“কামান বেবি” আমার বিপুল বৈভবের এক নতুন রসাস্বাদন

খুব সত্যি কথা আমি বিপুল দাসের “অ্যান্টিবায়োটিক” পড়িনি। জানতামই না। বোধহয় ভালোই করেছি। যেমন খুব ছোটো বয়সে “বুড়ো আংলা” পড়িনি; যখন পড়েছি তার স্বাদই আলাদা। এমনকি ১৪২৩-এর শারদীয়া আজকালে বিপুল দাসের গল্প “কামান বেবি”ও পড়িনি, যা কিনা এই উপন্যাসের অন্তরা অঙ্গ। কিন্তু আমি প্রচলিত সময়ের ব্যতিক্রমী পাঠক হিসেবে এক সময় খুঁজে পেতে বাসুদেব দাশগুপ্তের “বমন রহস্য” পড়েছি, সুবিমল মিশ্রের “আর্কিমিডিসের আবিস্কার এবং তারপর”, অচিন দাশগুপ্তের “লেনিনবাবু”, কাফ্কার “মেটামরফেসিস্” বা সাত্রের “লা নোঁসে”।
আমাদের শেষ কৈশোরে বিপুল দাস বলতে এক শিলিগুড়ি আত্মা, দামামা নাটক দলের এক সক্রিয় সদস্য আর “পাহাড়তলী”র কিছু বিছিন্ন লেখালেখি। প্রথম পাঠ- এখন মনে নেই গল্পের নাম শুধু মনে আছে- আম পাতা জোড়া জোড়া/ মারব চাবুক চড়ব ঘোড়া/ ওরে বিবি সরে দাঁড়া/ আসছে আমার পাগলা ঘোড়া। আমাকে সেই গদ্যের টান এখনও বিহ্বল করে, তবু যারা একটু-আধটু সাহিত্যের খবর রাখে যেভাবে বিপুল দাস নামটার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার কথা আমার পরিচয় ছিল ঠিক ততটাই; কেননা সস্তা লেখক বলতে যা বোঝায় বিপুল দাস কখনওই তা হয়ে উঠতে চাননি বা বিপুল দাস কক্ষনো পাঠকের কাঁধে ভর করে বিপুল দাস হয়ে ওঠেননি। ওঁর লেখা পড়তে গেলে পাঠকের যে ঘ্রাণ থাকা দরকার হয়তো আমার সেভাবে তখন তা তৈরি ছিলনা, তৈরি করতে হয়েছে। তাই “কামান বেবি” পাঠ সেই অর্থে আমার এক বিপুল উৎসের দিকে যাত্রা শুরু শুধু নয় বিপুল বৈভবের এক নতুন রস আস্বাদন যেন।
প্রথম পাঠ প্রতিক্রিয়ায় এই বয়সে এসে আমার মনে হয়েছে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ডারউইনবাদে আমি বিশ্বাসী, এ এক দায়বদ্ধতা যা পাঠকের একার নয়, তাই বিশ্বাসী “কামান বেবি”র টান টান জাদুবাস্তবতায় প্রকাশনার কিংবা প্রচ্ছদের অতিআধুনিকতার যে মেলবন্ধন তাতে। লোমচর্মা এক বৃদ্ধার বুনোগন্ধে বেঁচে উঠার বাস্তবতা বা ঘর পালানো এক বালকের আবার উৎসে ফেরার আকাঙ্ক্ষার বাস্তবতার সঙ্গে আমি বার বার নিজেকে গুলিয়ে ফেলেছি, কেননা ঘটনাক্রমে জন্মসূত্রে আমিও সেই উদ্বাস্তু অধ্যুষিত অঞ্চলেরই পাব্লিসিটি দেখে বড়ো হওয়া মানুষ। আমার শৈশবও মই বেয়ে প্রফেসরের অনেক উঁচু থেকে- ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে...’ গাইতে গাইতে মরণঝাঁপ বা কাটা মুণ্ডুর কথা বলা দেখা শৈশব। সে তো কবেকার কথা; ভাবতে অবাক লাগে, কী অদ্ভুত আতিথেয়তায় লালন করে রেখেছেন ২০১৬ অবধি। তাতু সরকার যে এক এক করে নতুন শব্দ খুঁজে ফেরে কখনও যার অর্থ না বুঝলেও বুঝতে পারে সেই জাদুশব্দের ক্যারিশ্মা সে কি আমার আমি নই বা তোমার তুমি! আজও তো প্রতিটি সচেতন মানুষ এক একটা নতুন শব্দের সওয়ারি হয়ে ফেরে। গদ্যের যে বাঁধন বার বার আমাকে টেনেছে তা যেমন- “শীতে বনমালী সরকারের ছেলে তাতু হারিয়ে যাওয়ার পর মাঝেরডাঙ্গায় কিছু নতুন শব্দ শোনা যায়, কিন্তু সেগুলো কুড়িয়ে নেবার কোনো লোক ছিল না। ফলে রতনের চায়ের দোকানে, মাঠে নিড়ানি দিতে দিতে, রাতে বিছানায় অনেকেই যে সব কথা বলাবলি করে, সেগুলো মারা যায়। এর মধ্যে ছিল কেয়ারলেস, ভোমা, ভুলভুলাইয়া, কিডনিপাচার এবং ক্লোরফর্ম। শব্দগুলো, শূন্য গুটখার প্যাকেট, নির্বাচনী ব্যানার, ছেঁড়া হেকিমি ইস্তেহারের সঙ্গে ক’দিন মাঝেরডাঙার বাতাসে ঘোরাঘুরি করে শেষে ভোঁকাট্টা ঘুড়ির মতো অন্য দিকে চলে গেল”। এমন গদ্যবাঁধন সমস্ত উপন্যাস জুড়ে। পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা ঠাম্মার হামান দিস্তা, ঠাম্মার পাটালি গন্ধ কিংবা একপেয়ে পেত্নির গল্প আমাকে এক নস্টালজিয়ার ভেতর টেনে নিয়ে গেছে। যখন সৌদামিনীর সামনে এক কালো ঘোড়া পা ঠুকে ডাকে- কামান বেবি। আর সৌদামিনী বলে খাড়াও রে আমার কালামানিক, তখন সৌদামিনী এক সুন্দরী নারী হয়ে ওঠে। মদস্রাবী এক ক্ষারগন্ধ, নারীর শীৎকার, এক সাহেব, কালোঘোড়া ও সৌদামিনী মিশে যায়। কিন্তু সঞ্চারীতেই শেষ হয় না “কামান বেবি”, আভোগী বা বিস্তারে আবার আর একটা বেঁচে ওঠার গল্প- তাতুর উৎসে ফিরে আসা।
উপন্যাসটির নান্দনিকতায় চার ভাগে ভাগ করেছেন বিপুল দাস, যেন সাবলীল বিস্তার করেছেন শাস্ত্রীয় রাগে। সমস্ত উপন্যাস জুড়ে স্হায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী বা আভোগীর ছড় টেনেছেন নিপুন হাতে। স্হায়ীতে- তাতু শব্দের ফেরিওয়ালা, অন্তরায় -টিউবয়েল বসানোর ওস্তাদ কারিগর বনমালী সরকার বা তার বুড়িমা সৌদামিনীর ঘর গেরস্হালী, সঞ্চারীতে- সৌদামিনীর বেঁচে ওঠার গল্প, আর আভোগীতে- উৎস মুখে তাতু।
মনে হতেই পারে ২০১৬-র শারদীয়া আজকাল পূজা সংখ্যায় যে গল্প (যা কিনা এই উপন্যাসের অন্তরা অঙ্গ) প্রকাশিত, তার আবার নতুন করে উপন্যাস বিন্যাসে যৌক্তিকতা কোথায়? ছোটো গল্পের সংজ্ঞা বিশ্লেষণের মধ্যেই আমি আমার মতো করে উত্তর খুঁজে পাই। একটা ছোটো গল্পের শেষ হয়েও না শেষ হওয়ার যে অতৃপ্তি তাই কিন্তু বিপুল দাসের “কামান বেবি”-কে উপন্যাসে উন্নিত করতে তাড়িত করে। ব্যক্তিগত ভাবে এই সময় আমার মনে হয়েছে গনেশ পাইনের ছবির কথা তার টেক্সচারের প্রয়োগ, যেমন ছবিটার গভীর আরও গভীরে টেনে নিয়ে যায়। বোধহয় লেখককেও কামান বেবি ছোটো গল্প ওই ভাবেই টেনে নিয়ে গিয়ে উপন্যাসে উন্নীত করে। আমার মনে হয়েছে এখানেই একজন লেখকের বাস্তবতার কাছে বিপুল দাস যেন দায়বদ্ধ। এমন লেখককে অবজ্ঞা করা তো ধৃষ্টতারই নামান্তর। তবুও “কামান বেবি” স্বল্প পঠিত সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে এখনও উঠতে পারেনি। সমালোচকের দৃষ্টিকোণ থেকে হয়ে ওঠেনি পরবর্তী প্রজন্মের দলিল, অপেক্ষার প্রহর গোনা ছাড়া “কামান বেবি”র সৎ পাঠকের আর কীই বা করার আছে। প্রকাশনা সংস্হারও ক্ষমতার একটা সীমাবদ্ধতা আছে।
বই প্রকাশনার কথা আলাদা ভাবে না বললে আভোগীটাই বোধহয় পূর্ণ হয় না। গুরুচণ্ডালী প্রকাশনা যে যত্ন সহকারে বইটি প্রকাশ করেছে এবং পরিবেশিত করেছে বা করছে তা প্রশংসনীয়। পাবলো পিকাসোর বহুল আলোচিত বুলফাইটারের গন্ধমাখানো ছবির সঙ্গে ভাত ঘ্রাণ পটভূমিতে কামান বেবির টানটান প্রচ্ছদ এবং তার পরিবেশন, শিল্পী দেবরাজ গোস্বামী যেমন এই উপন্যাসকে অন্য এক মাত্রায় পৌঁছে দেয়, তেমনি পরিবেশনার অভিনবত্বেও গুরুচণ্ডালী প্রকাশনা যে ভাবে কামান বেবিকে ইউটিউব অবধি টেনে নিয়ে উপস্হাপনা করেছে তা গুরুচণ্ডা৯ প্রকাশনাকে যেন আর এক প্রজন্ম এগিয়ে রাখে।