আমার কুটিরের কাঁথা-কোস্টার : বুনন শিল্পে রয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস

বিগত কয়েক যুগ ধরে কাঁথাশিল্প যেন এক সেতু গড়ে তুলেছে বাংলার উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত সম্প্রদায়ের মধ্যে, গ্রামবাংলার অতিসাধারণ ও শহরের অত্যাধুনিক মানুষের মধ্যে। টুকরো কাপড় একত্রে জুড়ে, তার উপর সমান দূরত্বে রান সেলাই দিয়ে নানাবিধ ছবি ফুটিয়ে তোলাই কাঁথাশিল্পের মূলমন্ত্র। এককালে গ্রামের সাধারন মেয়েদের মতোই অত্যন্ত যত্ন নিয়ে এই সেলাইয়ের চর্চা করত জমিদারবাড়ির মহিলারা। জমিদার বাড়ির বৌদের কাছে এ সেলাই ছিল অলস সময় পার করার মাধ্যম মাত্র। অন্যদিকে, গ্রামের মেয়েদের রুটিরুজি জোগাত এই কাঁথাশিল্প। এই প্রাচীন সেতুই পুনর্নির্মাণের কাজে হাত দিয়েছে ‘দ্য বেঙ্গল স্টোর’ (The Bengal Store)। কাঁথার কাজ করা নানান রকম নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের সম্ভার ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব তুলে নিয়েছে এই সংস্থাটি।
মাউজের একটি ক্লিকেই এই ওয়েবসাইট’টি থেকে আপনি কিনে নিতে পারেন কাঁথার কাজ করা সুদৃশ্য কোস্টার। নানা রঙ ও ডিজাইনের এই কোস্টারগুলি আপনার বাড়ির টেবিলটিকে মুহূর্তে রঙিন করে তুলবে। কোস্টার সাধারণত তৈরি হয়, এমন কোনো বস্তু দিয়ে, যা উত্তাপকে প্রবাহিত করে না বরং শুষে নেয়। এটি একদিকে যেমন আপনার বাড়ির টেবিলটিকে গরম গ্লাস বা বাটির উত্তাপ থেকে বাঁচাবে, তেমনই গ্লাসের পানীয় ময়লা বা ধুলোর হাত থেকে বাঁচাতেও কোস্টার দিয়ে ঢেকে রাখা যেতে পারে। সবথেকে উল্লেখযোগ্য হল, কোস্টারগুলির দাম একেবারেই সাধ্যের মধ্যে। বাড়ির বসার ঘর বা খাবার ঘর সাজিয়ে তুলতে এমন সামগ্রীর জুড়ি মেলা ভার। উপহার দ্রব্য হিসাবেও এই রঙচঙে কোস্টারগুলি যে কারুর পছন্দ হতে বাধ্য!
বাংলার সূচিশিল্পগুলির মধ্যে অন্যতম প্রাচীন কাঁথা, যার শিকড় খুঁজতে বসলে প্রাক-বৈদিক যুগে পৌছে যেতে হয়। রান সেলাইয়ের এক বিশেষ ধাঁচ, এবং ছোটো কাপড়ের টুকরো জুড়ে জুড়ে বড়ো কাপড় তৈরি করা – দুইই কাঁথাশিল্প নামে পরিচিত। ঠিক যেমনভাবে কাশ্মীরের সূচিশিল্পের কথা বলতে গেলেই কার্পেটের নাম আসে, তেমনই কাঁথার নামটি ওতপ্রোত ভাবে জুড়ে গিয়েছে বাংলার সাথে। তাই তো বাংলায় বসেই কবি জসিমুদ্দিন মাইলের পর মাইল বিস্তৃত জমিকে, মৃত স্বামীর কবরের পাশে বসে থাকা এক মহিলার হাতে বোনা নকশী কাঁথার সঙ্গে তুলনা করেছেন।
শান্তিনিকেতনে গড়ে ওঠা আমার কুটির সোসাইটি ফর রুরাল ডেভলপমেন্ট-এর মূলমন্ত্র হল নানা ধরনের প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামের মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পীদেরকে তাদের শিল্পে আরও বেশি দক্ষ করে তোলা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একসময় শান্তিনিকেতনের শিল্পীদের উন্নয়ন নিয়ে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাকেই এগিয়ে নিয়ে চলেছে এই সংস্থাটি। কাঁথার কাজ করা কোস্টার ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের শিল্পদ্রব্য তৈরির মাধ্যমে সংসার চলে এখানকার শিল্পীদের পরিবারের। এমনকি কোভিডের সময়েও ‘হট কচুরিজ’-এর মতো রমরম করে বিক্রি হয়েছিল এই সামগ্রীগুলি। শিল্পীদেরকে তাঁদের শিল্পই বাঁচতে সাহায্য করেছিল মহামারীকালীন অস্থির সময়ে।
আর এই ‘আমার কুটির’ই এখন ‘দ্য বেঙ্গল স্টোর’-এর হাত ধরে নানান হস্তশিল্পজাত দ্রব্য পৌছে দিচ্ছে বাংলার ঘরে ঘরে। দ্য বেঙ্গল স্টোরই হল একমাত্র অনলাইন স্টোর, যেখানে আমার কুটিরজাত শিল্পদ্রব্যগুলি সারা বিশ্বের জন্য উলপব্ধ করা হয়েছে। এগুলি ছাড়াও দ্য বেঙ্গল স্টোরে পাওয়া যাচ্ছে ঘর সাজানোর বিবিধ সামগ্রী, কেমিক্যাল ও প্রিজারভেটিভমুক্ত খাবার, সেরামিক্স ও প্রিন্টস, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, দুস্প্রাপ্য বই ও ছবি ইত্যাদি।
স্বাধীনতা সংগ্রামী সুষেন মুখার্জির সহায়তায় ১৯২৭ সালে কোপাই নদীর ধারে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল ‘আমার কুটির’। মহাত্মা গান্ধির জীবনদর্শনে অনুপ্রাণিত হয়ে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করতে সে সময় শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন সুষেন। ব্রিটিশ পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে কোনো এক উপযুক্ত নিরিবিলি জায়গার খোঁজ করছিলেন তিনি, আর বীরভূম জেলায় কোপাই নদীর ধারে মনমতো সেই জায়গা তিনি খুঁজে পান। যদিও, তিল তিল করে গড়ে ওঠা এই কুটিরশিল্পের আকরটিকে ১৯৩০ সালে কব্জা করেছিল ব্রিটিশ পুলিশ। সুষেন মুখার্জিকে বন্দি করে তারা পাঠিয়েছিল জেলের গরাদের পিছনে।
১৯৩৯ সালে যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, আমার কুটির-এর সঙ্গে যুক্ত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের হাত ধরে সংগঠিত হয়েছিল বেশ কিছু কৃষক আন্দোলন। ১৯৪২-এর ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের সময়ে এমন কিছু আন্দোলন সক্রিয় ছিল। স্বাধীনতার পর, কমলাক্ষ বোস এগিয়ে নিয়ে যান সুষেন মুখার্জির স্বপ্নকে। ‘আমার কুটির’কে গড়ে তোলা হয় একটি কোওপারেটিভ হিসাবে, যা কাজ করবে স্থানীয় শিল্পীদের উন্নয়নসাধনের উদ্দেশ্যে।
ফলত, এমনটা বলাই যেতে পারে যে, কাঁথা কোস্টারগুলি কেবলমাত্র একটি ঘর সাজানোর জিনিস নয়, এতে সুতোর প্রতিটি ফোঁড়ে গেঁথে দেওয়া হয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস। বাংলা যখন সংগ্রামের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল, সে সময়ের জ্বলন্ত দলিল এগুলি।
অনলাইনে কোস্টারগুলি কিনতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন।