১৫০ বছরে আলিপুর চিড়িয়াখানা

কমলালেবু, নলেন গুড়, বড়োদিনের কেক, সার্কাস আর চিড়িয়াখানা; এই নিয়েই বাঙালির শীত যাপন। গুটি গুটি পায়ে দেড়শো বছর অতিক্রম করে ফেলল বাঙালির শীত বিলাসের অন্যতম উপাদান আলিপুর চিড়িয়াখানা। দেশের ১৬৬টি চিড়িয়াখানার মধ্যে সেন্ট্রাল জু অথরিটির তালিকায় চতুর্থ স্থানে রয়েছে আলিপুর চিড়িয়াখানা। ১৮৭৫-র ২৪ সেপ্টেম্বর পথ চলা শুরু করেছিল আলিপুর জুলজিক্যাল গার্ডেন। তদানিন্তন সময়ে নাম ছিল প্রিন্স অব ওয়েলস জুলজিক্যাল গার্ডেন। ১৮৭৬ সালের পয়লা জানুয়ারি প্রিন্স অব ওয়েলস অর্থাৎ রাজা সপ্তম এডওয়ার্ড কলকাতা ভ্রমণের সময় উদ্বোধন করেছিলেন চিড়িয়াখানার। ১৮৭৬-র ৬ মে আম জনতার জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল চিড়িয়াখানার দরজা।
আলিপুর চিড়িয়াখানায় রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে কলকাতায় চিড়িয়াখানা স্থাপনের ভাবনা চিন্তা শুরু হয়। ১৮৭৫ সালে বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যর রিচার্ড টেম্পলের আমলে জিরাট ব্রিজের দু-ধারে বস্তি সরিয়ে চিড়িয়াখানার জন্য জমি দেওয়া হয়। তারপর চাঁদা সংগ্রহ শুরু হয়। প্রায় দুই লক্ষের বেশি টাকা চাঁদা ওঠে। গড়ে ওঠে ভারতের প্রথম বিজ্ঞানসম্মতভাবে তৈরি চিড়িয়াখানা।
দেশের ১৬৬টি চিড়িয়াখানার মধ্যে সেন্ট্রাল জু অথরিটির তালিকায় চতুর্থ স্থানে রয়েছে আলিপুর চিড়িয়াখানা। ১৮৭৫-র ২৪ সেপ্টেম্বর পথ চলা শুরু করেছিল আলিপুর জুলজিক্যাল গার্ডেন। তদানিন্তন সময়ে নাম ছিল প্রিন্স অব ওয়েলস জুলজিক্যাল গার্ডেন।
ঔপনিবেশিক বাংলার একমাত্র চিড়িয়াখানা ছিল বারাকপুরে। বয়সে তা লন্ডন পশুশালার থেকেও প্রাচীন। সেখান থেকে আলিপুরের চিড়িয়াখানায় স্থানান্তরিত করা হয় কিছু পশু। চিড়িয়াখানা পরিচালন কমিটির অন্যতম সদস্য জার্মান প্রযুক্তিবিদ কার্ল লুইস শোয়েন্ডলার নিজের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে কিছু প্রাণী দান করেছিলেন। আজও তাঁর স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে চিড়িয়াখানায়। ভারতীয়দের মধ্যে রাজা রাজেন্দ্র মল্লিক চিড়িয়াখানার পশুদের প্রথম আবাসগৃহ মল্লিক হাউস তৈরিতে দান করেন। বর্ধমান রাজের অর্থ সাহায্য তৈরি হয় বর্ধমান হাউস। একে একে সমৃদ্ধ হয় চিড়িয়াখানা। চিড়িয়াখানার প্রথম ভারতীয় অধিকর্তা রামব্রহ্ম সান্যালের আমলে উন্নতির শিখরে পৌঁছয় আলিপুর পশুরালয়।
অধ্যাপক তথা শিবপুরের বটানিক্যাল গার্ডেনের অধিকর্তা জর্জ কিং, ছাত্র রামব্রহ্মকে আলিপুর চিড়িয়াখানায় কেরানির চাকরি জুটিয়ে দেন। মেধাবী রামব্রহ্ম একের পর এক পদোন্নতি পেয়ে অধিকর্তার পদে আসেন। তাঁর অন্যতম সাফল্য ছিল, চিড়িয়াখানার অভ্যন্তরে পশুদের প্রজনন ঘটানো। নিজ উদ্যোগে আলিপুর চিড়িয়াখানায় কৃত্রিম প্রজনন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছিলেন রামব্রহ্ম। তাঁর তত্ত্বাবধানেই ১৮৮৯ সালে সুমাত্রার গণ্ডার শাবকের জন্ম দেয়। ইতিহাসের পাতায় সেদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয় আলিপুর চিড়িয়াখানার নাম। রামব্রহ্মের কাজে মুগ্ধ হয়ে নিজের বেশ কিছু পোষ্য চিড়িয়াখানায় দান করেছিলেন ওয়াজিদ আলি শাহ্। তাঁর আমলেই অন্যান্য চিড়িয়াখানার সঙ্গে জীবজন্তু ও পাখির ‘ফ্রেন্ডলি এক্সচেঞ্জ’ আরম্ভ হয়। আফ্রিকা থেকে সিংহ আনিয়ে চিড়িয়াখানায় রেখেছিলেন রামব্রহ্ম।
আলিপুর চিড়িয়াখানায় মাউস ডিয়ার
সার্ধশতবর্ষে অর্থাৎ চলতি বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর চিড়িয়াখানার প্রাণপুরুষ রামব্রহ্ম সান্যালের মূর্তি উন্মোচন করা হয়। প্রপিতামহের মূর্তিতে মালা দেন সোমনাথ সান্যাল। ১৫০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠান এক বছর ধরে চলবে, নানান কর্মসূচিও নেওয়া হচ্ছে। ২৪ সেপ্টেম্বর চিড়িয়াখানায় উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের বনমন্ত্রী বিরবাহা হাঁসদা, কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম, বনদপ্তরের আমলারা এবং নানান ক্ষেত্রের বিশিষ্ট জনেরা। অতীতে যাঁরা বিভিন্ন সময়ে আলিপুর চিড়িয়াখানার অধিকর্তার পদ সামলেছেন, তাঁরাও আমন্ত্রিত ছিলেন।
কলকাতা চিড়িয়াখানার ১৫০ বছর-এর জন্মদিনে আলিপুর রোড ও ন্যাশনাল লাইব্রেরি রোডে দুটি নতুন ফটকের উদ্বোধন করা হয়েছে। সুউচ্চ ফটকের শীর্ষে রয়েছে হাতির মাথার প্রতিকৃতি। প্রকাশিত হয়েছে দুটি বই। একটি বই, আলিপুর চিড়িয়াখানার ইতিহাস সমৃদ্ধ স্মরণিকা। অন্যটি চিড়িয়াখানার প্রাক্তন অধিকর্তা আশিসকুমার সামন্তর লেখা ‘আলিপুর চিড়িয়াখানার সাতকাহন’। বইগুলোতে উঠে এসেছে চিড়িয়াখানার বহু অজানা কাহিনি। এছাড়াও বেঙ্গল ফক্স ও লেপার্ড ক্যাটের দুটি এনক্লোজারের উদ্বোধন করা হয়।
আলিপুর চিড়িয়াখানায় মালায়ান টাপির
সার্ধশতবর্ষ উপলক্ষ্যে চলতি বছর চিড়িয়াখানায় মাউস ডিয়ার, মালায়ান টাপির মতো বেশ কিছু প্রাণী আনা হয়েছে। উল্লেখ্য, এই মুহূর্তে ভারতের অন্য কোনও চিড়িয়াখানায় মালায়ান টাপির নেই। আগামী এক বছরে চিড়িয়াখানায় আরও নতুন অতিথির আগমন ঘটবে। জানা গিয়েছে, আফ্রিকান লায়ন, গ্রিন অ্যানাকোন্ডা, সিল আনার পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের। সাপ এবং পাখিদের এনক্লোজারের খোলনলচে বদলে ফেলার পরিকল্পনাও রয়েছে। সব মিলিয়ে ভোলবদল হবে দেশের অন্যতম প্রাচীন চিড়িয়াখানার।
পলাশির পর সাহেবরা বাংলায় জাঁকিয়ে বসেছিল, নিজের মনের মতো করে তাঁরা সাজিয়ে তুলেছিল কলকাতাকে। শহরকে গড়ে তোলার তাগিদে নেওয়া নানান পরিকল্পনার মধ্যেই চিড়িয়াখানা তৈরির ভাবনা শুরু হয় এবং বাস্তবায়িত হয়। তারপর কেটে গিয়েছে দেড় শতক, একের পর এক পালক যুক্ত হয়েছে আলিপুর জু-র মাথায়। মাত্র ৩১টি বন্যপ্রাণী নিয়ে যে পশুশালার যাত্রা শুরু হয়েছিল আজ তার সদস্য সংখ্যা দু-হাজার ছাড়িয়েছে। শহরের গৌরব হয়ে উঠেছে আলিপুর চিড়িয়াখানা।