কীভাবে পড়বেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে

“অনাবৃষ্টির-বর্ষার খররৌদ্রে সমস্ত আকাশ যেন মরুভূমি হইয়া উঠিয়াছে; সারা নীলিমা ব্যাপিয়া একটা ধোঁয়াটে কুয়াশাচ্ছন্ন ভাব; মাঝে-মাঝে উত্তপ্ত বাতাস, হু-হু করিয়া একটা দাহ বহিয়া যায়।” ‘চৈতালী-ঘূর্ণি’-র শুরুতেই এরকম একটা সূচনা বাক্য গোত্রহীন একটা ভূগোলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। এরপরেই গ্রামে ঢোকার পূর্বের নদী, নদীর চরায় শ্মশান, শ্মশানের অঙ্গার-শব-কঙ্কাল, শেয়াল-শকুন-কুকুরের লালসা সংক্ষুব্ধ মুখ-গহ্বরের রসাল জিভের ত্রাসের বর্ণনা। শ্মশান গ্রামের প্রান্ত চিহ্নায়ক। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়-এর নিজস্বতা হলো প্রান্ত হয়ে কেন্দ্রে ঢোকা। কিন্তু পরে ভূগোলের কেন্দ্র আবার প্রান্তে প্রসারিত হয়ে যায়। যেমন ধরা যাক - এই উপন্যাসেই বানের ঠেলায় শ্মশান এগিয়ে আসে গ্রামের ভিতরে। এই প্রান্ত এবং কেন্দ্রের দ্বন্দ্বই তারাশঙ্করের লেখার নিজস্ব ফর্ম। যেখানে ভূগোলই তার মৌল উপাদান। ‘চৈতালী-ঘূর্ণি’ সম্পর্কে বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, “ওঁর সমস্ত সাহিত্যসৃষ্টির Epitome, সংক্ষিপ্তসার।” এই কথায় সারবত্তা আছে। কেননা, কাহিনির শৈথিল্য এই উপন্যাসে প্রবল; ভূগোল তার বিবর্তিত রূপে খণ্ডিত চিত্রায়ন ঘটালেও কখন যে - নানা ঋতুতে বদলে যাওয়া ভূগোলের রূপ কাহিনির সূত্রে গ্রথিত হয়ে অখণ্ডতা তৈরি করে, তা সহজে বোঝা যায় না। পাঠক কেবল শেষ মুহূর্তেই সেটা উপলব্ধ করে।
যেমন ধরা যাক, ‘ডাইনি’ গল্পে ছাতি-ফাটার মাঠ থেকে শুরু হচ্ছে একটা আখ্যান : “ঘন ধূমাচ্ছন্নতার মত ধূলার একটা আস্তরণে মাটি হইতে আকাশের কোল পর্যন্ত আচ্ছন্ন হইয়া থাকে; অপর প্রান্তের সুদূর গ্রামচিহ্নের সীমারেখা প্রায় নিশ্চিহ্ন হইয়া যায়।” এবার শেষ অংশটুকু পড়ুন : “চারিদিকে দিক চক্ররেখার চিহ্ন নাই; মাটি হইতে আকাশ পর্যন্ত একটা ধূমাচ্ছন্ন ধূসরতা।” এই যে শুরুতে প্রান্তের চিহ্ন আবছা থাকলেও শেষে দিকচক্ররেখা হারিয়ে যায় — এটাকেই আমরা তাঁর সাহিত্যের মূল দ্বন্দ্ব ও পরিণতি বলতে চাইছি। বিধবা বৃদ্ধা ‘ডাইনি’ - নিজের কাছেই তার এই স্বীকৃতি। বাৎসল্যের নিঃশ্বাস আর মাঠের উপকথার সর্পবিষ এক হয়ে যায়। অথচ, এটা ডাইনির গল্পই হতে পারত - কিন্তু হলো না, কেবল ওই চরিত্রের সঙ্গে ভূগোলের একাকারের জন্যেই। ভূগোল এখানে মৌল উপাদান - তার প্রাকৃতিক স্বাতন্ত্র্য উপকথার জন্ম দিয়েছে - নাম নিয়েছে ছাতি-ফাটার মাঠ, অর্থাৎ এ মাঠের পারাপারে তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে প্রাণবায়ুর নিস্ক্রমণ কোনো বিচিত্র ঘটনা নয়। এই ভূগোলই ডাইনির উপকথার জন্ম দেয় এবং ডাইনির মানসজগৎকেও নিয়ন্ত্রণ করে। সচেতন পাঠক নিশ্চয়ই লক্ষ করবেন প্রথম উপন্যাসের প্রথম বাক্যের সঙ্গে এই গল্পের শেষ বাক্যের একটা যোগ রয়েছে — আকাশের সঙ্গে মাটির যোগচিহ্ন রচনা করা হয়েছে ধুলোর সূত্রে। এরকম দৃষ্টান্ত বহু দেওয়া যায়। আসলে রুক্ষ্ম রাঢ়ের ভৌগোলিকতায় ছোটো ঘূর্ণিঝড়ের দৃশ্য হামেশাই দেখা যায়। তাঁর লেখায় ভাববলয় এরকম একটা সহজ বিজ্ঞানের পটভূমিতেই - এ কথা মনে রাখতে হবে। একবার সমরেশ বসু ‘আবেগতাড়িত’ হয়ে দেবেশ রায়কে বলেছিলেন : “রাঢ়ে প্রকৃতি বলে কিছু আছে? ...তারই মধ্যে উনি এত কিছু কী করে পেলেন, যেন মনে হয় বলে আর শেষ করা যায় না।” সমরেশ এটা বোঝেননি যে তারাশঙ্কর প্রকৃতির ছবি আঁকছেন না - একটা নির্দিষ্ট ভূগোলকে তার দেশিকতার সমস্ত বৈশিষ্ট্য সমেত আখ্যানের বীজ হিসেবে পুঁতে দিয়েছেন।
তারাশঙ্করের আগে ভূগোল এসেছে চরিত্র বা ঘটনার হাত ধরে - চরিত্র না দেখলে চারপাশ দেখা যায় না। কিন্তু তারাশঙ্করে ভূগোল নিরপেক্ষে চরিত্র-ঘটনা কিছুই শৈলীর অখণ্ডতা তৈরি করতে পারে না। এই রূপকলার অজ্ঞানতার জন্যেই দেখি সমসাময়িক কালে তারাশঙ্করকে গেঁয়ো, প্রতিক্রিয়াশীল, আঞ্চলিকতাক্লিষ্ট, ব্যক্তিত্ববাদহীন, বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে অধ্যাত্মদৃষ্টির প্রচারক, ভালগার, শিথিল রচনাশৈলীর তকমায় সরিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন সাহিত্যের হোমরা-চোমরা ‘প্রগতিবাদী’-রা। এই নিয়ে তারাশঙ্করের মানসিক সংকট রবীন্দ্রনাথকে দেওয়া তাঁর চিঠিতে স্পষ্ট। তিনি বলছেন : “আমার কলম এবং মন স্থূল বলেই নাকি, আমি আখ্যানবৈচিত্র্য এবং মানুষের রূপের পক্ষপাতী। এ বিষয়টি সম্বন্ধে আপনার কাছে আমার জানবার বাসনা আছে...” এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলছেন: “তোমার স্থূলদৃষ্টির অপবাদ কে দিয়েছে জানিনে কিন্তু আমার তো মনে হয় তোমার রচনায় সুক্ষ্মস্পর্শ আছে... গল্প লিখতে বসে যারা গল্প না লেখাটাকেই বাহাদুরি মনে করে তুমি যে তাদের দলে নাম লেখাওনি এতে খুশি হয়েছি। এর সঙ্গে বাস্তবতা এবং অকৃত্রিমতার কথা তুলেছেন; অবশ্যই ফর্মের অকৃত্রিমতা। রবীন্দ্রনাথও যে পুরোপুরি বোঝেননি তা সুক্ষ্মস্পর্শ ও গল্পের নিটোলতার কথায় স্পষ্ট।
যদিও তারাশঙ্করের শেষের দিকের অনেক লেখায় কাহিনিই নিয়ন্ত্রক। সম্ভবত সে সব লেখার দিকে তাকিয়েই তিনি পুত্র সনৎকুমারকে বলেছিলেন, “অজস্র লিখেছি তোমাদের পেট ভরাতে। যা বাজে লেখা আছে সেগুলো ফেলে দাও, আর প্রকাশ করো না। ওই রচনায় তোমার পিতার খ্যাতিবৃদ্ধি হবে না।” তিনি নিজেও নিজের সমালোচনা করে বলেছেন যা তিনি লিখতে চেয়েছেন তা অনেক জায়গায় তিনি ঠিক মতো ফোটাতে পারেননি। এটাও ঘটেছে তাঁর লেখা পরিমার্জন করার সময়াভাব ও প্রচুর লিখতে হওয়ার বাধ্যতার জন্যেই।
আমরা বলতে চাইছি কেন্দ্রীয় ভৌগোলিকতাকে তিনি ভেঙে প্রান্তিকতার দিকে ঠেলে দিয়েছেন - কেননা সেটাই সমকালীন বাস্তব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে ধনতন্ত্রের বিস্তারে সামন্ততন্ত্রের ভাঙনে কুক্ষিগত ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয়। পরে ভূগোলের সীমানা বাড়ে। হাঁসুলীবাঁকের উপকথা-য় কাহারদের ছোটো পাড়ার উপকথা-লোকযান-জীবনচর্চার সারল্য ভেঙে যায় প্রবল জলোচ্ছ্বাসে এবং কাহাররা কেন্দ্রচ্যুত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে প্রান্তরে। কেন্দ্রকে তারা বহন করে স্মৃতিতে ও আবেগে। তাই নসুবালা গান বাঁধে, তাই করালী গাঁইতি চালিয়ে নতুন কাহারপাড়া গড়ার স্বপ্ন দেখে। ভৌগোলিক কেন্দ্রের সঙ্গে প্রান্তের দ্বন্দ্বে কেন্দ্রচ্যুতিই তারাশঙ্কর পাঠের মূল শর্ত, মৌলিক রসবস্তু।
এ প্রসঙ্গে বলি, ‘সন্দীপন পাঠশালা’-র সিনেমা রিলিজ করার পরে হাওড়ায় তারাশঙ্করের উপর মাহিষ্য সম্প্রদায় আক্রমণ চালায় - তাদের বক্তব্য হলো, চাষি-কৈবর্তদের সঙ্গে মাহিষ্যদের এক করে দেওয়া হয়েছে এখানে। কিন্তু, বাস্তবতা এটাই যে, ধনতন্ত্রের পেষণে হিন্দুর লালিত বর্ণব্যবস্থা-জাতিপ্রথা-উপাধি-শিক্ষা-সংস্কৃতি সবই নষ্ট হয়ে গেছিল। ফলে আক্রমণের ঘটনা আসলে তারাশঙ্করের দৃষ্টিভঙ্গির স্বচ্ছতাই প্রমাণ করে। কেন্দ্রীয় ভূগোল (এখানে সাংস্কৃতিক পরিসর)-কে আঁকড়ে ধরে রাখতে চেয়েই কি আক্রমণ নয়?
যদিও তারাশঙ্করের শেষের দিকের অনেক লেখায় কাহিনিই নিয়ন্ত্রক। সম্ভবত সে সব লেখার দিকে তাকিয়েই তিনি পুত্র সনৎকুমারকে বলেছিলেন, “অজস্র লিখেছি তোমাদের পেট ভরাতে। যা বাজে লেখা আছে সেগুলো ফেলে দাও, আর প্রকাশ করো না। ওই রচনায় তোমার পিতার খ্যাতিবৃদ্ধি হবে না।”
এখানে স্পষ্ট করে দিই ভূগোল বলতে আমরা শুধু জল-মাটি-স্বাভাবিক উদ্ভিদের ভূগোলকে বোঝাচ্ছি না কৌম-সাংস্কৃতিক পরিচয়কেও বোঝাচ্ছি। সে জন্যেই তারাশঙ্করের ‘রাঢ়ের কথাকার’ তকমা তাঁকে অনেক তরল করে দেয়।
যাই হোক, এক সাহিত্যসভায় অতুল গুপ্ত তারাশঙ্করকে অভিহিত করেছিলেন ‘বঙ্গসরস্বতীর খাসতালুকের প্রজা’ অভিধায়। কিন্তু, এই খাসতালুক যদি বীরভূম হয় - তাহলে বুঝতে হবে তন্ত্র-অধ্যুষিত শক্তিসাধন ক্ষেত্র বীরভূমে সরস্বতী অর্থে তান্ত্রিক সরস্বতী, নীলসরস্বতী - তন্ত্র-সরস্বতীর উপাসনার জন্যেই বোধহয় জীবনের প্রথম উপন্যাসের সূচনা তিনি করেন শ্মশান বর্ণনায়।
_______
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মদিবস