জীবনানন্দ থমকালেন শুধু ওই একবার, আর পিছু ফিরলেন না…

সমস্ত কিছুর নিজস্ব জীবন আছে। ছেঁটে ফেলে দেওয়া অবলা হাতের নখ, রাস্তায় হাওয়ার আদুরে আঙুলে আঙুলে উড়তে থাকা, খেলতে থাকা- ছিন্নভিন্ন প্লাস্টিক, ক্ষুধার্ত কুকুরের হাঁপাতে থাকা সিক্ত জিহ্বা, সেলাই খুলে, স্লো-মোশনে, গড়িয়ে পড়া শার্টের বোতাম... সবকিছু ধক্ ধক্ করে, আজীবন ধক্ ধক্ করে চোখের সামনে। মিলু পালিয়ে যাচ্ছে, জীবন থেকে জীবনে আমার মাথার ভিতরের মিলু ছুটে যাচ্ছে। মাটিতে পা পড়ার দপ দপ আওয়াজ আসছে, পালানোর আওয়াজে অসহায় কবুতরের ব্যর্থ ডানার ঝাপট! মাঘ পূর্ণিমার চাঁদ লেগে যাওয়া পৃথিবীর আলপথে যেতে যেতে স্যার জীবনানন্দ দাশ আওড়ে ওঠেন,
“আমি কোনও এক পাখির জীবনের জন্য অপেক্ষা করছি
তুমি কোনও এক পাখির জীবনের জন্য অপেক্ষা করছ”
স্বপ্নে রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath Tagore) আসেননি কোনোদিন। জীবনানন্দও (Jibanananda Das) আসেননি... স্বপ্নে তৈরি হয়েছিলেন। তৈরি হয়েছিলেন বলেই না, অন্ধকার হয়ে আসা শস্যহীন দিনে আলপথ ধরে, ঘুমের মধ্যে স্পষ্ট, ঘুমের মতো স্পষ্ট, দ্রুত হেঁটে চলে গেলেন যেখানে যাওয়া মানা, ঠিক সেখানে। সাদা শার্ট... বা শাদা শার্ট আর ধুতির মলিন জীবনানন্দ। এমনভাবে হেঁটে চলে গেলেন যেন, স্বপ্নের আলপথে এই প্রথম নয়, অসংখ্যবার এমনভাবেই হেঁটে চলে গেছেন; ভিতর থেকে বেরিয়ে গেছেন। হেরে যাওয়া কাঁধ সমেত, মলিন জীবনানন্দ খালিপায়ে রুক্ষ আলপথ বেয়ে চলে গেলেন। থামলেন না। আমার ডাকে একবারের জন্যেও থামলেন না,
“স্যার! স্যার শুনছেন!-”, চিৎকার করে উড়ে গেল পোষা চিল।
জীবনানন্দ (Jibanananda Das) থমকালেন, শুধু ওই একবার। পিছু ফিরলেন না। নিশির ডাকের মতো হেঁকে যাওয়া চিলের ডানার কান্না শোনা গেল যতক্ষণ, ততক্ষণ স্যার থমকে থাকলেন। তারপর, পুনরায় দ্রুত হেঁটে চলে যেতে লাগলেন আরও অন্ধকারে, ঘোরের আলপথে খালিপায়ে হাঁটা শিখিয়ে দিয়ে। সে পথের গায়ে কেরানী বাবার বুকের রোমের মতো ঘাস গজিয়ে, কিশোর জ্যেষ্ঠপুত্রের মতো অনাদরের, মারিয়ে চলে যাওয়ার মতো ঘাস। নগ্ন পা সেই বুকে রেখে আরাম হল না। আশ্বাস হল। পায়ের তলার মাটি ধক্ ধক্ করছে। স্যারের পায়ের তলার মাটি ধক্ ধক্ করে কাঁপছে, আমার পায়ের তলার মাটি ধক্ ধক্ করে কাঁপছে। চাঁদ উঠে আসছে, আকাশে জীবনের চাঁদ উঠে আসছে। কাকতাড়ুয়াটা দুই হাত দুই দিকে ছড়িয়ে শস্যহীন মাঠে “থুঃ” করে থুতু ফেলে দিল। স্বপ্নের মধ্যে একা, দেখলাম জীবনানন্দ (Jibanananda Das) চলে গেছেন, যেখানে হারিয়েছে সমস্ত অতীত, পেনের ঢাকনা, প্রিয়জনের মুখ, যেখান থেকে ফিরে আসা একেবারে মানা, সেইখানে।
“অনেক ঘুমের মাঝে যখন শরীর ছেড়ে হৃদয় চলিয়া যায় ভেসে
বসন্তের পরিচ্ছন্ন রাতে এক সমুদ্রের ধারের বিদেশে
আমি স্বপ্ন দেখিলাম সুস্থ এক মানুষের মত,- ”
এমন সহজ দেখায় তাঁকে, আগে জানতাম না। পরে ছবিতে দেখলাম মণীন্দ্র গুপ্ত (Manindra Gupta) বা দেবারতি মিত্রকেও (Debarati Mitra) এমনই সহজ দেখতে। বিনয় মনুজদারকেও (Binay Majumdar) তো জলের মতো দেখায়। এঁদের ভাবনার পাশে, কাব্যের পাশে, এঁদের জলের মতো সহজ সহজ দেখায়। সমস্ত সহজ দেখতে কবির সমস্ত হেরে যাওয়া স্বল্প কাঁধ নিয়ে স্বপ্নের ভেতর সেইদিন দাঁড়িয়েছিলেন জীবনানন্দ দাশ (Jibanananda Das)। “হা হা!” করে কাঁধ ঝাঁকিয়ে হাসছিলেন আলপথের ধারে দাঁড়িয়ে, যখন বলেছিলাম, “স্যার, ১২০ বছর আগে, আজ আপনার জন্মদিন।” সেই হাসিতে আবার কেঁপে উঠছিল আলপথ, দূরে ঘনীভূত কুয়াশা সেই হাসি খাওয়ার লোভে আরও একটু কাছে সরে সরে আসছিল। স্যার আমায় চাঁদ দেখতে শেখালেন। আঙুলে করে খেলতে খেলতে মাঘ পূর্ণিমার চাঁদকে আকাশে তুলে দিয়ে বললেন, “যাই?”
“যাই নয়, আসি বলতে হয়...”
জীবনানন্দ চলে গেলেন। সমস্ত দোষ সমেত। সমস্ত ক্লেদ, গ্লানি, অপমান সমেত স্বল্প কাঁধ নিয়ে।
“আমি সব ছেড়ে দিয়ে এই স্তব্ধ জঙ্গলের পাশে
হাড়ের মতন শাদা চাঁদের মুখের দিকে চেয়ে”
সত্যি সত্যি চেয়ে রইলাম। আরাধনায় আসবেন বলে রবীন্দ্রনাথ (RabindranathTagore) আর কোনোদিন স্বপ্নে আসবেন না। জীবনানন্দ আসবেন, আলোচনায় আসবেন, রাগে, ঘৃণায়, ক্ষোভে, ব্যর্থতায়, নির্মমতায়, ভালোবাসাহীনতায়, বিপদে, বিফলতায়, বিষণ্ণতায়- আসবেন। অপমানের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকবেন আপনি। জীবনের ১২০ বছর পরেও আরও আরও আসবেন। বার বার আসবেন। পাঠে আসবেন, দৃশ্যে আসবেন। কল্পনায় আসবেন। দুশ্চিন্তায়। স্বপ্নে আসবেন, চলে যাওয়ার জন্য। ত্রস্ত করে দিয়ে চলে যাওয়ার জন্য।
“আমার কবিতার ডি- লূক্স এডিশন যখন বেরুবে
তখন আমার হাড় জিওলজির প্রয়োজনীয় স্তরের ভিতর চ’লে গেছে
আমি সিদ্ধার্থের মত হয়ে গেছি
সলোমনের মত হয়ে গেছি
ওমরের মত হয়ে গেছি
এই সব নাম শুধু;- নাম – নাম – নাম
আজকের ভোরের একটা চড়ুইয়ের কাছেও তার
ঘাস রোদ শিশিরের দাম
কি এ-সবের চেয়ে বেশি না?”
ঘাস রোদ শিশিরের মতো আপনি। জীবনের মতো ধকধকে। শীতের মতো তীব্র। নিষ্কামের মতো উদাস। সহজ- জলের মতো। জলের মতন আপনি। স্যার। আমার জীবনের আলপথে আপনার পায়ের ছাপ থেকে ধুলো উড়ুক। উড়তেই থাকুক।
* কবিতাগুলি জীবনানন্দ দাশের “ছায়া আবছায়া” সিরিজের।
* স্বপ্নদৃশ্য শাহাদুজ্জামানের “একজন কমলালেবু” পড়ার সময় প্রাপ্ত।