No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    পুরস্কার মূল্যের ৫০ হাজার টাকার পুরোটা ব্যয় করছেন সমাজসেবায়

    পুরস্কার মূল্যের ৫০ হাজার টাকার পুরোটা ব্যয় করছেন সমাজসেবায়

    Story image

    সোনালি সামন্ত। রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের কাছ থেকে ২০১৮ সালের ১২ই মে জাতীয় ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল পুরস্কার নিয়ে আসেন। পুরস্কার মূল্য হিসেবে পান ৫০ হাজার টাকা। আশ্চর্যের বিষয়, সেই টাকা তিনি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার না করে পুরোটাই ব্যয় করেছেন সমাজসেবার কাজে। বর্তমানে সরকারি যে উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে কাজ করেন সোনালি, সেখানে আগে বিদ্যুৎ ছিল না। বিদ্যুৎ  সংযোগের জন্য তিনি নিজেই এখন রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে পাওয়া সেই টাকা খরচ করতে শুরু করেছেন।

    শুধু তাই নয়, বন্ধ চা বাগানে অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশু বা অন্য কোনো অসহায় মানুষ বিপদে পড়লে তিনি পকেট থেকে টাকা খরচ করছেন। উদ্দেশ্য একটাই, মানুষের জন্য কাজ করা। ডুয়ার্সের নাগরাকাটা ব্লকের গ্রাসমোড় চা বাগানের উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে একজন এএনএম বা স্বাস্থ্য সহায়িকা হিসেবে কাজ করছেন। মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োগ করার উদাহরণ এই ৩৬ বছরের জীবনে এর আগেও রয়েছে। জানা গিয়েছে, চা বাগানের ওই এলাকাতেই তিনি গড়ে তুলেছেন ‘বাহুবলি টিম’। সেই বাহুবলি দেখে পাশের চা বাগানের ছোটো শিশুরা অনুপ্রাণিত হয়ে গড়ে তুলেছে ‘বাহুবলি টু’। আসলে গ্রাসমোর চা বাগানটি অনেক দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। সেখানকার শ্রমিকদের অবস্থা ভয়াবহ। বহু শ্রমিক এবং তাদের সন্তানরা অপুষ্টিতে ভুগছে। অভিভাবকদের তেমন কাজ নেই, বাচ্চাদের স্কুলে তেমন পড়াশোনা নেই। খুব কম বয়স থেকেই কেউ কেউ জুয়ার নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে। স্বাস্থ্য সহায়িকা হিসাবে কাজ করতে গিয়ে এই দিকটির প্রতিও নজর যায়  সোনালিদেবীর। তিনি ওই শিশুদের নেশার হাত থেকে বের করে এনে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য গড়ে তোলেন তাঁর স্বপ্নের ‘বাহুবলি’। ১২ জন শিশু রয়েছে এই টিমে। তাদের এদিক ওদিক ঘুরতে নিয়ে যান সোনালি, কখনো খেলাধুলোর ব্যবস্থা করেন, কখনো ভারি খাবার কিনে দেন। বাচ্চারা কথা দিয়েছে, তারা আর নেশা করবে না, পড়াশোনা করবে, মানুষের পাশে দাঁড়াবে। এই সুন্দর টিমের পরিবেশ দেখে পাশের চা বাগানেও শিশু-কিশোররা গড়ে তুলেছে বাহুবলি টু।

    ওই বন্ধ চা বাগানের অপুষ্টিতে আক্রান্ত প্রায় ৩৫ জন শিশুকে চিকিৎসার জন্য ময়নাগুড়ির সাপটিবাড়ি চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠিয়েছেন সোনালিদেবী। সরকারি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের নিয়ম মেনে যতটা সময় কাজ করা দরকার, তার বাইরে গিয়েও তিনি কাজ করছেন। অন্তঃসত্ত্বা মহিলা চা শ্রমিকদের জন্য প্রয়োজন হলে মধ্যরাত্রেও বাড়ি থেকে তাঁকে ছুটে যেতে হয়েছে চা বাগানে। আবার ভুটান সীমান্তেও অসুস্থ মহিলার সেবায় দৌড়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। সোনালির স্বামী অঞ্জন কুমার দে তাঁকে সহযোগিতা করেন। তিনি বানারহাট থানার পুলিশ কনস্টেবল। সোনালিদেবী আমাদের জানান, তাঁর প্রয়াত দাদু গোবিন্দনাথ শাস্‌মলের বাড়ি ছিল পূর্ব মেদিনীপুরে। দাদু ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। পরাধীন ভারতে জেলেও ছিলেন। বাবা সুভাষচন্দ্র সামন্ত মারা যাওয়ার পর তাঁদের পরিবারে তীব্র অর্থ কষ্ট দেখা দেয়। মা বকুল সামন্ত বাবার হোমগার্ডের চাকরি পান। সোনালি তখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। সে সময় দাদুর স্বাধীনতা সংগ্রামীর পেনশনের টাকায় কষ্টে সংসার চলত। আর মা, দাদুর দেশ প্রেমের কথা গল্প করতেন। সেসব শুনেই ছোটোবেলার কিশোরী জীবনে দেশ ও সমাজের সেবা করার ব্রত সোনালিদেবীর মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। সেই ব্রতের ভাবনা আজ তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছে।

    তিনি বলেন, “চাকরি জীবন থেকে অবসর নিলেও সেবামূলক কাজ করে যাবো। চা বাগান বস্তিতে অশিক্ষা আর কুসংস্কারের বিরুদ্ধেও আমি লড়াই করতে চাই।” বন্ধ চা বাগানে মেয়েদের স্বনির্ভরতার জন্য হাতের কাজ শেখার উৎসাহ দিচ্ছেন। কাজ চলছে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধেও। সব মেয়েদের স্বনির্ভরতার পাঠ দিতে তিনি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেছেন। যারা আগামীদিনে স্বাস্থ্য সহায়িকা বা এএনএম হতে চান, প্রত্যেককে পরামর্শ দিচ্ছেন। সোনালি সামন্তকে আমরা স্যালুট জানাই। তিনি একজন দক্ষ স্বপ্নের কারিগর। এই স্বপ্ন যেন বাস্তবায়িত হয়ে সমাজের সার্থক দর্পণ হয়ে থাকতে পারে।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @