No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    পরিবেশ দূষণ রোধে নিজেদের বানানো যন্ত্র দিয়েই বায়োডিজেল বানালেন যাদবপুরের অধ্যাপক

    পরিবেশ দূষণ রোধে নিজেদের বানানো যন্ত্র দিয়েই বায়োডিজেল বানালেন যাদবপুরের অধ্যাপক

    Story image

    বায়োডিজেল। এই নামটি সাধারনের কাছে আর অজানা নয়। গ্লোবাল ওয়ার্মিং আর পরিবেশ দূষণের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে সারা বিশ্ব খুঁজছে পরিত্রানের রাস্তা। বিজ্ঞানীরা অষ্টপ্রহর ব্যস্ত থাকছেন বিভিন্ন প্রযুক্তি নির্মানে, যাতে এই দূষণের দাপট থেকে মুক্তি মেলে। সেসব উপায়ের মধ্যে অন্যতম হলো বায়োডিজেলের ব্যবহার। এটি একধরনের অপ্রচলিত শক্তি। এর সুবিধা হলো- একে জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করা হলে বিভিন্ন গ্রিন হাউস গ্যাস, যেমন- কার্বন-ডাই-অক্সাইড (CO2) এবং কার্সিনোজেনিক পলিঅ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন-এর নিঃসরণ কম হয়। ফলে পরিবেশ দূষণ কমে এবং স্বাস্থ্যের সুরক্ষা বজায় থাকে। বায়োডিজেলকে এককভাবে অথবা প্রচলিত জ্বালানির (ডিজেল) সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন দেশ, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বহু সংস্থা এই ধরনের জ্বালানির উৎপাদন ও ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে। অনেক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক তেল সংস্থা শুরুও করে দিয়েছে এর ব্যবহার। সারা বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণাগারে চলছে কাজ। পিছিয়ে নেই কলকাতাও। এই শহরের স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। যাদবপুরের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ (Dept. of Chemical Engineering JU)-এর বিভাগীয় প্রধান ডঃ রজত চক্রবর্তী (Dr. Rajat Chakraborty) গবেষণা করছেন বায়োডিজেল (Biodiesel) নিয়ে। তিনি বার করেছেন বায়োডিজেল তৈরির অভিনব ও পরিবেশবান্ধব উপায়।

    নিজের গবেষণা প্রসঙ্গে অধ্যাপক রজত চক্রবর্তী (Professor Rajat Chakraborty) কথা বললেন বঙ্গদর্শন.কম-এর সঙ্গে। তিনি বললেন, “বায়োডিজেল বানানো খরচসাপেক্ষ ব্যাপার। আমাদের গবেষণার মূল উদ্দেশ্য হলো বায়োডিজেল উৎপাদনের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণ রোধে সহায়তা করা এবং সুলভে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে এই জ্বালানি উৎপাদন করা। আমরা তাই বেছে নিয়েছি এমন সব কাঁচামাল, যা আমাদের চারপাশে খুব সহজেই মেলে, আর সেগুলি সংগ্রহ করতে বিশেষ খরচও করতে হয় না। যেমন- রান্নাঘরের বর্জ্য (Kitchen Waste), হাটবাজারের বর্জ্য (Municipal Solid Waste), শিল্পজাত বর্জ্য  (Indrustrial Waste)।”

    ২০১৬ সাল থেকে তাঁরা বায়োডিজেলকে ডিজেল ইঞ্জিনে ব্যবহার করা শুরু করেন। তিনি জানালেন, “আমরা গবেষণার কাজে যেসব রিঅ্যাকটর ব্যবহার করি, তা আমি নিজেই ডিজাইন করে, স্থানীয় কারিগরদের মাধ্যমে নির্মান করে নিই।” ইঞ্জিনে তাঁদের তৈরি বায়োডিজেল ব্যবহার করে সাফল্য পেয়েছেন। ইঞ্জিনের ধোঁয়া থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড, কার্বন-মনোঅক্সাইড, হাইড্রোকার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমাতে পেরেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁরা ধানের তুঁষ, খড়, প্রভৃতির সঙ্গে অন্যান্য পদার্থ মিশিয়ে মিথাইল লেভ্যুলিনেট জাতীয় যৌগপদার্থ তৈরি করছেন, যাদেরকে প্রচলিত ডিজেল ও বায়োডিজেলের সঙ্গে মেশালে গ্রিন হাউস গ্যাস ও বিষাক্ত গ্যাসের নিঃসরন ইঞ্জিন থেকে অনেকাংশে কমে।

    তিনি ২০০৯ সাল থেকেই এই সংক্রান্ত গবেষণার সঙ্গে যুক্ত। ২০১০ সালে, কারখানার বর্জ্য ফ্লাই অ্যাশ (Fly Ash) ও রান্নাঘরের বর্জ্য ডিমের খোসা মিশিয়ে খুবই কম খরচে কার্যকরী অনুঘটক বানিয়ে তার মাধ্যমে সয়াবিন তেল থেকে তৈরি করেছিলেন উন্নত মানের বায়োডিজেল। ২০১১ সালে তিনি রুই মাছের আঁশ থেকে অনুঘটক (Catalyst) তৈরি করে তার মাধ্যমে বায়োডিজেল তৈরি করেন। এছাড়াও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর গবেষণাগারে মাছের কাঁটা ও মুরগির হাড় থেকে সাফল্যের সঙ্গে, স্বল্প খরচে, কার্যকরী ও পুনর্ব্যবহার্য অনুঘটক তৈরি করে বায়োডিজেল উৎপাদন করেছেন। ২০১৪ সালে তিনি এবং তাঁর ছাত্র-গবেষকরা ছাগলের চর্বি থেকে বায়োডিজেল তৈরি করেন। এই পরীক্ষায় কাঁচামাল থেকে প্রায় ৯৬ শতাংশ বায়োডিজেল প্রস্তুত করা সম্ভব হয়েছিল, তাও মাত্র আড়াই ঘন্টায়। রজতবাবু জানান, “অন্য একদল বিদেশী গবেষকও আগে এই পরীক্ষাটি করেছিলেন। কিন্তু তাতে সময় লেগেছিলো প্রায় ১৮ ঘন্টা। সাফল্যের হারও ছিল অনেক কম। আমরা আমাদের পরীক্ষায় ইনফ্রারেড রেডিয়েশন অ্যাসিস্টেড রিঅ্যাকটর (IRAR) ব্যবহার করেছিলাম। এই অভিনব রিঅ্যাকটর আমাদের সাফল্যের প্রধান কারণ।”  

     

    ২০১৬ সাল থেকে তাঁরা বায়োডিজেলকে ডিজেল ইঞ্জিনে ব্যবহার করা শুরু করেন। তিনি জানালেন, “আমরা গবেষণার কাজে যেসব রিঅ্যাকটর ব্যবহার করি, তা আমি নিজেই ডিজাইন করে, স্থানীয় কারিগরদের মাধ্যমে নির্মান করে নিই।” ইঞ্জিনে তাঁদের তৈরি বায়োডিজেল ব্যবহার করে সাফল্য পেয়েছেন। ইঞ্জিনের ধোঁয়া থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড, কার্বন-মনোঅক্সাইড, হাইড্রোকার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমাতে পেরেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁরা ধানের তুঁষ, খড়, প্রভৃতির সঙ্গে অন্যান্য পদার্থ মিশিয়ে মিথাইল লেভ্যুলিনেট জাতীয় যৌগপদার্থ তৈরি করছেন, যাদেরকে প্রচলিত ডিজেল ও বায়োডিজেলের সঙ্গে মেশালে গ্রিন হাউস গ্যাস ও বিষাক্ত গ্যাসের নিঃসরন ইঞ্জিন থেকে অনেকাংশে কমে। তাঁরা পরীক্ষা করে দেখিয়েছেন, এর ফলে কার্বন-মনোঅক্সাইডের (CO) নিঃসরণ প্রায় ২৯ শতাংশ পর্যন্ত কমানো গেছে। হাইড্রোকার্বনের নিঃসরণ কমানো গেছে প্রায় ৮৩ শতাংশ। গ্লোবাল ওয়ার্মিং পোটেনশিয়াল কমেছে প্রায় ৬৩ শতাংশ। অধ্যাপক চক্রবর্তী বায়োডিজেল ও অনুঘটক সংক্রান্ত গবেষণায় ইতিমধ্যেই পেয়েছেন দুটি পেটেন্ট। তাঁর কথায়, “কোনও দামী ও প্রচলিত বানিজ্যিক অনুঘটক ছাড়াই পরিচিত বর্জ্যপদার্থ থেকে সস্তায় কার্যকরী অনুঘটক তৈরি করা এবং তার মাধ্যমে নিজের ডিজাইন করা রিঅ্যাকটরের সাহায্যে উন্নত মানের বায়োডিজেল ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি-সংযোজক তৈরি করাই আমার গবেষণার প্রতিপাদ্য।” তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ হলো কসাইখানার ফেলে দেওয়া পাঁঠার হাড় থেকে হাইড্রক্সিঅ্যাপাটাইট তৈরি করে এবং টাইটেনিয়াম অক্সাইড (TiO2)-এর মাধ্যমে সাফল্যের সঙ্গে জল থেকে বিষাক্ত ভারী ধাতু পরিশোধন করা। ইলেকট্রনিক বর্জ্যকে কাজে লাগিয়েও, সুলভে উন্নত মানের অনুঘটক তৈরি করা হয়েছে। এছাড়াও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের উপরেও ঊল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন রজতবাবু। রজতবাবু জানালেন, “আমাদের সঙ্গে কয়েকটি ইন্ডাস্ট্রির কথা চলছে, যাঁরা আমাদের দেখানো পথে বায়োডিজেল তৈরির কথা ভাবছেন। এছাড়াও দেশ-বিদেশের অনেক গবেষক আমাদের দেখানো পথে গবেষণা করছেন।”

    যে সকল ছাত্রছাত্রীরা গবেষণা করতে ইচ্ছুক, তাদের উদ্দেশ্যে ডঃ চক্রবর্তীর বার্তা, “এখন গবেষণার ক্ষেত্র অনেক বেশি বিস্তৃত। একাধিক ক্ষেত্রের গবেষকরা একসঙ্গে কাজ করে থাকেন প্রায়ই। তাই যারা গবেষণা করতে আগ্রহী, তাদের ধারণা থাকতে হবে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির বিভিন্ন শাখা সম্পর্কে।”

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @