঁক ছিল একটু অন্যরকমভাবে নিজের শিল্পকর্ম সাজিয়ে তুলতে। প্রাকৃতিক-দৈনন্দিন ব্যবহারের বিভিন্ন উপাদানের নির্যাস থেকে ছবি আঁকার জন্য রং বানিয়ে ফেলাটাও তাঁর বিশেষ ভালো লাগার জায়গা। সেভাবেই বেশ কয়েক বছর আগে শুরু করেছিলেন কফি দিয়ে ছবি আঁকা। তাঁর ‘কফি-আর্ট’-এর সূচনা সেই থেকেই। তখন এই কফি-আর্টের কথা অবশ্য পরিচিত মহলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বছর দুই আগে, করোনা-লকডাউনের সময় ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় অসহায়, বিপর্যস্ত মানুষদের জন্য বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন পার্থবাবু। সেইসময়ই ত্রাণ-তহবিলের জন্য কফি দিয়ে আঁকা বেশ কিছু ছবি নিয়ে একটি প্রদর্শনী করেছিলেন। তারপর আর থামতে মন চায়নি তাঁর। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর এই কফি-আর্ট মানুষের জন্য বিশেষ কিছু করুক। তিনি দেখলেন, লকডাউন-পরবর্তী সময়ে মানুষ আরও বেশি করে একা হয়ে পড়েছে, মন খারাপ যেন নিত্যসঙ্গী। পথ পেলেন তিনি। প্রথমে পরিচিত মহলে তারপর ধীরে ধীরে অপরিচিতদের সঙ্গে ভাগ করে নিলেন তাঁর ভাবনা। বললেন, “কফি খেতে খেতে আমার সঙ্গে কিছুক্ষণ সময় কাটান, মনের কথা ভাগ করে নিন। আমি চেষ্টা করবো আপনার অনুভূতিকে কয়েক মিনিটের মধ্যেই কফি-আর্টে বদলে দিতে।”

    সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর এই আবেদন ছড়িয়ে পড়তে সময় লেগেছিল। একজন-দু’জন করে ধীরে ধীরে আগ্রহীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। আর এভাবেই একদিন তাঁর পরিচিতি তৈরি হল ‘কলকাতার কফিম্যান’ হিসেবে। বলা ভালো, ‘কলকাতার কফিম্যান’ নামে একটি মিশন চালু করে ফেলেছেন তিনি।

    এভাবে মানুষের মনের কথা শুনে কফি দিয়ে ছবি আঁকতে গিয়ে বিশেষ কোনো অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হননি? “হ্যাঁ, অবশ্যই। প্রচুর মানুষের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে বিগত ৮ মাসে, যাঁদের সঙ্গে আগে পরিচয় ছিল না। এই কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি। কেউ কেউ নিজের কথা ভাগ করে নিতে নিতে সামলাতে না পেরে অঝোরে কেঁদেছেন। আবার, আমার ছবি আঁকা শেষ হওয়ার পর, কফি-আর্টে নিজের অনুভূতি বা প্রতিকৃতি দেখে সেই মানুষই একগাল হাসি নিয়ে, মন হালকা করে বাড়ি ফিরে গেছেন। এটাই আমার উপার্জন।” বঙ্গদর্শন-কে বলেন পার্থবাবু।

    ক্যানভাসে, কাগজে বা ওয়াল পেন্টিং, গ্লাস পেন্টিং করে থাকেন তিনি। তবে সবচেয়ে ভালোবাসেন বোধহয় পোর্ট্রেট আঁকতে। তাঁর সোশাল মিডিয়ার টাইমলাইনও সেই কথাই বলে। পরিচিত, অপরিচিত মুখের পাশাপাশি জনপ্রিয়-কেউকেটাদের প্রতিকৃতিও কফি-আর্টের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন পার্থ মুখার্জি। বেশি অনুরোধ আসে পোর্ট্রেট আঁকার। আর পার্থবাবুও মুখিয়ে থাকেন এই প্রস্তাবের জন্য এবং তৎক্ষণাৎ কফি দিয়ে এঁকে দেন পোর্ট্রেট।

    পার্থবাবুর করা কফিআর্ট-পোর্ট্রেট হাতে নিয়ে হাতে  'তোপসে' ওরফে সিদ্ধার্থ চ্যাটার্জি

    পার্থবাবুর করা কফিআর্ট-পোর্ট্রেট হাতে নিয়ে  সন্দীপ রায়

    “শুধু ক্যাফেতে বসেই কফি দিয়ে ছবি আঁকি এমনটা নয়। বাড়িতে, রাস্তায়, ময়দানে যে যেখানে যেমন ডাক পাই চলে যাওয়ার চেষ্টা করি। ছবি আঁকার জন্য বিভিন্ন ধরনের কফি ব্যবহার করেছি আমি। কফির দানাগুলোকে আমি এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে যাই যাতে সেগুলোতে পচন না ধরে। যে কাগজের ওপর আমি আঁকি সেটাও একটু অন্য ধরনের। তবে রাস্তায় বা ক্যাফেতে হঠাৎ অনুরোধ এলে তক্ষুণি একটা কফির প্যাকেট কিনে জল মিশিয়ে ছবি এঁকে দিই। কফির রং এবং টেক্সচার আমার খুবই প্রিয়” বলেন কলকাতার কফিম্যান।

    ছবি আঁকার জন্য পারিশ্রমিক নেন না? “আমি তো বলি এক কাপ কফি আমার হাতে তুলে দিলেই চলবে (হেসে)। এছাড়া কেউ যদি নিজে থেকে কিছু দেয়, সেটা নিই।”   

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @