পুলিশের লাঠিচার্জ, অকস্মাৎ ক্যান্সার - ছেলেকে হারিয়েও লড়াই জারি রেখেছিলেন জাহানারা ইমাম

বইয়ের পাতায় বাস্তবের ছোঁয়াচ বড়ো সত্যি হয়ে উঠলে অনেক রূঢ় সত্যের সম্মুখীন হন পাঠক। মৃত সন্তান ব্রতীর স্পর্শ পেতে সুজাতারা তখন এক লহমায় হয়ে ওঠেন ‘হাজার চুরাশির মা’ অথবা সর্বনাশের আগুনে বলি হওয়া ‘বাদল’-এর মা। নিজের নাম ধাম ভুলে পরিচিত হন ‘শহিদের মা’ ডাকে। সত্য আর কল্পনার এই জটের গিরে একটার পর একটা খুলতে বসলে, সহৃদয়ী পাঠক এরপর ওপার বাংলার আরেক মায়ের মুখোমুখি হবেন। লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট, সংগ্রাম পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হলেও, যে মা তার সন্তানকে যুদ্ধে পাঠায়। কিন্তু সন্তান আর ফেরে না সে মায়ের কাছে, ফেরে তার লাশ। যুগে যুগে কালে কালে বৃহতের সাধনায় জীবন উৎসর্গ করা, সন্তানহারা সব মায়েদের চোখের জল মাথায় তুলে স্বাধীন বাংলাদেশের সেই জননী জাহানারা ইমাম (Jahanara Imam) এরপর লেখেন বেদনা, লিখে রাখেন সত্যিকারের ইতিহাস। জাহানারার সে যন্ত্রণা পৃথিবী খ্যাত হয় ‘একাত্তরের দিনগুলি’ (Ekattorer Dinguli) নামে।
“...আম্মা দেশের এই রকম অবস্থায় তুমি যদি আমাকে জোর করে আমেরিকায় পাঠিয়ে দাও, আমি হয়তো যাব শেষ পর্যন্ত। ...বড়ো ইঞ্জিনিয়ার হবো; কিন্তু বিবেকের ভ্রুকুটির সামনে কোনোদিন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব না। তুমি কি তাই চাও আম্মা?
আমি জোরে দুই চোখ বন্ধ করলাম বললাম, না তা চাই নে। ঠিক আছে, তোর কথাই মেনে নিলাম। দিলাম তোকে দেশের জন্য কোরবানি করে। যা তুই যুদ্ধেই যা।”
আরও পড়ুন: স্বাধীন বাংলাদেশ – স্মৃতি এবং স্মৃতির কাঁটা
এভাবেই নিজের চোখের জল লিখেছেন জাহানারা ইমাম। লিখেছেন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় সন্তান ‘রুমি’-কে কোরবানি দেওয়ার কথা। ক্ষতবিক্ষত হৃদয় নিংড়ানো এই সৃষ্টিতেই আমৃত্যু সংগ্রামী জাহানারা হয়ে উঠেছিলেন লক্ষ কোটি সন্তানের মা; ‘শহিদ জননী’ (Shahid Janani)। প্রথম জীবনে প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে বহুদূরে বাস ছিল এই মানুষটির। তারপর একদিন এই জাহানারাই শুধুমাত্র নিজস্ব দক্ষতায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়ে, সাদা আর কালোর তফাৎটা চোখে আঙুল দিয়ে গোটা বিশ্বকে দেখাতে পেরেছিলেন। বাংলাদেশের গণজাগরণের যে কণ্ঠ আজ বিশ্ববন্দিত, তার প্রথম প্রত্যক্ষ স্বর ধ্বনিত হয়েছিল ‘শহিদ জননী’ জাহানারা ইমামের কণ্ঠেই। বাংলাদেশ পেরিয়ে গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধ মৌলবাদের বিরুদ্ধে, নারীর স্বাধীকার প্রশ্নে, আপসহীন সংগ্রামী, বাংলাদেশের কিংবদন্তী সুফিয়া কামালের লড়াইয়ের গর্বিত উত্তরাধিকার নীলিমা ইব্রাহিম, জাহানারা ইমামের মতো মানুষেরা।
অবিভক্ত বাংলার মুর্শিদাবাদের (Murshidabad) সুন্দরপুরে ১৯২৯ সালের আজকের দিনে জন্ম হয় জাহানারার। রাঢ় বাংলার অভিজাত রক্ষণশীল বাঙালি মুসলমান পরিবারে বড়ো হওয়া তাঁর। ছোটো থেকেই বিরুদ্ধ পরিবেশকে অতিক্রম করে যাওয়ার এক অদম্য সাহসের অধিকারী ছিলেন জাহানারা। পর্দাপ্রথায় জেরবার সে সময়ে, তাঁর উদারমনা বাবার উৎসাহেই জাহানারার জীবনে প্রথম শিক্ষার আলো এসে পড়ে। নানা ধরনের বই, নানান পত্র-পত্রিকা, মানুষের জীবনী পড়ে বড়ো হয়েছেন জাহানারা। জীবনের বহুমুখীকরণের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন, অনুপ্রাণিত হয়েছেন। বাবার বদলির চাকরি হওয়ার সুবাদে ছোটো থেকেই বারবার নানা জায়গায় মাটির ছোঁয়া গায়ে মেখেছেন জাহানারা ইমাম। আর এত অদলবদলের মাঝেও প্রতিবার প্রতিক্ষেত্রে পল্লবিত হয়েছেন নতুনভাবে। বাবার বন্ধু ‘মটকা চাচা’র প্রবল উৎসাহে জীবনের নানা রঙের স্পর্শ পেয়েছিলেন তিনি। এই চাচার আগ্রহেই রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে পড়ার ইচ্ছে হয় জাহানারার যদিও কার্যক্ষেত্রে এই ইচ্ছা তাঁর জীবনে বাস্তবায়িত হয়নি কখনওই। একদিকে বাড়িতে ইন্দুবালা, আব্বাসউদ্দীন, আঙুরবালা, কনক দাসের গান; অন্যদিকে অবিভক্ত বাংলায় সুদূর রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে এসে কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে পড়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (Dhaka University) থেকে, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি থেকে একের পর এক ডিগ্রি লাভ, স্কুলে পড়ানো ইত্যাদি জাহানারা ইমামের জীবনটাকে আর পাঁচজন শিক্ষিত সচেতন মধ্যবিত্তের জীবনই উপহার দিয়েছিল। তখনও পর্যন্ত সাধারণের চেয়ে খুব বেশি আলাদা ছিলেন না তিনি। কিন্তু এর মাঝেই তাঁর স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর ধীরে ধীরে ধ্বনিত হচ্ছিল ষাটের দশকে জাহানারার লেখাপত্রে।
মূলত শিশু সাহিত্যিক হিসাবেই লেখার জীবন শুরু হয় জাহানারা ইমামের। ‘গজকচ্ছপ’, ‘সাতটি তারার ঝিকিমিকি’র মতো বই তিনি উপহার দিয়েছেন নতুন প্রজন্মকে। জাহানারার অনুবাদে সত্যিই যেন লরা ইঙ্গেলসের ‘লিটল হাউস অন দ্য প্রেইরি’ পেরিয়ে শিশু কিশোর জীবনে ‘নদীর তীরে ফুলের মেলা’ বসেছে। জাহানারা জানতেন, একটি শিশুকে না বুঝলে দেশকে বোঝা হয় না পুরোপুরি, তাই যেন তাঁর এমন যুগোপযোগী অনুবাদ। এরই মাঝে জাহানারা স্থির করে ফেলেছিলেন ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের কথা লিখবেন দিনলিপির আকারে। যে মানুষটি দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজের ছোটো ছেলে রুমিকে হারান, পাকবাহিনীর অত্যাচারের শিকার যার স্বামী শরীফ ইমাম, বড়ো পুত্র জামি, তার কাছে এই দিনলিপির একটি অক্ষরও বাইরে থেকে ধার করতে হয়নি। কিন্তু শুধুমাত্র লিখে রাখাতেই জাহানারা থেমে যাননি, এটাই তাঁর হৃদয়বত্তা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী, ‘দালাল আইনে’ চিহ্নিত, গণধিকৃত গোলাম আযমকে জামায়াতে ইসলামী তাদের দলের আমীর ঘোষণা করলে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে জাহানারার। গণবিক্ষোভ শুরু হয় সারা বাংলাদেশ জুড়ে। যে মানুষটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর পরিবারকে বলি দিয়েছেন স্বেচ্ছায়, সগৌরবে, নতুন দেশ গঠনের পরেও কিছু কুচক্রীর হাতে সে দেশকেই আবার তুলে দেওয়ার এই রাষ্ট্র ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ঝলসে উঠেছেন জাহানারা। তাঁর নেতৃত্বেই যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে তদন্ত, গণআদালত গঠন, গণজাগরণের ডাক এসবই প্রত্যক্ষ করেছে নব্বই দশকের বাংলাদেশ। রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য জাহানারা সহ তাঁর অনুগামীদের জামিন অযোগ্য মামলারও মুখোমুখি হতে হয়। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সমাবেশে নির্বিচারে করা পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হন জাহনারা। আর এর কিছুদিনের মধ্যেই মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন জাহানারা, বাকশক্তি প্রায় ক্ষীণ হয়ে আসে। কিন্তু না হারা এক লড়াইয়ের নাম, চিরকালের এক সংগ্রামের অপর নাম বুঝি জাহানারা।
যে মানুষটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর পরিবারকে বলি দিয়েছেন স্বেচ্ছায়, সগৌরবে, নতুন দেশ গঠনের পরেও কিছু কুচক্রীর হাতে সে দেশকেই আবার তুলে দেওয়ার এই রাষ্ট্র ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ঝলসে উঠেছেন জাহানারা। তাঁর নেতৃত্বেই যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে তদন্ত, গণআদালত গঠন, গণজাগরণের ডাক এসবই প্রত্যক্ষ করেছে নব্বই দশকের বাংলাদেশ।
জীবনের শেষ মুহূর্তেও যিনি বলে যান, “আমি আমার অঙ্গীকার রেখেছি। রাজপথ ছেড়ে যাইনি। মৃত্যুর পথে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা কারো নেই। তাই আপনাদের মনে করিয়ে দিতে চাই আপনারা আপনাদের অঙ্গীকার ও ওয়াদা পূরণ করবেন। আন্দোলনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ে থাকবেন।”
যে মানুষটি লেখেন, ‘অন্য জীবন’, ‘বীরশ্রেষ্ঠ’, ‘জীবন মৃত্যু’, লেখেন ‘নয় নয় এ মধুর খেলা’, ‘ক্যান্সারের সঙ্গে বসবাস’, মধ্যবিত্ত নিরুপদ্রব জীবনের ঘেরাটোপ ছেড়ে সেই মানুষটিই প্রত্যক্ষ লড়াইয়ের ময়দানে নামতে পারেন। আজ, বাংলাদেশে যতটুকু গণতন্ত্র ফিরে এসেছে, ‘গণতদন্ত কমিশন’-এর মধ্যে দিয়ে তার সার্বিক প্রেক্ষাপট তৈরি করে দিয়েছেন সুফিয়া কামাল, জাহানারা ইমামরা। স্বাধীন বাংলাদেশকে সার্বভৌম করার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় পর্যায়ের সূচনা হয়েছিল জাহানার হাতে। তাই তো রুমির মৃত্যুর পর জাহানারা কেবল একা রুমির মা হয়েই বাঁচেননি, বেঁচেছেন লক্ষ লক্ষ মুক্তিকামী ছেলেমেয়ের ‘শহিদ জননী’ হয়ে।
এখনও যে বাংলাদেশে (Bangladesh) দিনরাতের তফাৎ ঘুচে শাহবাগের জাগরণ শোনা যায়, মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কথা বলে খুন হয়ে যাওয়া ব্লগারদের ভিড়েও যে গুটিকয়েক মানুষ শোষণ-বৈষম্যহীন, উদার, শিক্ষিত রাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন, তাদেরকে বীজমন্ত্র দেন জাহানারা। তাদের কানে কানে এসে যেন বলে যান তিনি ‘কোটি কোটি মানুষ এখনও বুকে গভীর ক্ষত ও যাতনা নিয়ে বেঁচে আছেন। তাঁদের কাছে যাও, তাঁদের কাছ থেকে জেনে নাও মুক্তিযুদ্ধের আসল ইতিহাস।’ কারণ মেনে নেওয়া আর মানিয়ে নেওয়ার এই জীবন শৈলীতে ভালোবাসা, প্রতিবাদ, রুখে দাঁড়ানো, প্রাপ্যটুকু আদায় করার যে সম্মিলিত প্রবাহ, আজও তার নাম ‘জাহানারা ইমাম’।
তথ্যঋণঃ
শহিদ জননী জাহানারা ইমাম — তাহমীদা সাঈদা