ঈশ্বরের কুয়োতলা-- কবি পাবলো শাহির বিষাদ-লেখনী

”আলো হাওয়ার বায়না নিয়ে তুমি আজ ভূমিজলে বেড়াতে যাচ্ছ।”
কবিতার কি একপ্রকার পর্যটন? একাকী? কারোর সঙ্গে? কিভাবে একটা কবিতা অস্তিত্বের একটা অংশ হয়ে যায়, প্রকৃত কবি জানেন। যারা কবিতা ভালোবাসেন তাদের মধ্যেও সেই জানাটা সঞ্চারিত হয়, নিভৃতে। কবি পাবলো শাহি, কাব্যগ্রন্থের নাম ‘ঈশ্বরের কুয়োতলা’। বইয়ের নামকরণেই পাই আলৌকিক ও লৌকিকের এক সূক্ষ্ম যোগ। এর ফলে, সাধারণ দেখাগুলো, দিনযাপনগুলোরও উত্তরণ ঘটে, এবং একইসঙ্গে ঈশ্বরও যেন মানুষের আরও কাছে এসে বসেন চিহ্নরূপে, নানারকম অবয়বে, ভাবনায়, অবচেতনায়।
পাবলো শাহি বাংলাদেশের কবি। সত্তর দশক থেকে এখন অবধি তাঁর অজস্র কবিতার বই দুই বাংলার পাঠকদের হাতে এসেছে। নিজের ভাষাকে বারবার ভেঙেছেন, কবিতার গড়ন নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন পাবলো। এই বইও সেই বহতারই শরিক।
‘ঈশ্বরের কুয়োতলা’ গদ্যকবিতার বই। মোট ৬৭-টি কবিতা আছে এই গ্রন্থে। উত্তরাধুনিক যুগে গদ্যকবিতা চিন্তার বহিঃপ্রকাশের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। এই বইটিও অভিনব কবিতাগুলোর উপস্থাপনায়। বিভিন্ন নামের শিরোনামে সাতখানা বিভাগে কবিতাগুলো ছড়ানো, বহুফসলি চাষাবাদের মতন বাঁধা একই সূত্রে। বিভাগের নামগুলোও আলাদা-আলাদা ভাবনার পরিসর গড়ে তোলে। যেমন, ‘বনবীথিতলে দু’একটা পিঁপড়ে’আর ‘ব্রহ্মাণ্ডব্লেড’। ‘একদিন এই গলাকাটা মহাদেশ আমাদেরই ছিল, একদিন এই নুনচন্দ্রকলা আমাদেরই ছিল...’ (গ্রীবাগ্রহ) এই পংক্তিতে স্পষ্ট হয় কবির ব্যক্তিগত হাহাকার, যা সামগ্রিক স্তরে সমাজের এক বৃহত্তর নিরাশাবাদে এসে ঠেকে যেন। ‘আজ সারারাত জামপাতা মুখে নিয়ে, ষড়রিপু মুখে নিয়ে – তারাচূর্ণের দিকে চেয়ে থাকি’ (জামপাতা) এই লেখার মাধ্যমে কবি কি একাকিত্বের মধ্যে নিহিত তীব্র আকাঙ্ক্ষার কথা বলতে চাইছেন? পাবলো শাহির কাব্যভাষা বলিষ্ঠ, উচ্চারণ দৃঢ়, কিন্তু পেলব অভিব্যক্তিই হল তার মুখ্যতম সিগনেচার। প্রতীকিবাদের তীব্রতা পাওয়া যায় ‘আকন্দগাছ’ কবিতাটায়। ‘দু’তিনটা পোষা খরগোশের মতো একহাঁটু অশ্রুজল’– মানসিক অস্থিরতা আর বিষাদকে একটি মায়াবী ফ্রেমে সাজিয়ে তুলেছেন কবি।
আরও পড়ুন
বন্দুক ছেড়ে কলম ধরার আখ্যান
নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গিতে গদ্যকবিতার অন্যতম প্রধান উপাদান হল চিত্রকল্প। গভীর চিত্রকল্প গদ্যকবিতার প্রবাহকে গতি দেয়। কিন্তু, সেই চিত্রকল্প কবিতার কাঠামোয় মুনশিয়ানার সঙ্গে ব্যবহার করতে হয়, নইলে আরোপিত লাগে। কবিতাও হয়ে ওঠে কৃত্রিম আর দুর্বোধ্য । পাবলো শাহির কবিতায় চিত্রকল্পগুলো এসেছে সহজ, স্বাভাবিকভাবে। কোনও অতিকথন নেই, কোনও জটিল বিন্যাস নেই। চিত্রকল্পের খাতিরে কবিতা নয়, কবিতার খাতিরে চিত্রকল্প, এই হল পাবলো শাহির কাব্যভাষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক
'কাহাদের চন্দ্রকণা কামিনীগাছের জন্য মনখারাপ করে' (মহাজাগতিক বীজগাছ), এই মনখারাপ দেখা যায় না, স্পর্শ করা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়। 'কাহাদের চন্দ্রকণা' শব্দদুটিতে ইচ্ছাকৃত গুরুচণ্ডালী দোষের ভিতরেই বোনা বিষাদময় বিচ্ছুরনের ইঙ্গিত। মার্কিন কবি ওয়ালেস স্টিভেন্সের একটা উক্তি আছে। তিনি বলেছিলেন, যা দৃশ্যমান নয়, একজন কবি সেসবেরই যাজক। কবি পাবলো শাহি নিঃসন্দেহে এই পরিভাষার অন্তর্গত।
হতাশা আর আকুতি মিশ্রিত অভিব্যক্তি বারবার ফিরে এসেছে বিভিন্ন কবিতায় - 'ইস্কুলবালিকার গাছপালা থেকে, নিজেকে আলাদা রাখি - তুমি কি দেখতে পাও না সে নক্ষত্র পুড়ে যাওয়া মন; তুমি কি দেখতে পাও না সে তারাপুঞ্জে পুড়ে যাওয়া মন।' (অপরাহ্ণের রেডিও)। কবির বলিষ্ঠ লেখনির পরিচয় পাওয়া যায় যখন তিনি একটিমাত্র কেন্দ্রে ভর করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নানারকম ভাবনার প্রকাশ করতে সক্ষম হন। বাংলাদেশের পাবলো শাহি তেমনই একজন বলিষ্ঠ কবি। বইটির প্রচ্ছদশিল্পীও পাবলো শাহি নিজেই। কবি নিজেই প্রচ্ছদশিল্পী হলে প্রচ্ছদ থেকেই আসলে শুরু হয় কবিতা। এই বইয়েও তাই-ই ঘটেছে।
এই বই পাঠককে নিয়ে একটি ছায়াঘন নিরালায় টেনে আনে। সেখানে ইতিউতি উড়ছে অক্ষর আর উড়ছে ‘অপরাহ্নে একলা একটা মরচে পড়া রেডিওর গান...’
বইঃ ঈশ্বরের কুয়োতলা
কবিঃ পাবলো শাহি
প্রকাশকঃ ছোটকবিতা