No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    দেশভাগের দগদগে ক্ষত নিয়েই নারীশিক্ষায় ব্রতী হয়েছিল যাদবপুর সম্মিলিত বালিকা বিদ্যালয়

    দেশভাগের দগদগে ক্ষত নিয়েই নারীশিক্ষায় ব্রতী হয়েছিল যাদবপুর সম্মিলিত বালিকা বিদ্যালয়

    Story image

    “আসল জিনিস দেখবি তো চল ওপারে,

    আমাদের নিজের দেশে, নতুন দেশে,

    নতুন দেশের নতুন জিনিস মানুষ নয়,

    জিনিস, সে জিনিসের নাম কী?

    নতুন জিনিসের নতুন নাম, উদ্বাস্তু.....”

    সময়টা ১৯৪৭-এর ১৪ অগাস্ট। এমনই অস্থিরতা মানুষের মনের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল। এসব ভাবলে এখনও ৮৫-র ঘরে যাঁদের বয়স, তাঁদের গলার স্বর রুদ্ধ হয়ে আসে। কোনও একটা বেদনা যেন কুঁড়ে কুঁড়ে খেয়ে ফেলে শরীর, মন সব।

    তবে, এই সকরুণ বেদনা বুকে চেপে ওপার বাংলা থেকে শুধুমাত্র দেশভাগের জন্য এপার বাংলায় চলে আসা মানুষগুলো দ্রুত স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন। আর সেই স্বপ্নের ফসল হল এক কালের ‘যাদবপুর সম্মিলিত উদ্বাস্তু বালিকা বিদ্যালয়’, যা এখন ‘যাদবপুর সম্মিলিত বালিকা বিদ্যালয়’ নামে পরিচিত। “উদ্বাস্তু” তকমাটা এই স্কুলের নামের থেকে অনেক কাল আগেই উঠে গিয়েছে।

    যাদবপুর, বাঘাযতীন, রামগড়, বিদ্যাসাগর, বিধানপল্লী, শক্তিগড় ইত্যাদি কলোনির জন্ম হয় ১৯৫১ সালে বা তার কিছু আগে-পরে। এই সব এলাকায় বেশিরভাগ স্কুল, ক্লাব, লাইব্রেরি গড়ে উঠেছিল ১৯৫১ সালে। আজ যাকে যাদবপুর সম্মিলিত বালিকা বিদ্যালয় বলে জানি, সেই স্কুলটিরও জন্ম ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রী সংগ্রহ করেছিলেন বাঘাযতীন এলাকার সেই সময় ওপার বাংলা থেকে এপার বাংলায় চলে আসা, আবার নতুন করে বাঁচার স্বপ্নে বিভোর একঝাঁক মানুষ। ঘরবাড়ি ছেড়ে আসার দুঃখকে অনেকটাই সামলে নিয়ে নতুন করে বাঁচার নেশাই ছিল এই মানুষগুলোর একমাত্র সম্বল। আর ছিল অদম্য জেদ। জেদই বলুন বা সদিচ্ছা, তাই দিয়েই গড়ে উঠেছিল যাদবপুর সম্মিলিত বালিকা বিদ্যালয়, আজ যা দক্ষিণ কলকাতার যাদবপুর, বাঘাযতীন, বিদ্যাসাগর, রামগড়, বিধানপল্লী এলাকার অন্যতম ভালো স্কুল বলতে যা বোঝায় তাইই।

    দক্ষিণ শহরতলীর গড়িয়া, যাদবপুর, রাণীকুঠী এই তিনদিকের রাস্তা এসে মিশেছে বাঘাযতীন মোড়ে। এখানে এলেই যাদবপুর সম্মিলিত বালিকা বিদ্যালয়ের দেখা পাওয়া যাবে, যেখানে দীর্ঘ ৭২ বছর ধরে নারীশিক্ষা চলছে।

    স্বল্প পরিসরে এই স্কুল শুরু হলেও আজ এই স্কুলে ৩০টি শ্রেণিকক্ষ আছে, আছে একটি অ্যানেক্স বিল্ডিং, বলছিলেন যাদবপুর সম্মিলিত বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মৈত্রেয়ী দাশগুপ্ত, ২০১৯ সালে যিনি এই স্কুলে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্বে এসেছেন।

    সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়াদের নিয়ে এই স্কুলের যাত্রা শুরু হলেও আজ সমাজের সব স্তরের মানুষের মধ্যে যাদবপুর সম্মিলিত বালিকা বিদ্যালয়ের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে।

    যাদবপুর সম্মিলিত বালিকা বিদ্যালয়ের প্রথম প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন নিভা রায়। তাঁর হাতেই এই স্কুলের বেড়ে ওঠা। আজ এই অঞ্চলের অনেক ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সের মহিলারা, যারা এক সময় যাদবপুর সম্মিলিত বালিকা বিদ্যালয়ে পড়েছেন তাঁরা নিভা রায়ের নাম করেন। নিভা রায়ের সুখ্যাতি করছিলেন বর্তমান প্রধান শিক্ষিকা মৈত্রেয়ী দাশগুপ্ত। নিভা রায়ের পর স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা হন মৈত্রেয়ী ভট্টাচার্য, তারপর প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্বে আসেন সুদেষ্ণা চক্রবর্তী এবং তার পরের ও বর্তমান প্রধান শিক্ষিকা হলেন মৈত্রেয়ী দাশগুপ্ত। এরই মাঝে দু’জন টিচার-ইন-চার্জ ছিলেন, তাঁরা হলেন কৃষ্ণকলি ভট্টাচার্য ও রীনা দাস।

    মৈত্রেয়ী দাশগুপ্ত বলছিলেন, “এখন এই স্কুলে পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি, সব মিলিয়ে মোট ছাত্রী সংখ্যা ১০৫৭ জন। একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে বিজ্ঞান, বাণিজ্য, কলা তিনটি বিষয়ই পড়ানো হয়। বিজ্ঞান ও বাণিজ্য শাখার তুলনায় উচ্চমাধ্যমিকে কলা বিভাগের ছাত্রীদের পরীক্ষার ফলাফল খুব ভালো হয়। মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলও খুবই ভালো হয়।”

    “মাঝে করোনার জন্য দু’বছর স্কুলের লেখাপড়ার ক্ষেত্রে কিছুটা ছন্দপতন হলেও অনলাইনে পড়াশোনা হয়েছে। স্কুল খোলার পর আগের ছন্দেই পঠনপাঠন চলছে”, বলেন মৈত্রেয়ী দাশগুপ্ত।

    স্কুলের ছাত্রীরা ২০২২-এ ‘ইউথ পার্লামেন্ট’ প্রতিযোগিতায় ভালো স্থান পেয়ে অনেক পুরস্কার জিতে নিয়েছে। আত্মরক্ষার জন্য ছাত্রীদের ক্যারাটে, কম্পিউটার সংক্রান্ত শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে স্কুলের তরফেই। গত বছর উচ্চমাধ্যমিকে ‘চাইল্ড-ইন-স্পেশাল নিড’ স্তরে যাদবপুর সম্মিলিত বালিকা বিদ্যালয়ের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী তিথি চক্রবর্তী রাজ্যের মধ্যে প্রথম হয়েছে। রাজ্যপালের হাত থেকে এই সাফল্যের জন্য পুরস্কারও পেয়েছে। তবে করোনার জন্য মাধ্যমিকের ফলে গত বছর একটু প্রভাব পড়েছিল। তবে, এই বছর আবার তা স্বাভাবিক হয়েছে। ৪০ জন মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২০ থেকে ২৫ জন প্রথম বিভাগে পাশ করেই, বলছিলেন মৈত্রেয়ী দাশগুপ্ত। 

    তবে, বাংলা মাধ্যম ছেড়ে ইংরেজি মাধ্যমে ভর্তির প্রবণতা বাড়ার জন্য সবকটি বাংলা মাধ্যম স্কুলের মতো যাদবপুর সম্মিলিত বালিকা বিদ্যালয়ের উপরও একটা চাপ আসছে বলে জানালেন প্রধান শিক্ষিকা। এই সমস্যাটা করোনার পর স্কুল খুলতে সবচেয়ে বেশি হয়েছিল। তবে রাজ্য সরকারের কন্যাশ্রী, একাদশ-দ্বাদশে সরকার থেকে ট্যাব দেওয়ার ফলে বাংলা মাধ্যমে, বিশেষত যাদবপুর সম্মিলিত বালিকা বিদ্যালয়ে ছাত্রীরা ভালো সংখ্যায় ভর্তি হচ্ছে, বলছিলেন প্রধান শিক্ষিকা। ১০৫৭ জন পড়ুয়ার অনুপাতে শিক্ষিকার সংখ্যাও ঠিকঠাক আছে। বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষা শিক্ষার উপরেও বিশেষ গুরুত্ব দেন শিক্ষিকারা। স্কুলের অভিভাবকদের কথায়, স্কুলের শিক্ষক-পড়ুয়া সম্পর্কটা ভালো, যা একটা স্কুলের পঠনপাঠনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি।

    মেধা থাকলে বাংলা মাধ্যমে পড়েও কৃতি ছাত্রী হওয়া যায়, যাদবপুর সম্মিলিত বালিকা বিদ্যালয়ের ইতিহাস এই কথাই বলে। এই স্কুল থেকে পাশ করে অনেকেই এখন স্কুলে শিক্ষকতা করছেন, পেশাক্ষেত্রে সফল হয়েছেন, আবার কেউ কেউ সাংস্কৃতিক জগতের কেউকেটাও হয়েছেন। এই যাদবপুর সম্মিলিত বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলেন অভিনেত্রী দোলন রায়, লাবনী সরকার।

    ‘উদ্বাস্তু’ শব্দটাকে বাদ দিয়ে স্বাধীন দেশের স্বাধীন স্কুলের তকমা পাওয়া সহজ কথা ছিল না। তাই পরিশেষে একথা বলাই যায়, দেশভাগের বেদনা বুকে নিয়ে যাঁরা একদিন মেয়েদের শিক্ষার স্বার্থে যাদবপুর সম্মিলিত উদ্বাস্তু বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন, তাঁদের সেই স্বপ্ন বাস্তব রূপ পেয়েছে।

    ______________________

    তথ্যসূত্র: মৈত্রেয়ী দাশগুপ্ত, প্রধান শিক্ষিকা, যাদবপুর সম্মিলিত বালিকা বিদ্যালয়, স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রী অনন্যা দাশগুপ্ত, স্কুলের বর্তমান অভিভাবক

    ছবি : সংগৃহীত

    *কলকাতা, শহরতলি বা জেলার কোনও না কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গর্বের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদি গল্প। এবার সেদিকেই ফিরে তাকিয়ে চলছে নতুন ধারাবাহিক ‘আমাদের ইস্কুল’। সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন। চোখ রাখুন প্রতি বুধবার সন্ধে ৬টায়, শুধুমাত্র বঙ্গদর্শনে।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @