যূথিকা রায়ের গান শুনে কিছুক্ষণের জন্য নাকি থমকে গিয়েছিল কলকাতা

তিরিশে দশক। আধুনিক বাংলা গানের নতুন আঙ্গিক ও বৈশিষ্ট্যে জন্ম নেওয়ার সময়কাল। ১৯৩৪ সালে এইচএমভি (HMV) থেকে একটি রেকর্ড (Record) বেরয়। চোদ্দ বছর বয়সী এক কিশোরীর কণ্ঠে তাতে (রেকর্ড নম্বর : এন ৭২৯৭) শোনা গেল দু’টি গান – ‘আমি ভোরের যূথিকা’ ও ‘সাঁঝের তারকা আমি’। আধুনিক বাংলা গানের পালাবদল ঘটিয়ে দিয়েছিলেন ‘কুমারী যূথিকা’ – যূথিকা রায় (Juthika Roy)। সে-এক আশ্চর্য ইতিহাস!
‘হিজ মাস্টার ভয়েস’-এর নভেম্বর ১৯৩৪-এর ‘নূতন বাংলা রেকর্ড’-এর তালিকা-পুস্তিকায় এই গান ও শিল্পী সম্পর্কে বলা হয় : ‘বিজন বনে কত মুকুল শোভায়-সৌরভে আপনি ফুটে ওঠে, অথচ লোকে তার কথা জানতে পায় না। তেমনি দুটি ফুল এবার আমরা আপনাদের উপহার দিলাম। এই ফুল দুটি কুমারী যূথিকার দু’খানি গান।’
তাঁর গানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে সেখানে আরও বলা ছিল, “কুমারী যূথিকার গানের সঙ্গে আপনাদের এই প্রথম পরিচয়, কিন্তু মনে হবে যেন ভোরের আধোঘুমে আধোস্বপ্নে এই গান কতদিন মনের দুয়ারে বেজেছে। এমনিই তাঁর কণ্ঠের গান। তাঁর স্বভাব-সুন্দর সুর যেন গিরিনির্ঝরিণীর রূপালী জলধারার মত আপনি উৎসারিত হয়ে ওঠে, দূর-থেকে ভেসে-আসা সানাইয়ের মতই ঘুমন্ত মনকে জাগিয়ে তোলে। রেকর্ডে গায়িকার গান এই প্রথম। এবারে তিনি ভোরের যূথিকা আর সাঁঝের তারকার গান শুনিয়েছেন। প্রভাতের অরুণ যে যূথিকার বন্ধু, আকাশের যে সন্ধ্যাতারা মাটির প্রদীপ হয়ে তুলসীতলায় নেমে এসেছে, এই দুটি গানে তাদেরই মর্মকথা মর্মরিত হয়ে উঠেছে। নবীনের মধ্যেই সুন্দরের আবির্ভাব, নূতন কণ্ঠে নূতন গান কত সুন্দর হয়েছে, আপনাদের তা শুনতে অনুরোধ করি।”
এই সুগঠিত অনুরোধ ফেলতে পারেননি শ্রোতারাও। যূথিকা রায়ের নামে বাজারে রেকর্ড বেরনোর পর মাত্র তিন মাসের মধ্যে রেকর্ডখানা ষাট হাজার কপি বিক্রি হয়ে গিয়ে বাজারে রীতিমত হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিল। আর ওই বিখ্যাত ‘সাঁঝের তারকা আমি পথ হারায়ে’ – যে গানটাকে গবেষক বিশেষজ্ঞ্রাও অনেকে, আধুনিক বাংলা গান সরণিটির প্রথম মাইলফলক বলে চিহ্নিত করেছেন। বিস্মৃতিপ্রবণ এই সময়েও এই গান যে ইতিহাসের উপাদান হয়ে রয়ে গেছে – তাতে কোনও দ্বিমত নেই। সেই বোধহয় রেকর্ডের বাংলা গানে, প্রথম অর্কেস্ট্রা তৈরি হয়েছিল। রাতারাতি ‘স্টার’ হয়ে গেলেন কুমারী যূথিকা। এরপর শুরু হবে ‘যূথিকা রায়’-এর পথ চলা।
আত্মপ্রকাশের চার বছর পর, ১৯৩৮-এর জুন মাসে প্রণব রায়ের কথা ও কমল দাশগুপ্তের সুরে ‘পাহাড়-দেশের বন্ধু আমার স্বপ্নে আমায় ডাকো গো’ ও ‘রূপ-কাহিনির দেশে রে, নাম-না-জানা দেশে’ – এই দু’খানি গান নিয়ে যূথিকা রায়ের যে-রেকর্ড (এন ১৭০৮২) বের হয়, তা ছিল এইচএমভির ‘গীতি-চিত্র-মালা’র প্রথম নিবেদন। আধুনিক বাংলা গানের সূচনা যেমন তাঁর হাতে হয়েছে, তেমনি গীতি-চিত্রেরও তিনি প্রথম রূপকার। ওই বছরেই – ১৯৩৮-এ, কুমারী যূথিকা রায়ের (রেণু) ‘যদি যমুনার জলে ফুল হয়ে ভেসে যাই’ ও ‘মন-বৃন্দাবনে রাস-মঞ্চে বেঁধেছি গোপনে’ – দুটি ভজন-গানের রেকর্ড (এন ১৭১৮২) বের হয়। গানের কথা প্রণব রায়ের, আর সুর-যোজনা করেন কমল দাশগুপ্ত। কমল-প্রণব-যূথিকার অনন্য সম্মিলনে জন্ম নেওয়া আরেকটি কাব্যগীতির রেকর্ড (নভেম্বর ১৯৩৮, এন ১৭২১৬), – ‘বনপথে যবে নিরজনে’ ও ‘ওরে আমার গান’ – সম্পর্কে ওই মাসের এইচএমভির ক্যাটালগের ভাষ্য : ‘বাংলার অন্যতমা শ্রেষ্ঠা গায়িকা কুমারী যূথিকা এ-মাসে দু’টি নতুন গান আপনাদের উপহার দিয়েছেন। কুমারী যূথিকার গানের যাঁরা অনুরাগী, তাঁরা হয়ত লক্ষ্য করেছেন যে, গায়িকার প্রত্যেকটি গান রচনা ও সুরের দিক থেকে নব নব বৈশিষ্ট্যে বৈচিত্র্যময়। কুমারী যূথিকার মতো এমন অপরূপ মায়া-কণ্ঠ শিল্পীর পক্ষেই এত বিভিন্ন বৈচিত্র্য পরিবেশন করা সম্ভব।’ এইচএমভির তরফ থেকে যূথিকা রায়ের গান ও গায়কি সম্পর্কে এমন প্রশংসামূলক মন্তব্য হামেশাই প্রকাশিত হয়েছে। এ-থেকে স্পষ্টই ধারণা করা যায়, যূথিকা কতো বড়ো মাপের ও মানের শিল্পী।
নজরুলগীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়ে গিয়েছেন যূথিকা রায়। তাঁর গাওয়া সবচেয়ে প্রিয় নজরুলগীতি – ‘ওরে নীল যমুনার জল’, ‘তোমার কালো রূপে যাক না ডুবে সকল কালো মম, হে কৃষ্ণ প্রিয়তম’। এই গান দুটি লিখে দেওয়ার জন্য তাঁর হয়ে ‘কাজীদা’-কে অনুরোধ করেছিলেন তাঁর মা
নজরুলগীতির (Nazrul Geeti) রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়ে গিয়েছেন যূথিকা রায়। তাঁর গাওয়া সবচেয়ে প্রিয় নজরুলগীতি – ‘ওরে নীল যমুনার জল’, ‘তোমার কালো রূপে যাক না ডুবে সকল কালো মম, হে কৃষ্ণ প্রিয়তম’। এই গান দুটি লিখে দেওয়ার জন্য তাঁর হয়ে ‘কাজীদা’-কে অনুরোধ করেছিলেন তাঁর মা, ‘সরল ভাষায় যদি দুটো গান রেণুকে লিখে দেন, যূথিকাকে লিখে দেন – সে খুব খুশি হবে।’ প্রথমে যেক’টি গান নজরুল লিখে দিয়েছিলেন, পছন্দ হয়নি যূথিকার। ফের পাঠান মা’কে। কিন্তু আশঙ্কা করেছিলেন, কাজীদা হয়তো রেগে যাবে। তা হয় না। নজরুল রাগ করলেন না, একেবারে শান্তভাবে বললেন, ‘মা, আপনি কিছু ভাববেন না। আমি যূথিকার জন্যে নতুন করে লিখে দেবো।’তিনি দিন দুই পরেই ‘নীল যমুনার জল’আর ‘তোমার কালো রূপে’ গানটা লিখে দিয়েছিলেন।
‘নীল যমুনার জল’ অনেক দূর গড়িয়েছিল। সরোজিনী নাইডু একবার বলেছিলেন যে, ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় গান্ধিজিকে যখন পুণের আগা খান প্যালেসে নজরবন্দি করে রাখা হয়েছিল, সেখানে সকাল-সন্ধেয় যে প্রার্থনাসভা বসত, তাতে গ্রামোফোনে নিয়ম করে যূথিকা রায়ের রেকর্ডে ভজন চালানো হত। সাতচল্লিশের অগস্টে ক্ষমতা হস্তান্তরের দিনগুলোতে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে টালমাটাল কলকাতার বেলেঘাটা মহল্লার ‘হায়দারি মঞ্জিল’-এ ঘাঁটি করে ছিলেন গান্ধিজি (Mahatma Gandhi)। সেই সময় মন শক্ত করেছেন, মোহিত হয়েছেন যূথিকার গানে। অনুরোধ করেছিলেন ময়দানে তাঁর শান্তিসভায় গাইতে। সেই দিনের অভিজ্ঞতা আজীবন ভুলতে পারেননি গায়িকা। ভুলতে পারেননি, দাঙ্গাবিধ্বস্ত কলকাতার বুক চিরে এগিয়ে চলেছে গান্ধিজির গাড়ি, পাশে তিনি। পুষ্পবৃষ্টি করে, আরতি করে গান্ধিজিকে কাছে টেনে নিয়েছিল কলকাতা। ময়দানে পৌঁছে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যেতে বসা যূথিকার হাত ধরে তাঁকে স্টেজে তুলে নিয়েছিলেন গান্ধিজি। শান্তিসভার শেষে যূথিকা যখন ‘নীল যমুনার জল’ ধরেছিলেন, কিছুক্ষণের জন্য নাকি থমকে দিয়েছিলেন কোলাহলের কলকাতাকে।
ভারতীয় উপমহাদেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তো বটেই, মার্কেটিং আর ডিস্ট্রিবিউশনের জোরে গ্রামোফোন রেকর্ড কোম্পানির সবচাইতে দামি ব্র্যান্ড, হিজ মাস্টার্স ভয়েসের লেবেল লাগানো ওই সব রেকর্ড ছড়িয়ে যেত পূর্ব আফ্রিকা পর্যন্ত। তাঁর কণ্ঠে মীরার ভজন মানুষের মনে এক গভীর আবেগ ও আবেদন সৃষ্টি করে।
যূথিকা রায়ের জন্ম ২০ এপ্রিল ১৯২০ হাওড়ার আমতায়। রায়-পরিবারের আদিবাড়ি খুলনার সেনহাটিতে। ছেলেবেলা থেকেই গানের প্রতি তাঁর ঝোঁক। বাবা-মায়ের উৎসাহে শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ হয়। রেকর্ডে গান দেওয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গ্রামোফোন কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন – মূলত গেয়েছেন এইচএমভির কুকুর-মার্কা লেবেলেই। শুরুটা বাংলা গান দিয়ে হলেও পরে হিন্দি-উর্দু-তামিল – নানা ভাষায় গান করেছেন। গ্রামোফোন কোম্পানি অফ ইন্ডিয়ার হিন্দি বিভাগ শুরুই হয়েছিল যূথিকার গাওয়া ভজন দিয়ে। আধুনিক বাংলা গান, রজনীকান্ত-অতুলপ্রসাদ-নজরুলের গান, কিংবা ভক্তিগীতি, কীর্তন – আবার ভিন্ন ভাষায় গীত-গজল-ভজন-না’ত-বারোমাসি-ঋতুসংগীত-হোলি-দেওয়ালি-রামধুন, দেশগান এবং সেইসঙ্গে সিনেমার গান গেয়ে বাংলা মুলুক ছাড়িয়ে সারা ভারত ও ভারতের বাইরেও নানা দেশে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে। ভারতীয় উপমহাদেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তো বটেই, মার্কেটিং আর ডিস্ট্রিবিউশনের জোরে গ্রামোফোন রেকর্ড কোম্পানির সবচাইতে দামি ব্র্যান্ড, হিজ মাস্টার্স ভয়েসের লেবেল লাগানো ওই সব রেকর্ড ছড়িয়ে যেত পূর্ব আফ্রিকা পর্যন্ত। তাঁর কণ্ঠে মীরার ভজন মানুষের মনে এক গভীর আবেগ ও আবেদন সৃষ্টি করে। বহুকাল পর্যন্ত রেকর্ড-লেবেলে তাঁর মূল নামের সঙ্গে বন্ধনীর মধ্যে ‘রেণু’ – এই ডাকনামটিও লেখা থাকতো। আরো পরে নাম থেকে ঝরে যায় ‘রেণু’, থাকে শুধু ‘যূথিকা রায়’।
বনেদি উত্তর কলকাতার ৫-বি শ্যামপুকুর স্ট্রিটের তেতলা বাড়িটিতে ২০১০ সাল নাগাদও থাকতেন যূথিকা রায়। সংস্কারহীন প্রায় একশো বছরের পুরোনো বেশ বড়ো-সড়ো বাড়িটির পেছন দিকে একতলা-দোতলা-তেতলা মিলিয়ে বেশ অনেকগুলো ঘর নিয়ে থাকতেন – বাড়ির ডানপাশের একটি অপরিসর গলি পেরিয়ে তারপর পাওয়া যেত তাঁর দরজার সন্ধান। জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময় ধরে – প্রায় পঞ্চান্ন বছর এই বাড়িতে ছিলেন। তবে কিছুকালের মধ্যেই এখানকার বাস তুলতে হবে, কেননা বাড়ির মালিকেরা এই ভগ্ন-জীর্ণ বাড়িটিকে ভেঙে ফেলে এখানে আকাশচুম্বী অট্টালিকা গড়বেন। এই শিল্পীর জীবনের কতো স্মৃতি – হাসি-বেদনার, দুঃখ-সুখের, দীর্ঘশ্বাস-হাহাকারের, নিঃসঙ্গতার সাক্ষী এই বাড়িটির অস্তিত্ব অচিরেই ধুলোয় মিশে যাবে।
এতকিছুর পরও ‘ক্যাসেট’ যুগ আসার আগেই তাঁর গান রেকর্ড বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আফশোস করতেন, “আমার সমস্ত রেকর্ড গ্রামোফোন কোম্পানির। কমল দাশগুপ্তের সঙ্গে কীভাবে ওনাদের একটু ঝগড়া, মানে ঝগড়া না, একটু মনোমালিন্য হয়েছিল, তাতে গ্রামোফোন কোম্পানি আমার সমস্ত রেকর্ড ক্যানসেল করে দিলো। তখন ওরা করলো কী, না আর রেকর্ড থাকবে না, এবার আমরা ক্যাসেট করবো। ক্যাসেট-যুগ পড়লো – সব ক্যাসেট। কিন্তু আমার গান একটাও হচ্ছে না, বুঝলেন?”
হারিয়ে যাওয়ার সেই শুরু। কালান্তরে বিভিন্ন কারণে এই প্রজন্ম রবীন্দ্রনাথ মনে রাখতে বাধ্য হলেও নজরুলগীতি, পুরাতন আধুনিক বাংলা গান সম্বন্ধে কারো তেমন ধারণা নেই, আগ্রহ তো নেইই। দুষ্প্রাপ্য আদ্যিকালের রেকর্ড বাজিয়ে তারা শুনবে যূথিকা রায়? ইতিহাসের নথিতে থাকলেও, ভবিষ্যতে এইসব কণ্ঠ চিরতরে হারিয়ে যাবে, এ আশঙ্কা অবান্তর নয়।
তথ্যসূত্র :
বাঙালির কলের গান – আবুল আহসান চৌধুরী
অংশুমান ভৌমিক (সাঁঝের তারকা, banglalive.com)