সাপের ছোবলকে বলা হয় ‘প্রসাদ’, কয়েকশো বছর ধরে সাপের পুজো হয় পূর্ব বর্ধমানে

বড়ো পোষলা গ্রামে ঝংকেশ্বরীর মন্দির
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে এক প্রধান ধারা ছিল মঙ্গলকাব্য। কোনো বিশেষ দেবতা বা দেবীর মাহাত্ম্য বর্ণনা করে মঙ্গলকাব্য লেখা হত। সর্পদেবী মনসাকে নিয়ে রচিত হয়েছিল মনসামঙ্গল। চাঁদ সওদাগরের ওপর দেবী মনসার নানা রকমের নির্যাতন, সাপের ছোবলে চাঁদ সওদাগরের ছেলে লখিন্দরের মৃত্যু, বেহুলার দুঃসাহসী অভিযান, লখিন্দরের প্রাণ ফিরে পাওয়া এবং সবকিছুর শেষে চাঁদ সওদাগরের মনসাপুজোর গল্প পদ্যের আকারে বলা হয়েছে এই কাব্যে। মনসামঙ্গলের কাহিনি অনুযায়ী, বেহুলা আর লখিন্দর যখন বাসরঘরে ছিলেন, ওই সময়ে কালনাগিনী গিয়ে লখিন্দরকে কামড়ে দেয়। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন লখিন্দর। বেহুলা তখন কালনাগিনীকে অভিশাপ দিলেন, সে হয়ে যাবে বিষহীন। এরপর থেকে লুকিয়ে থাকতে হবে তাকে। পূর্ব বর্ধমানের সাতটি গ্রামের অধিবাসীরা বিশ্বাস করেন, তাঁদের এলাকাতেই বাস করে কালনাগিনী।
মানুষ আর সাপের আশ্চর্য সহাবস্থান দেখা যায় ভাতার এবং মঙ্গলকোট অঞ্চলের বড়ো পোষলা, ছোটো পোষলা, শিকরতোড়, মইদান, পলসনা, নিগন, মুশারু – এই সাতটি গ্রামে। গত কয়েকশো বছর ধরে এখানকার মানুষরা এক কালো রঙের বিশেষ প্রজাতির সাপকে দেবী হিসেবে পুজো করেন। গ্রামবাসীরা মনে করেন, এই সাপ আসলে মনসামঙ্গলের কালনাগিনী। দেবী ঝাঁকলাই বা ঝংকেশ্বরী নামে এই সাপকে তাঁরা ডাকেন। ‘ঝংকার’ শব্দটা বেহুলার বালার আওয়াজ থেকে এসেছে বলে তাঁদের বিশ্বাস। বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের অনেকের মতে, কালিয়ানাগ দেবীই হলেন ঝাঁকলাই। আবার কেউ কেউ বলেন, বজ্রযানী বৌদ্ধদের দেবী জাঙ্গুলির থেকে ঝংকেশ্বরী নামটি এসেছে। আরেকটি মতে গঙ্গার প্রতিশব্দ ঝংকারিনীই হল ঝংকেশ্বরী নামের উৎস।
এখন অবশ্য মুশারু, পলসোনা, ছোটো এবং বড়ো পোষলা – এই চারটে গ্রামেই শুধু ঝাংলাইয়ের আনাগোনা দেখা যায়। রাস্তাঘাট তো বটেই, বাড়ির উঠোন, শোবার ঘর, রান্না ঘর – সব জায়গাতেই এরা বিচরণ করে। এই গ্রামগুলোয় সাপুড়েদের ঢুকতে দেওয়া হয় না। কেউ সাপ মারে না এখানে। কোনো সাপ মারা গেলে গঙ্গার ধারে তাদের দাহ করা হয়। ঝাঁকলাই সাপ কারো অপকার করে না। কোনো জীবজন্তুকে এরা কামড়ায় না। এদের খাদ্য ব্যাং, যাকে এখানকার মানুষ ‘নাড়ু’ বলে ডেকে থাকেন। কেউ যদি ভুল করে এদের মাড়িয়ে দেয়, তখন এরা ছোবল দেয় বটে, কিন্তু, গ্রামের লোকেরা বলে থাকেন, এদের ছোবলে বিষ নেই। এরা কামড়ালে দেহের সেই জায়গায় মন্দিরের মন্ত্রঃপূত মাটি লাগিয়ে দিলেই ব্যথা সেরে যাবে খানিকটা সময় পর। ঝাঁকলাইয়ের কামড়কে সবাই বলেন ‘প্রসাদ’। এখন অবশ্য আধুনিক বৈজ্ঞানিক চেতনা গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ায়, এই সাপ কামড়ালে চিকিৎসা করান কেউ কেউ।
আষাঢ় মাসে এই গ্রামগুলোতে দেবী ঝংকেশ্বরীর পুজো হয়। স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, কয়েকশো বছর আগে আষাঢ় মাসের কৃষ্ণপ্রতিপদে খুনগোর নামক জায়গায় প্রথম আবির্ভূত হন ঝাঁকলাই। মুশারু, পলসোনা, ছোটো পোষলা, বড়ো পোষলা গ্রামে দেবী ঝংকেশ্বরীর মন্দির আছে। তবে, মুশারুর মন্দিরটি সবথেকে বড়ো। দেবীর পুজো উপলক্ষ্যে প্রতেক বছর এখানে বিশাল মেলা হয়।
দেশ-বিদেশের বৈজ্ঞানিকরা এই সাপ নিয়ে গবেষণা করেছেন। গবেষকরা বলে থাকেন, ঝংকেশ্বরী আসলে এক ধরনের কেউটে। পাঁচ থেকে ছয় ফুট লম্বা এই সাপের গায়ের রং কালো। ফনায় চক্র আঁকা। এদের বাসা অনেকটা শঙ্খচূড়ের মতো। এরা গৃহপালিত সাপ, অন্য সাপেদের মতো নিশাচর নয়, দ্রুতও চলে না এরা, শ্লথ গতিতে দিনেই স্বচ্ছন্দে বিচরণ করে। গ্রামবাসীরা অনেকে বলেন, ঝাঁকলাই নিয়ে যথেষ্ট গবেষণা এখনও হয়নি। আরও অনেক গবেষণার প্রয়োজন। তবে, পূর্ব বর্ধমানের এই গ্রামগুলোতে সাপ এবং মানুষ যেভাবে বন্ধুর মতো মিলেমিশে থাকে, তা সারা পৃথিবীর কাছেই দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।
তথ্যঋণ – চৈতালি চক্রবর্তী, রানা সেনগুপ্ত, শ্যামসুন্দর বেরা।