No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    জয় গোস্বামী : চূর্ণিতীরের এক প্রাচীন বালক

    জয় গোস্বামী : চূর্ণিতীরের এক প্রাচীন বালক

    Story image
    এই মাত্র মেঘ ছিল, এই মাত্র বাইরে এল চাঁদ/ এই মাত্র শীত ছিল, এই মাত্র তীব্র দাবদাহ/ এই চলল সুস্থ পথ, এক্ষুনি পায়ের নীচে খাদ

    ভেম্বরের মুকুটের নাম সে ‘জয়’ রেখেছিলো অনেক আগেই। এ সেই সময়ের কথা, যখন শীত আসার আগে প্রিলিউড বাজতো চরাচরে। সামান্য সন্ধের ঝোঁকে ‘ঘুমিয়েছ, ঝাউপাতা?’ হাতে এক অপ্রস্তুত কিশোরী যে রহস্যের মুখে দাঁড়িয়েছিল, এখন সে ‘এক প্রৌঢ়ের জবানবন্দি’-র পাতার সামনে প্রণাম-প্রস্তুত। বস্তুত, জয় গোস্বামীর কবিতায় বাংলা-কাব্যের মাস্তুল দেখতে না পেলে, আজও সে দিশাহীন ভেসে যেত!

    সাদা, উড়ন্ত নিশান যাকে অনেকে ‘উন্মাদের পাঠক্রম’ বলে জানে, সে তাকে রাত জাগাতে জাগাতে, ভুল ভালোবাসার ঝুটো গয়না গড়াতে গড়াতে, স্বহত্যাপ্রবণ দিন পেরোতে পেরোতে এমন এক এল-ডোরাডোর দিকে নিয়ে যায়, যেখানে বলা হয়, ‘হেসো না দোয়েল, আমি বরাবর বাগানের লোক, আমি/ নানা রকমের কাজ জানি। যেমন এই, ঘাস তোলা বীজ রাখা’। এই এক অমোঘ পংক্তি – জ্যোৎস্না ও জলের মাঝে যাতায়াত করা ভেজা বারুদের মতো তাকে তাড়া করে। ঘুমের মধ্যেও এমনকি, পরিত্রাণ পায় না তাঁর থেকে। আর প্রতিটি প্রবঞ্চনা, প্রতারণার সামনে সে, ধীরে ধীরে, প্রখর স্বরে বলে উঠতে শেখে – ‘হেসো না দোয়েল’। এই একটি লাইন তাকে জানায়, জীবন-জীবনই শুধু মোহময় বিস্তারে অগ্রসর হয়ে যায় – বাকি সব অপমান, অনুযোগ, অভিমানকে তুড়িতে হারাতে হয়, কারণ তারা সব ‘বাগানের লোক’। দেখা-না দেখার বাইরে এই কবির সমস্ত বই ধীরে ধীরে আচ্ছন্ন করে ফেলে তাকে। ঘুমে, পরিণামে, পথে, নদীর ঘাটে - কবি ঝলসে ওঠেন মাথায়।

    ‘হেসো না দোয়েল, আমি বরাবর বাগানের লোক, আমি/ নানা রকমের কাজ জানি। যেমন এই, ঘাস তোলা বীজ রাখা’। এই এক অমোঘ পংক্তি – জ্যোৎস্না ও জলের মাঝে যাতায়াত করা ভেজা বারুদের মতো তাকে তাড়া করে। ঘুমের মধ্যেও এমনকি, পরিত্রাণ পায় না তাঁর থেকে।

    পাতা উল্টে যায় ‘ক্রিসমাস ও শীতের সনেট গুচ্ছ’-র। আর সে সব অক্ষর তার মলিন দিনের অন্ধকার ঘরগুলোতে আলো জ্বালিয়ে রাখে। ক্রমাগত হার এবং মার থেকে, শুভ্র পাতার যে বর্ম তাকে রক্ষা করে, সেই মন্ত্র – সে-ই স্তব, ‘সংকোচে জানাই আজ; একবার মুগ্ধ হতে চাই’। ‘মুগ্ধ’ শব্দ উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে যে আকাশ তার সামনে প্রকাশিত হয়, সেই আকাশ হেমন্তের। সে আকাশের রং জয় গোস্বামী। সে আকাশকে ডাকনামে ‘নভেম্বর’ বলেও ডাকে পুরোনো বন্ধুরা। ফুরিয়ে যাওয়া প্রেমিক, জয়ের লেখার বাইরে থেকে ফিরে গেছে। এখন প্রেমে-অপ্রেমে, লেখার খাতায় বারবার উঠে আসে চূর্ণিতীরের প্রাচীন বালক।

    সেই প্রাজ্ঞ কিশোরের জাদু অক্ষর, ‘এই মাত্র মেঘ ছিল, এই মাত্র বাইরে এল চাঁদ/ এই মাত্র শীত ছিল, এই মাত্র তীব্র দাবদাহ/ এই চলল সুস্থ পথ, এক্ষুনি পায়ের নীচে খাদ’। আপন মনে বলতে বলতে সে বারবার ফিরে আসে ধ্বংসের পর! তার আয়ুর কমেডি–ট্রাজেডি সব কিছুতেই এসে দাঁড়ায় – ‘অন্ধ এক শান্তি পারাবত/ বসে গৃহের চূড়ে/ সাদা পতাকা সাগরে ভেসে ওঠে/ জাহাজ ভাসে দূরে’। কী সহজ উচ্চারণ! – সবাই অবাক হয়ে দেখে, সে, অনেক রক্তপাত শেষ নিজের ঘরে আলো জ্বালিয়ে, হাসছে – সামনে খোলা বই –“দিগন্তে, যেখানে সমুদ্রের শেষ, সেইখানে/ কালো পাথরটাকে ভাসিয়ে রেখে তুমি/ নৌকা নিয়ে ফিরে গেলে/ তারপর তার পাশ দিয়ে কত সূর্য ডুবল/ চাঁদ মুখ বাড়াল কত/ মুখ বাড়াল ত্রিসংসারে নেই এমন সব জন্তু/ আসলে যারা বিকটাকার মেঘ, ভাসতে ভাসতে/ চেহারা পাল্টায়,/ কিন্তু তুমি আর ফিরলে না। তাই জানতেও পারলে না/ ওই পাথরটায় অনেকদিন হল প্রাণ এসে গেছে”।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @