ঠাকুরবাড়ির অনালোচিত তেজস্বী জামাই জানকীনাথ ঘোষাল

প্রথম ভারতের জাতীয় কংগ্রেস, জানকীনাথ ঘোষালের ছবি আলাদা করে পাওয়া যায় না
ঠাকুরবাড়ির ছেলেমেয়েদের বিয়ের গল্পগুলো অন্যরকম। পিরালি ঘরের ব্রাহ্মণ হওয়ায় পাত্রপাত্রী পাওয়া বেশ কঠিন ব্যাপার ছিল। ছেলেদের বিয়ের সময় যশোরের পিরালি ব্রাহ্মণ ঘরের থেকে মেয়ে আনা হত। ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের বিয়ের সময় শিক্ষিত তরুণ যুবকদের প্রায় ধরে নিয়ে এসে বিয়ে দেওয়ার গল্পও বেশ প্রচলিত। কোনো কোনো ব্রাহ্মণ তরুণ আবার স্বতঃপ্রণোদিতভাবেই ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের বিয়ে করতেন, পরিণতি হিসেবে নিজের বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক থাকত না তাঁদের। এই রীতিই চলে আসছিল। ঠাকুরবাড়ি তখনই একটা প্রতিষ্ঠান। ঠাকুরবাড়িতেই রয়ে যেতেন তাঁরা। স্বর্ণকুমারীদেবী ছিলেন ঠাকুরবাড়ির অন্যতম সেরা মেয়ে। রূপে লক্ষ্মী গুণে সরস্বতী! তাঁর সঙ্গে বিয়ে হল জানকীনাথ ঘোষালের। তিনি ঠাকুরবাড়ির মেয়েকে ভালোবেসে বিয়েও করলেন আবার পৃথক বাড়ি বানিয়ে স্ত্রী পুত্র নিয়ে সুখে জীবন কাটালেন।
জানকীনাথের আদি বাড়ি ছিল নদিয়ার জয়রামপুরের ঘোষাল বংশে। জয়চন্দ্র ঘোষালের দুই ছেলের মধ্যে ছোটো ছেলে ছিলেন জানকীনাথ। অসম্ভব তেজ আর সাহস এই বংশের ছেলেদের মধ্যে ছিল। বীরত্বের পুরস্কার হিসেবে নাকি ঘোষাল বংশের জমিদারি পাওয়া গিয়েছিল। কৃষ্ণনগরের রাজা এই পুরস্কার দিয়েছিলেন। কথিত আছে রাজার এলাকায় বুনো মহিষের অত্যাচার শুরু হয়েছিল। তখন রাজা দুজন ঘোষাল ভাইকে ডেকে নিলেন। ঘটনা শুনে তাঁরা বললেন, এই একটা বুনো মোষের জন্য দুজনের কি দরকার? তারপর কোনো একজন ভাই কাঠের মোটা একটা চ্যালা নিয়ে যুদ্ধে গেলেন। সঙ্গে রাজা, তাঁর অনুচর, গ্রামবাসী সবাই চললেন লড়াই দেখতে। মহিষের শিং ধরে তাকে কুপোকাত করে ফেলার গল্পটাই লোকের মুখে মুখে প্রচলিত হয়ে গেল। রাজা ঘোষাল পরিবারকে মস্ত জমিদারি ব্রহ্মত্র করে দিল। এই বংশেরই আরেকজন বাঘের সঙ্গে সম্মুখ সমর করে বাঘকেও পরাজিত করে। ঘোষালদের ভয়ে ডাকাতরাও জয়রামপুরে ঢুকতে ভয় পেত। এইসব গল্প অতিরঞ্জিত হলেও ঘোষালদের ব্যক্তিত্ব ও শারীরিক শক্তি সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি হয়।
জানকীনাথ এবং তাঁর দাদাও শৈশবে লাঠিখেলা, বর্ষাখেলা, ঘোড়ায় চড়া ইত্যাদি শিখেছেন। শোনা যায় একবার চুঁচুড়াতে রাত্রিবেলায় মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের মশারিতে আগুন লাগে। জানকীনাথ তাঁকে একাই কোলে করে উঠিয়ে নিয়ে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যান।
জানকীনাথ এবং তাঁর দাদাও শৈশবে লাঠিখেলা, বর্ষাখেলা, ঘোড়ায় চড়া ইত্যাদি শিখেছেন। শোনা যায় একবার চুঁচুড়াতে রাত্রিবেলায় মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের মশারিতে আগুন লাগে। জানকীনাথ তাঁকে একাই কোলে করে উঠিয়ে নিয়ে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যান। হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক দুরন্ত ঘোড়া ছিল। কেউ সেই ঘোড়ায় চড়তে সাহস পেত না। কিন্তু জানকীনাথ সেই ঘোড়ায় চড়েই বাড়ি থেকে স্টেশনের দিকে গিয়েছিলেন। তেজি ঘোড়াটিকে বশ করেই। একবার জোড়াসাঁকোয় বাজি রেখে ছাদের ত্রিকোণচূড়া এক আলিসায় দৌড়ে গিয়েছিলেন। টাল সামলাতে না পারলে মৃত্যু নিশ্চিত ছিল। কিন্তু হার না মানা মানুষের কাছে জীবনটাই চ্যালেঞ্জ।
স্বর্ণকুমারীদেবী
জানকীনাথের বাবাও তাঁকে ত্যাজ্য করেছিলেন। তবে দেবেন্দ্রনাথের মেয়েকে বিয়ে করার জন্য নয়। সে অন্য এক গল্প। জানকীনাথকে তাঁর বাবা নিজের ইচ্ছেতেই কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুলে পাঠিয়েছিলেন। সেখানে জানকীনাথ শোনেন রামতনু লাহিড়ীর বক্তৃতা। তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে জাতিভেদাভেদের প্রতিবাদ করতে গিয়ে যজ্ঞোপবীত ত্যাগ করেছিলেন। উপবীত ত্যাগের ঘটনা জানকীনাথের বাবার কানে গিয়ে পৌঁছায়। জয়চন্দ্র ঘোষাল জানকীনাথকে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করেন। পরে জানকীনাথের বড়ো দাদা মারা গেলেও জয়চন্দ্র জানকীনাথকে সম্পত্তি দেবেন না বলে সম্পত্তির একটি অংশ বিক্রি করে দেন। জানকীনাথও কখনও নিজের আদর্শ ত্যাগ করেননি। একসময় পুলিশের চাকরিও করেছেন। এরপর যখন দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা হয় সুদর্শন জানকীনাথের, তখন দেবেন্দ্রনাথই উৎসাহ নিয়ে স্বর্ণকুমারীদেবীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে দেন। এই বিয়ের পর জানকীনাথের বাবা খুশি হয়ে নবদম্পতিকে আশীর্বাদ করেন। তবে ঠাকুরবাড়ির দুটি রীতি গ্রহণ করেননি জানকীনাথ। একটি বিবাহকালে উপবীত গ্রহণ করে ব্রাহ্ম হওয়া এবং অন্যটি ঘরজামাই থাকা। স্বর্ণকুমারীকে বিয়ে করার পর জানকীনাথের সঙ্গে তাঁর বাবার সম্পর্ক আবার তৈরি হয়। জানকীনাথ ছিলেন স্বর্ণকুমারীর লেখাপড়ার কাজে প্রধান সহায়ক। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বন্ধু ছিলেন তিনি। বিদ্যাসাগরের সঙ্গেও খুব যোগাযোগ ছিল তাঁর। তিনি ত্যাগী ছিলেন।
জানকীনাথকে তাঁর বাবা নিজের ইচ্ছেতেই কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুলে পাঠিয়েছিলেন। সেখানে জানকীনাথ শোনেন রামতনু লাহিড়ীর বক্তৃতা। তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে জাতিভেদাভেদের প্রতিবাদ করতে গিয়ে যজ্ঞোপবীত ত্যাগ করেছিলেন। উপবীত ত্যাগের ঘটনা জানকীনাথের বাবার কানে গিয়ে পৌঁছায়। জয়চন্দ্র ঘোষাল জানকীনাথকে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করেন।
একবার নিলামে কিছু বিষয় ক্রয় করেছিলেন। পরে সেইসব বিষয়ের পুরোনো মালিকরা এসে সেইসব বিষয় ফেরত চাইলে তিনি ফেরত দিয়ে দেন। রোগীর সেবা করতেন যত্ন করে। মহর্ষির সেবা তো বটেই, দাসদাসীর অসুখ হলেও সেবা করতেন। কলকাতার অনেক কাজে যুক্ত ছিলেন। অনেক বছর কমিশনার ছিলেন। অনারারি ম্যাজিস্ট্রেটও ছিলেন। ন্যাশনাল কংগ্রেসের কাজও করেছেন। তিনি ছিলেন জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা। কংগ্রেসের কাজে মগ্ন হয়ে থাকতেন। গান্ধিজির সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল তাঁর। এরপর জানকীনাথ থিয়োজফিস্ট সোসাইটির অংশ হয়েছিলেন। মৃত্যুকালে ঘোরের মধ্যেও কাজের কথাই বলতেন। সেই সময়ে এক শিক্ষিত উচ্চবিত্ত মানুষ জীবনের সব ক্ষেত্রে এমন পরোপকারী ও কর্মোদ্যোগ নিয়ে থাকতেন, এটি একটি দৃষ্টান্ত। ঠাকুরবাড়ির বনেদিয়ানাও জানকীনাথের স্বাতন্ত্র্য খর্ব করতে পারেনি।
____
সহায়ক গ্রন্থঃ স্মৃতিকথায় জোড়াসাঁকো,পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়