“সারাজীবন লিটল ম্যাগাজিনের কাছেই থাকতে চাই”- সেখ সাদ্দাম হোসেন

সেখ সাদ্দাম হোসেন প্রথম দশকের কবি। পূর্ব বর্ধমান জেলার ছকমোস্তাফা গ্রামে জন্ম। পেশায় একজন শিক্ষক। ২০১৯ সালে তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘আকাশের সাদা ট্রাম’-এর জন্য পেলেন পশ্চিমবঙ্গ কবিতা আকাদেমি কর্তৃক বিনয় মজুমদার পুরস্কার। বঙ্গদর্শনের পক্ষ থেকে কবির সঙ্গে গল্পে মাতলেন সুমন সাধু।
• খুব ভুল না করলে প্রথম দশকের তুমিই প্রথম কবি, যে সরকারি স্বীকৃতি পেল। পুরস্কারপ্রাপ্তিতে কেমন লাগছে বা কেমন অনুভূতি হচ্ছে, জানতে চাইব না। শুধু জিজ্ঞাসা করব, বাংলা কবিতার প্রতি কতটা দায়িত্ব বাড়ল তোমার?
এরকম পুরস্কার পেয়ে স্বভাবতই ভীষণ খুশি আমি। পুরস্কার পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা ভয়ও কাজ করছে। প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার পাবার পর খুব কাছের মানুষ বা বন্ধু দূরে সরে যায়। আমার এই ক্ষুদ্র কবিতা-জীবনে যাদের বন্ধু হিসাবে পেয়েছি, যেমন- সেলিম, সুমন, তন্ময়, দেবোত্তম, আকাশ, সম্পর্কদা, সন্তুদা, শুভম আরও অনেকেই আছে, কতজনের নামই বা বলব- এদের সান্নিধ্য পেয়ে আমি গর্বিত। এদের সবাইকে নিয়েই আমার থাকা। স্বনামধন্য কবি জয় গোস্বামীর ক্ষেত্রেও এটা হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাবার পর বন্ধু-স্বজন বা লিটল ম্যাগাজিন তাঁর থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। তিনি নিজের মুখেই এ-কথা বলেছেন। বন্ধু দাদা ভাইদের জন্য আমি যেকোনো পুরস্কার ছাড়তে রাজি। কিন্তু এদের কোনোভাবেই ছাড়তে পারব না। আর আমি তো কবিতা লিখব বলে আসিনি, লিখি মূলত নিজের স্বভাবে। তবুও যখন দেখছি আমার কবিতা স্বীকৃতি পাচ্ছে, তখন তাগিদটা আরও বাড়বে। আমাদের দশকের অনেক কবিই কবিতার আঙ্গিক নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছে। কিন্তু এর পাশাপাশি কবিতায় কথা বলা যেন মানুষের যাপনের সঙ্গে মিশে যায়। সেটাই আমার চেষ্টা।
আরও পড়ুন
“আমার লড়াইটা কিছু কমেনি, বরং আরও বেড়েছে”
• ‘আকাশের সাদা ট্রাম’ তোমার দ্বিতীয় কবিতার বই। এই বই তৈরি করার শুরুর সময়টা যদি সংক্ষেপে বলো।
২০১৫ সালে আমার প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয়। তখন মনে হয়েছিল তাড়াহুড়ো করে ফেলেছি। তাই পরের বইটা সময় নিয়ে করতে চেয়েছিলাম। ২০১৬ সালে প্রথম তবুও প্রয়াস প্রকাশনীর সেলিম আমাকে বলে দুই ফর্মার বই করার জন্য। কিন্তু আমি চার ফর্মার বই করতে চাইছিলাম। ২০১৭ সালে সেলিম আবার প্রস্তাব দেয়। সেলিম ভীষণ মনেপ্রাণে চেয়েছিল বইটা হোক। সম্পূর্ণ নিজেদের উদ্যোগে যত্ন সহ বইটা করে। ‘আকাশের সাদা ট্রাম’ প্রকাশিত হয়েছিল কবি জহর সেন মজুমদারের হাতে।
• এই বই প্রকাশের পর প্রায় দেড় বছর কেটে গেছে। এবছর কলকাতা বইমেলাতেও দেখছিলাম এখনও মানুষ এই বইটির খোঁজ করছেন। অথচ তুমি প্রায় আড়ালে থাকা একজন কবি। লেখা পড়ে পাঠক তো নিশ্চয় যোগাযোগ করার চেষ্টা করে। ফেসবুক জুড়ে যখন এত এত লিখিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করছে, সেখানে তোমার প্রকাশ্যে আসতে ইচ্ছা করে না?
আমি প্রকাশ্যে আসতে চাই না, প্রকাশ্যে আসুক আমার কবিতা। কী লিখছি সেটা মানুষ জানুক। সাদ্দাম বইমেলায় নেই, কিন্তু সাদ্দামের বইটা আছে। সেটা মানুষ তুলে পড়ুক। ইচ্ছা করে নিজেকে লুকিয়ে রাখি এমনটা নয়। আমি সারাক্ষণ কবিতা খুঁজে বেড়াই। এটা আমার স্বভাবজাত। কবিতা লিখতে আসাটা তৈরি হয়েছিল আমার একা থাকার থেকে। ব্যক্তি সাদ্দামকে নিজেও কতটা পছন্দ করি জানি না।
• লেখালেখির শুরুটা কবে থেকে?
২০০৮ সালে প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় আরামবাগের একটি পত্রিকা ‘মহামিলন’-এ। তারপর থেকে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে লিখে যাচ্ছি।
• আমার খুব করে মনে হয়, আমাদের প্রথম দশকে সবথেকে বেশি জাঁকিয়ে বসেছে মৌলবাদ। এই মৌলবাদ তোমার কবিতায় আসে? এলে কীভাবে?
অবশ্যই আসে। তবে পরোক্ষভাবে। মৌলবাদ তো আমাদের মধ্যে একটা স্পষ্ট বিভাজন তৈরি করে। আমরা যারা কবিতা লিখি প্রত্যেকের মধ্যেই ন্যূনতম বোধ আছে। আমরা চেষ্টা করব মৌলবাদ থেকে দূরে সরে থাকতে। কবিতায় একসঙ্গে থাকাটা খুব জরুরি। মৌলবাদ যেভাবে আমাদের গ্রাস করছে, তা তো আমার ভাবিয়ে তুলছে ক্রমশ। আমরা একা তো কিছু করতে পারব না, সকলে মিলে করতে হবে। মৌলবাদকে একেবারেই প্রশ্রয় দেওয়া চলবে না।
• শেষ প্রশ্ন, সমসাময়িক লিটল ম্যাগাজিনগুলি কীভাবে একজন তরুণ কবির লেখালেখি এবং স্বাধীন সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে চলেছে?
শুধুমাত্র বর্তমানে নয়, সমস্ত দশকেই লিটল ম্যাগাজিনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। যত ভালো লেখক-লেখিকা এসেছেন, প্রত্যেকেই কিন্তু লিটল ম্যাগাজিনের হাত ধরেই এসেছেন। আমাদের প্রথম দশকের তার ব্যতিক্রম কিছু ঘটেনি। সারাজীবন আমি লিটল ম্যাগাজিনের কাছেই থাকতে চাই।