যে গ্রামে ঘুম ভাঙায় কাঞ্চনজঙ্ঘা, হেঁটে বেড়ায় লেপার্ড

হঠাৎ হঠাৎ শরীর ভিজিয়ে উড়ে যাচ্ছে মেঘ। হোম স্টের জানলা দিয়েই দিব্যি দেখা যাচ্ছে মেঘেদের ছোঁয়া-ছুঁয়ি খেলা। সময় তখন গড়িয়ে চলেছে বিকেলের দিকে। মেঘেরা উড়ে পালাতেই হঠাৎ পরিষ্কার হয়ে এল চারপাশ। খানিক আগেই দু’হাত দূরের গাছটাকেও দেখা যাচ্ছিল না। আর এখন, ঐ দূরের পাহাড়টাও দিব্যি স্পষ্ট। তার পিছনে সন্ধে করে আসছে আকাশ। অলীক রঙের খেলা। আজ সারাদিন আকাশের মুখভার ছিল বলে এতক্ষণ দেখা দেয়নি, আলো ফুরিয়ে আসার মুখেই একঝলক উঁকি দিয়ে যাচ্ছে সোনার পাহাড়। কাঞ্চনজঙ্ঘা। স্থানীয়দের বিশ্বাস বুদ্ধ শায়িত ওখানে।
অলীক সন্ধের রঙ
চটকপুর। সোনাদার ওপরে একটা ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম। সিঞ্চল ফরেস্টের গায়ে। দার্জিলিং থেকে ২৬ কিমি, সোনাদা থেকে দূরত্ব সাড়ে সাত কিমি। এই গ্রামে বাস করেন মেরেকেটে ৮০-৯০জন মানুষ। ক’দিন আগেও থাকার জায়গা বলতে ছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ইকো রিসর্ট। একদম সিঞ্চল ফরেস্টের প্রবেশদ্বারে। চটকপুর গ্রামের ঠিক নিচটায়। বাঁহাতে ঘন পাইনের রাজত্ব শুরু। আরও খানিক এগোলেই সরাসরি বনের মধ্যে পা রাখতে পারবেন। থাকার জায়গা কম বলেই হয়তো চটকপুর তুলনায় অনাঘ্রাতা ছিল দীর্ঘদিন। কিন্তু, বিগত কয়েক বছর ধরে গ্রামের ওপরেই গড়ে উঠেছে একের পর এক হোম স্টে। অনেকটা সিলারি, ইছে গাঁও, তিনচুলের ধাঁচে। মাথা-পিছু থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা। দুর্গম চটকপুর তাই ইদানীং ডাক পাঠাচ্ছে অনেক বেশি পর্যটককে।
ওয়াচ টাওয়ারে যাওয়ার পথ
চটকপুর ঘোরের বাঁধনে বাঁধবেই। দার্জিলিং থেকে সোজা পথে যেতে ঘন্টা দেড়-দুই। তাই হয়তো ঠিক করলেন খানিক ঘুরপথে উঠবেন। মংপু হয়ে, বগুরা হয়ে গা ছমছমে বন্য পথে অবশেষে এল চটকপুর। পথেই দেখা হয়ে গেল একপাল ত্রস্ত হিমালয়ান ডিয়ারের সঙ্গে। হরিণের পিছু পিছু এই পথে আসে লেপার্ডও। বছর দুই আগেই রাস্তা থেকে এক গ্রামবাসীকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল শ্বাপদ। ড্রাইভার সেই কথা মনে করিয়ে দিতেই আপনার গা ছমছমে ভয় আরও বেড়ে যাবে কয়েকগুণ।
গ্রামের নিচে বন
কিন্তু, এরপরে যখন গ্রামে পৌঁছোবেন, মনেই হবে না হিংস্র আদিমতা ঘিরে আছে আপনাকে। উচ্চতায় প্রায় ৮,০০০ ফুট। সারাবছরই শীতের রাজ্য এই গ্রাম। দু’পাশ জুড়ে বন। রাজকীয় পাইন কোঁকড়া চুলের মাথা নিয়ে দাঁড়িয়ে গ্রামের ঠিক নিচেই। আর, সামনে পাহাড়ের পর পাহাড়ের ঢেউ। সেই ঢেউ কোথায় শেষ হয়েছে জানা নেই, শুধু আকাশের গায়ে শেষ সীমানায় টাঙানো রয়েছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। মহারাজকীয়।
চটকপুর
গ্রামের ঘরে ঘরে দেশি মুরগির ঝাঁক, বড়ো এলাচের ক্ষেত। এক ঘরের উঠোন বেয়েই সিঁড়ি অন্য ঘরে যাওয়ার। পাহাড়ের ধাপে ধাপে চাষ। ধোঁয়া উড়ছে কোত্থেকে একটা। দু’এক পশলা বৃষ্টিতে আরও সবুজ রঙের পোঁচ লেগেছে গোটা গ্রামেই। গ্রামের প্রত্যেকটা মানুষের মুখেই এক আকাশ সারল্যের হাসি। হাঁটতে হাঁটতে হাঁফ ধরলে আপনাকে তাঁর বাড়ির উঠোনেই বসতে বলবে নরবু। বাড়িয়ে দেবে গরম চায়ের কাপ। আপনি লজ্জায় না করলেও শুনবে না। আপনার হাতে কেন লাঠি নেই—বলে গজগজ করবে। তারপর, পাশ থেকেই জোগাড় করে এনে দেবে একটা শক্ত লাঠি। ভাঙা হিন্দিতে আপনাকে বুঝিয়েই ছাড়বে, বৃষ্টি হলে জোঁকের ভয় থাকে। ফলে, বনে ঢোকার সময় সাবধান।
প্রকৃতির মর্জি এখানে রাজার মতো। ইচ্ছে হলেই বৃষ্টি, সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া। সব ঝাপসা তখন। তারপর মেঘ কেটে গেলেই কাঞ্চনজঙ্ঘা। গ্রামের মাথায় ওয়াচ টাওয়ার। সেখানে ওঠার সিঁড়িটার পাথুরে খাঁজে খাঁজে বাহারি বুনো ফুল। সেই ওয়াচ টাওয়ার থেকে দেখা যায় অনেক নিচের সমতল। দেখা যায় সান্দাকফুও। আর, ভোরবেলায় কাঞ্চনজঙ্ঘার ঘুম-ভাঙানো সূর্যোদয়ে চটকপুর যে কোনও দিন হারিয়ে দেবে টাইগার হিলকে। আর, এখানে সেই অলৌকিক সূর্যোদয়ে এসে মিশবে না কোলাহলের ঝাঁক, ভিড়। বড়ো নিবিড়, বড়ো পবিত্র সেই প্রথম সূর্য।
বাহারি শুঁয়োপোকা
চটকপুর গ্রামটা ছোট্ট। কিন্তু, পায়ে হেঁটে ঘুরলে নেশা লাগবেই। প্রতিটা বাড়িতে সাজানো রং-বেরঙের ফুল, অর্কিড। পিছু ছাড়তেই চাইবে না লাইকা। হামরো হোমের পোশ্য। ঘন সোনালি লোম। যখন চাইবেন তখনই চা এনে দেবেন লাকপা দিদি। হাঁটতেই হাঁটতেই কখন শেষ হয়ে যাবে গ্রাম। নিচের রাস্তা ধরে ডানদিক-বাঁদিক যেদিকেই যাওয়া যায়, জঙ্গল। ডানদিকে পাইনের সারি পেরিয়ে, সেইসব পাইনের ফাঁকে আটকে থাকা কুয়াশার বিভ্রমে খানিক থমকে দাঁড়িয়েই আপনি হাঁটা লাগাবেন কালিপোখরির দিকে। একটা ছোট্ট জলাশয়। জল ঘন কালো। পবিত্র জল, মনে করেন স্থানীয়রা। ইতি-উতি পুজোর ছাপ স্পষ্ট। এখানেই বাস হিমালয়ান স্যালামান্ডারের। পৃথিবীর প্রাচীনতম জীবিত প্রজাতিদের মধ্যে অন্যতম এই স্যালামান্ডার। দেখতে অনেকটা গিরগিটির মতো। তবে, এদের দেখা পেতে ঢের অপেক্ষা করতে হবে আপনাকে। সেই অপেক্ষার ফাঁকেই আপনার চোখে পড়বে গোলাপি রঙের ব্যাঙ, অদ্ভুত রঙের শুঁয়োপোকা, পাখি। চারপাশে অসংখ্য নাম না জানা গুঁড়ি-গুঁড়ি ফুল। পাহাড়ি অরণ্য তার সমস্ত আদিমতার রহস্য উপুড় করে দিয়েছে এখানে।
বনগ্রামের পথ
আপনি ট্রেক ভালোবাসলে পায়ে হেঁটে চলে যেতেই পারেন টাইগার হিল। তবে, সঙ্গে গাইড নিতেই হবে। ট্রেক করে চলে যাওয়া যায় মংপুও। আর, সেসব ঝোঁক না থাকলে দু-তিনটে দিন বসে থাকুন চটকপুরে। কথা বলুন গাছ-গাছালির সঙ্গে। আকাশ-জোড়া কাঞ্চনজঙ্ঘা যখন ঘুম ভাঙাবে, তখন মনে করুন—এসবই আসলে রূপকথা। এসব আসলে ঘটছেই না আপনার জীবনে। হঠাৎ করে উড়ে আসা মেঘ, সেই মেঘেরই মতো উড়ে আসা নিমফুটি নামে গ্রাম্য কিশোরীর গান, গুরাসের রস খাওয়ার জন্য আপনাকে পীড়াপীড়ি করা লোকসাম, গুচ্ছের ফুল, সন্ধের ঘন হয়ে আসা শীতে রান্নাঘরের আগুন... সমতলে নেমে এলেও চটকপুর আপনার পিছু ছাড়বে না।
মহারাজ, এ কী সাজে-- ভোরবেলায়
আর, নেমে আসার পথটিও সহজে ভুলতে পারবেন না আপনি। সোনাদা নামার পথেই পড়বে ওল্ড কার্ট রোড। এই পাহাড়ে আসার পুরোনো রাস্তা। স্থানীয় প্রবাদ—ওই রাস্তায় নাকি এখনও পরীরা আসে। শহুরে মানুষের চোখ তাদের দেখা পায় না। দেখা পেতে গেলে ভিতরে নেশা জমা হতে হয় খুব। চন্দ্রাহত হয়ে পায়ে হেঁটে ঘুরতে হয় এইসব পথ ধরে। লেপার্ডের ভয়? শুনেই হাসতে থাকে চ্যাংমা। লেপার্ডও পথ ছেড়ে দেবে পরীকে দেখলে। কিচ্ছু হবে না। ‘দেখলেন না, আজ যখন মেঘ করে এসেছিল খুব। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছে না বলে মনখারাপ করছিলেন আপনারা, তখন কেমন মন্তর করে মেঘ সরিয়ে দিলাম! এসবই মন্তরের খেলা।’ বিশ্বাস করুন বা না-ই করুন, এই মন্ত্র আপনাকে খুব টানবে। আপনি অসহায় হয়ে দেখবেন আপনারই মতো আরও অসংখ্য পর্যটক ভিড় জমাচ্ছে এই রহস্যের দেশে। কেউ-কেউ চাইছে সোচ্চারে ক্যাম্প ফায়ারের আয়োজন। বনের শান্তি ভাঙছে রোজ। যদিও, এখনও ১৫ জুন থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর বন্ধ থাকে এই গ্রামের রাস্তা। বন্য প্রাণীদের প্রজনন মাস। ওইটুকুই রক্ষাকবচ আজও। বাকিটা-- পরী, অপার্থিব শান্তিতে কুয়াশা জড়িয়ে থাকা বন, পাহাড়, আকাশের গায়ে ঐ কাঞ্চনজঙ্ঘা—সবটাকেই বড়ো গিলে নিতে চাইছি আমরা। অথচ, চটকপুর না গেলেও নয়। এ ভারি দ্বন্দ্বের খেলা।
চ্যাংমা শুনলেই হয়তো বলত, ‘কোনও প্রবলেম নেই। মন্তর পড়ে দেব।’
কীভাবে যাবেন?
এনজেপি স্টেশন বা বাগডোগরা থেকে গাড়িতে। দার্জিলিং থেকেও আসতে গেলে গাড়িপথেই আসতে হবে।
কোথায় থাকবেন?
সরকারি ইকো রিসর্ট। কিংবা, গ্রামেই রয়েছে হোম স্টে। বুক করে যাওয়াই ভালো।
কখন যাবেন?
সেরা সময় অক্টোবর থেকে মার্চ। তবে, গ্রীষ্মেও যেতেই পারেন। মেঘের দেখা মিলবে এইসময়ে।