No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    জীবনানন্দের সামনে কবিতার ‘সূর্যকরোজ্জ্বল’ জগতের দরজা খুলে দিয়েছিলেন তাঁর মা-বাবা   

    জীবনানন্দের সামনে কবিতার ‘সূর্যকরোজ্জ্বল’ জগতের দরজা খুলে দিয়েছিলেন তাঁর মা-বাবা   

    Story image

    জীবনানন্দের পিতামহ সর্বানন্দ দাশগুপ্তের আদি নিবাস ছিল ঢাকা জেলার গাউপাড়া গ্রামে। গ্রামটিকে পদ্মা নদী গ্রাস করলে তিনি বরিশাল শহরে বসবাস শুরু করেন। ৭ ছেলে ও ৪ মেয়ের জন্ম দিয়েছিলেন তিনি। তিনি ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নেওয়ায় প্রতিবেশী এবং আত্মীয়দের অনেকেই তা সুনজরে দেখেননি। জীবনানন্দের বাবা সত্যানন্দ ছিলেন একজন আদর্শবাদী মানুষ। বিএ পাশ করেছিলেন। টাকা রোজগারের অনেকরকম পথ তাঁর কাছে খোলা ছিল। তা সত্ত্বেও অপেক্ষাকৃত কম মাইনের পেশা শিক্ষকতাকেই তিনি বেছে নিয়েছিলেন জীবনে চলার পথ হিসেবে। স্থানীয় ব্রজমোহন স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক ছিলেন তিনি। পাশাপাশি, বরিশালে ব্রাহ্ম সমাজের আচার্য, উপাসক ও বক্তা হিসেবেও তিনি ছিলেন নিষ্টাবান। ‘ব্রহ্মবাদী’ নামের একটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন বরিশালের ব্রাহ্মরা। সত্যানন্দ কিছুদিন সেই পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। লিখেছেন বেশ কিছু প্রবন্ধ। তাঁর নিজের এক লাইব্রেরি ছিল। সব ধর্মকেই আন্তরিকভাবে শ্রদ্ধা করতেন তিনি। 

    কলকাতার বেথুন স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন জীবনানন্দের মা কুসুমকুমারী দেবী। একান্নবর্তী পরিবারের গৃহিণী হিসেবে তিনি যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে সংসার সামলাতেন। সেবা ছিল তাঁর জীবনের আদর্শ। আশেপাশের কেউ বিপদে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে তার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন কুসুমকুমারী। কাজকর্মের মধ্যেই তিনি সযত্নে কবিতার চর্চা করে গিয়েছেন। তিনি ছিলেন স্বভাবকবি। খুব দ্রুত কবিতা লিখে ফেলতেন। কুসুমকুমারী রান্না করছেন, এই সময়ে জীবনানন্দের পিসেমশাই আচার্য মনোমোহন চক্রবর্তী এসে ‘ব্রহ্মবাদী’-র জন্য কবিতা চাইলেন, রান্না করতে করতেই কবিতা লিখে ফেললেন কুসুমকুমারী – এরকম ঘটনাও ঘটেছে। তিনিও কিছুদিন বরিশালের ব্রাহ্ম সমাজের আচার্যের পদ সামলেছিলেন। তাঁর গানের গলা ছিল বড়ো মধুর। ভোরবেলা তাঁর গান এক স্বর্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি করত। 

    জীবনানন্দ ছিলেন বাবা-মা’র বড়ো ছেলে। তাঁর ভাই ছিলেন অশোকানন্দ এবং সুচরিতা ছিলেন তাঁদের ছোটো বোন। ‘আমার মা বাবা’ প্রবন্ধে সত্যানন্দের সম্পর্কে জীবনানন্দ লিখেছেন, “প্রায় রোজ শেষ রাত্রে – বিশেষত, হেমন্ত ও শীতকালে উপনিষদের শ্লোক আওড়াতে আওড়াতে তিনি আমাদের অপরূপ সূর্যচেতনার প্রভাতে নিয়ে আসতেন। তারপর সকালবেলার রৌদ্রের সাগরের ভিতর যখন একাকী বসে থাকতেন তখন মনে হত মহাকবির মতন তিনি নিজেকে প্রশ্ন করছেন, তুমি কি করতে এসেছ অসীম দেশ ও অসীম কালের এক প্রান্তে? এর উত্তরে মন বলে, আর কিছু নয়, জীবনে এই কথাটি প্রকাশ করতে এসেছি যে, ‘দেখা হয়েছে’; এই উত্তরটি সমস্ত কর্মের মধ্যে নিহিত, সমস্ত বাধার মধ্যে প্রচ্ছন্ন। ক্ষণে ক্ষণে শুভ মুহূর্তে উদ্ভাসিত চৈতন্যের দীপ্তিতে এই উত্তরটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে সকল দেখার অন্তরে সত্যকে দেখতে পেলাম। কোনো কিছু সংবাদ নিতে নয়, তত্ত্ব নির্ণয় করতে নয়, শুধু এই অনুভব নিয়ে স্থির হয়ে থাকতে যে ‘দর্শন করা হল’”। 

    সত্যানন্দ বিশ্বাস করতেন, সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করানোর আগে বাড়িতে তাদের পড়াশোনার ভিত শক্ত করে গড়ে দেওয়া প্রয়োজন। নিজের ছেলেমেয়ের ক্ষেত্রে এই পন্থাই নিয়েছিলেন তিনি। সত্যানন্দ নিজে শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও যেহেতু নানা কাজে ব্যস্ত থাকতেন, তাই জীবনানন্দ এবং তাঁর ভাইবোনেদের পড়াশোনা শুরু হয়েছিল মায়ের কাছেই। মা কুসুমকুমারীও ব্যস্ত মানুষ ছিলেন। তার মধ্যেই ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ায় যত্নের অভাব ছিল না তাঁর। উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ, পিবি শেলি, রবার্ট ব্রাউনিং-এর মতো ইংরেজ কবিদের কবিতা তাঁর মুখস্ত ছিল। এছাড়া, বৈষ্ণব পদাবলী কিংবা হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, নবীনচন্দ্র সেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখের কবিতাও আবৃত্তি করতেন। কথাসাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতেন। 

    বাবা সত্যানন্দের ঋষিসুলভ দার্শনিকতার থেকে জীবনানন্দ পেয়েছিলেন গভীর জীবনবোধ, যার প্রকাশ ঘটছে তাঁর কবিতা ও অন্যান্য সাহিত্যকর্মে। তবে সাহিত্যের প্রতি তাঁকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছিলেন মা কুসুমকুমারী, যিনি নিজেও ছিলেন একজন কবি। কবিতা লেখার বীজটি তিনিই জীবনানন্দের মধ্যে প্রোথিত করে দিয়েছিলেন। ছোটোবেলায় বরিশালের আরেকজন মানুষ জীবনানন্দকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিলেন। তিনি ব্রজমোহন স্কুলের প্রধান শিক্ষক জগদীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। 

    তথ্যঋণ – জীবনানন্দ দাশ, মহীতোষ বিশ্বাস। 
     

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @