No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    দশ বছর বয়সে অভাবের তাড়নায় থিয়েটারে যোগ দেন কানন, সিনেমা তখনও শব্দহীন

    দশ বছর বয়সে অভাবের তাড়নায় থিয়েটারে যোগ দেন কানন, সিনেমা তখনও শব্দহীন

    Story image

    অসম্ভব সু্ন্দরী নায়িকা তিনি। ভালো গানও গাইতেন। সৌন্দর্য যদি কোনও গুণের মধ্যে নাও পড়ে, তবু অভিনয় দক্ষতা আর সুরেলা কণ্ঠস্বরের জেরে তিনি অবলীলায় খুব ‘নাকউঁচু’ জীবন যাপন করতে পারতেন। অথচ তিনি সারাজীবন সাধারণের ধরাছোঁয়ার মধ্যে থাকলেন। বিখ্যাত হওয়ায়, সবরকম স্তুতি ও স্টারডমের লেজুড় স্বরূপ সব কেচ্ছার মধ্যেই জীবন কাটালেন। একাধারে নায়িকা, গায়িকা, প্রযোজক, বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অভিভাবক; জীবন তাঁকে বিবিধ ক্ষেত্রে বিভিন্ন ভূমিকা পালনের সুযোগ দিয়েছিল। আর সবটাই তিনি সামলেছেন রানির মতোন। তাঁকে দেখেই সাহস করে সিনেমায় নেমেছিল ভদ্রঘরের মেয়েরা। কারণ তিনিই বাংলা সিনেমার প্রথম সফল ও তারকা অভিনেত্রী কাননদেবী। গোটা জীবনটাই যার একটা লং টেক।

    ওই যে বললাম, তাঁর জীবন গল্পকেও হার মানায়। শুরুর শুরুতে কেবল এ কথা ও কথার জোড়াতালি। কারণ, কাননবালার জন্মের সাল, তারিখ কেউ জানে না। বাবার পরিচয় জানা নেই। জন্মস্থান নিয়ে নানা মত। এসব ‘মনে হয়’ এবং ‘নাকি’র রকমফের শেষে স্থির হয় কানন দেবীর জন্ম ১৯১৬-এর ২২ এপ্রিল। কেন এমন ‘ধরে নেওয়া’!  তার একটা স্পষ্ট ধারণা মেলে তাঁর আত্মজীবনী ‘সবারে আমি নমি’-তে। পড়তে পড়তে মনে হয় কোনও ট্রাজেডির  চিত্রনাট্য পড়ছি। কাননদেবীর নিজের কথা আর বহুজনের কাছে ছড়ানো বহু সম্ভাব্য একত্র করে লেখা মেখলা সেনগুপ্তের ‘কানন দেবীঃ দ্য ফার্স্ট সুপারস্টার অফ ইন্ডিয়ান সিনেমা’ থেকে জানা যায় বালিকা কাননকে প্রথম পাওয়া যায় হাওড়ার এক গরীর পল্লীতে। জনশ্রুতি মা বাঈজী, বাবা দর্জি। আবার আর একটা জনশ্রুতি রাজবালা দেবী ও রতনচন্দ্র দাসের আশ্রয়ে বড়ো হন কানন। নিজের আত্মজীবনীতেও এঁদেরই মা, বাবা বলে পরিচয় দিয়েছেন কাননদেবী। পালিতা মা ও বাবার হয়তো কোনওদিন সামাজিক বিয়ে হয়নি একথাও জানতেন কানন। কিন্তু এত কিছু জানা আর না জানার মধ্যে একটা জিনিস বিশ্বাস করতেন, তা হল তাঁর নিজের কাজ ও সেই কাজ দিয়ে তৈরি নিজের জীবনকে। কাননবালা বলছেন, “কে বাবা, কে মা, এই ভেবে বুকের ব্যথা বাড়িয়ে কাজ কী? আমি কানন, এই পরিচয়টুকুই তো যথেষ্ট।” তাই হয়তো কাননের অল্পবয়সে রতনচন্দ্র তাস ও জুয়োর নেশায় গলা পর্যন্ত দেনা করে নিজে অকালে চলে গেলও কানন তার পিতৃদায় মেটানোর চেষ্টা শুরু করলেন। জন্মদাত্রীকে দেখেননি, রাজবালাই তাই প্রকৃত মা। রাজবালার হাত ধরে এক আত্মীয় বাড়ি থেকে আরেক আত্মীয় বাড়িতে ঝিয়ের পরিচয়ে দিন কাটিয়েছেন কানন বালা। আধপেটা খেয়ে আর পরিচয়হীনতার তীব্র গঞ্জনাতেও রাজবালার হাত ছাড়েননি কানন। কিছুদিনের স্কুলে পড়া, বাবা রতনচাঁদের বই পড়া ও গান শোনার নেশা এইসবই কাননের মধ্যে বাসন মাজা, ঘর মোছার বাইরেও অন্য কিছু করে দেখানোর স্বপ্ন বুনে দেয়। মা ও মেয়ে চরম দারিদ্র্যের দিনে সস্তায় ঘর ভাড়া নিয়েছিল হাওড়ার ঘোলাডাঙা পল্লিতে। বারবনিতার পাড়া বলে সে জায়গা পরিচিত তখন। নিজেই বলেছেন কাননদেবী, “চারপাশের পরিবেশে শ্বাস নিতে অসুবিধে হত।” 

    কিন্তু এখানেও একটু স্বস্তির নিশ্বাস এনে দিল বিপত্নীক ভোলাদা। ভক্তিগীতি থেকে কীর্তন, বাউল, ভাটিয়ালি, মীরার ভজন, ব্রক্ষ্মসংগীত, অতুলপ্রসাদের গান সবই অল্প অল্প করে শেখালেন তিনি কানন’কে। পরে প্রতিষ্ঠিত জীবনে উস্তাদ আল্লারাখা, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, নজরুল ইসলাম, পঙ্কজকুমার মল্লিক, রায়চাঁদ বড়ালের কাছে গানের তালিম নিলেও অতীতের এই গান শেখার দিনগুলো কখনই বিস্মৃত হয়নি কাননবালার কাছে।

    ‘আমি বনফুল গো’ গাইছেন কাননদেবী

    কলকাতায় পার্শি ব্যবসায়ী জে.এফ ম্যাডন তৈরি করেছিলেন ‘ম্যাডন থিয়েটার’। দশ বছর বয়সে এক সহৃদয় ব্যক্তির হাত ধরে দারিদ্র্যের জ্বালা মেটাতে এই ম্যাডন থিয়েটারে যোগ দেন কানন। সেটা ১৯২৬ সাল। চলচ্চিত্র তখনও শব্দহীন। জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত নির্বাক ছবি ‘জয়দেব’-এ ‘রাধা’-র চরিত্রে সে অর্থে কাননবালার প্রথম অভিনয়। পারিশ্রমিক হিসেবে পান পাঁচ টাকা। বাংলা সিনেমা যে বছর কথা বলতে শুরু করল, সেই ১৯৩১ সালেই ‘জোরবরাত’ হল কাননবালার প্রথম সবাক ছবি। প্রথম দিকে হতদরিদ্র কমবয়সী অভিনেত্রী কাননকে দিয়ে কম পয়সায় বাধ্যত লাস্য অভিনয় করিয়ে নিতেন পরিচালকরা। ‘মানময়ী গার্লস স্কুল’ মুক্তি পেলে সিনেমায় গান গাওয়ার জন্য কাননের খ্যাতি হল খুব। গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে ডাক এল তাঁর কাছে। এরপর থেকে নায়িকা-গায়িকার যুগল কম্বিনেশনে কাননবালা ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন মহানায়িকা কাননদেবী। ১৯৩৬ সালে প্রমথেশ বড়ুয়ার ‘মুক্তি’ ছবিতে রবীন্দ্রনাথের অনুমোদনে প্রথম রবীন্দ্র কাহিনি ব্যতিরেকে অন্য গল্পে রবীন্দ্রসংগীত ব্যবহার করা হল। কাননদেবী গাইলেন সেই রবীন্দ্রনাথের গান, “আজ সবার রঙে রঙ মেশাতে হবে”। সত্যিই যেন তাঁর জীবনের অনেক জায়গায় এরপর মিশল রং। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং তাঁর গান শুনে শান্তিনিকেতনে এসে গান শুনিয়ে যেতে বললেন। শান্তিনিকেতনি রবীন্দ্র ঘরানার পাশাপাশি এক সাধারণ মেয়ের অসাধারণ কণ্ঠে বাংলার অজস্র সিনেমায় মানুষ শুনল রবীন্দ্রনাথের গান। 

    ‘আমি বনফুল গো’ - প্রণব রায়ের লেখা এই গানকেও জনপ্রিয় করেছিলেন কানন দেবীই। তাঁর গলায় হিন্দি ভাষায় ‘জবাব’ ছবির ‘তুফান মেল’ সারা ভারত মাতিয়েছিল। ১৯৪১ সাল থেকে কাননদেবী নিজের পছন্দমতো সিনেমায় অভিনয় করে নিজেই হয়ে উঠেছেন এক ব্র্যান্ড। ‘মেজদিদি’, ‘শেষ উত্তর’, ‘সাথী’, ‘জওয়ানি কি রাত’, ‘পরাজয়’-এর মতো বহু ছায়াছবিতে ভারতীয় সিনেমা মনে রাখে কাননদেবী’কে। ১৯৪৮ সালে নিজেই তিনি ছবি প্রযোজনা শুরু করেন। তৈরি করেন ‘শ্রীমতি পিকচার্স’। শরৎচন্দ্রের উপন্যাস অবলম্বনে এই সংস্থা থেকে তৈরি হয় অনেক  বিখ্যাত সব ছায়াছবি। 

    প্রথম বিয়ের সংসার সিনেমার জন্যই ভাঙে পাঁচবছরের মাথায়। অথচ অভিনেত্রী কাননবালা’র প্রেমে পড়েই তাঁকে বিয়ে করেন ডাকসাইটে অধ্যাপক হেরম্বচন্দ্রের ছেলে অশোক মৈত্র। দ্বিতীয় স্বামী পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন রাজ্যপালের নেভাল এ.ডি.সি হরিদাস ভট্টাচার্যের সঙ্গেও প্রণয়ের বিয়ে। সে প্রেমও ছিল প্রথমত হরিদাস বাবুর তরফেই, ততদিনে কাননদেবী বাংলা সিনেমার সুপারস্টার। তাঁদের দুজনের বিয়ে হতেই সাধারণ মানুষের তারকাদের জীবন নিয়ে গল্পগাছা ও কেচ্ছা করার গতি দুরন্ত হয়। তবু এসবের ছোঁয়াচ এড়িয়ে দীর্ঘ ২৪ বছর পার করেছিল তাঁদের দাম্পত্য জীবন। এঁদের যৌথ পরিচালনাতেই শ্রীমতি পিকচার্স থেকে একের পর এক হিট সিনেমা জন্ম নিয়েছে। হরিদাস বাবুর স্বাধীন পরিচালনায় ‘দেবত্র’ ছবিতে দর্শক উত্তম, সুচিত্রা ও কানন দেবী এই ত্রয়ীকে প্রথম ও শেষবারের জন্য পর্দায় দেখেন।

    দাদাসাহেব ফালকে, পদ্মশ্রী পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেত্রী ও গায়িকা কাননবালা’কে নিয়ে বাঙালি স্বপ্ন দেখেছে, তাঁর সৌন্দর্যে মোহিত হয়েছে, তাঁর অভিনয়ে মজেছে, তাঁকে নিয়ে কেচ্ছার বন্যা বইয়েছে, আবার তাঁর এই অবিরত সংগ্রামের জীবনকে জীবন্ত সিনেমা মনে করে তাঁকে পাগলের মতো ভালোও বেসেছে। এবড়ো খেবড়ো রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে পরিচয়হীনতার জীবনকে নিজের পরিশ্রম আর সততায় এক পবিত্র পরিচয় দিয়েছেন কাননদেবী। সে পরিচয়ে তিনি কোনও অভিজাত ব্যক্তির স্ত্রী, কারোর পালিতা কন্যা বা কোনও হিট সিনেমার লাস্যময়ী নায়িকা নন। কাননবালার সর্বোচ্চ পরিচয় এটাই যে, তিনি নিজের জীবনকে শ্রদ্ধা করা এক লড়াকু জীবনযোদ্ধা, যার কাছে হার মানে বায়োস্কোপের গল্প, যার কাছে জিতে গিয়ে শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় মাথা নুইয়ে ফেলে একটা আস্ত জীবন।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @