১০০তম মায়া আড্ডার পরিপূরক হয়ে উঠলো ‘একক ইন্দ্রনীল’

গতকাল অর্থাৎ ৩ অগাস্ট একটু আগেভাগেই যেন সকলে পৌঁছে গিয়েছিল রবীন্দ্র সদনে। সন্ধে ৬.৩০টা থেকে সেখানে একটি বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছে। হাওয়ায় ঘুরছিল প্রেক্ষাগৃহ ‘হাউসফুল’ হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা। এবং সম্ভাবনা কীভাবে সত্য হয়ে উঠতে পারে তা প্রত্যক্ষ করার সুযোগও ঘটলো। দেখা গেল, রবীন্দ্র সদন প্রেক্ষাগৃহের বাইরে লম্বা লাইন। লম্বা, মানে বেশ লম্বা। কোথাও কোথাও কিছু মানুষ বিচ্ছিন্ন ভাবে এদিক-ওদিক দাঁড়িয়ে বা বসে অপেক্ষা করছেন। তাঁদের অধিকাংশই শহরতলি বা দূরের কোনও জেলা থেকে এসেছেন। মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়া তাঁদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার ক্লান্তি অল্প হলেও লঘু করেছে, বোঝা যাচ্ছিল। ফুরফুরে মেজাজে কেউ লেবু চা, কেউ কফি, কেউ চিপস্, কেউ লজেন্স খাচ্ছে। প্রত্যেকের হাতে একটি করে আমন্ত্রণপত্র। তাতে বিভিন্ন রঙের গোটা গোটা হরফে লেখা ‘মায়া আড্ডা ১০০’ (Maya Adda centenary) আর সমুদ্র-নীল রঙে লেখা ১০০তম মায়া আড্ডায় একক ‘ইন্দ্রনীল’। বহু বছর পর মঞ্চে এককভাবে গান শোনাবেন ইন্দ্রনীল সেন (Singer Indranil Sen) শুধু তাই নয়, সংগীত শিল্পী হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা যে এখনও অটুট রয়েছে, তা মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন অপেক্ষারত আপামর সংগীতপ্রেমীরা।
আড্ডা জিনিসটা সর্বভারতীয়, কিন্তু বাংলা ও বাঙালির সজল কোমল মাটিতেই তার পূর্ণবিকাশ, এ কথা একবাক্যে মেনে নেবেন তাঁরাই, বিগত দিনের বাংলাকে যাঁরা জানেন-বোঝেন। আমাদের ঋতুগুলি যেমন কবিতা জাগায়, তেমনই আড্ডাও জমায়। আমাদের চৈত্রসন্ধ্যা, শ্রাবণের দুপুর, শরতের রাত্রি, শীতের সকাল—সবই আড্ডার নীরব ঘণ্টা বাজিয়ে যায়, কেউ শোনে, কেউ শোনে না। মানুষের জীবনে শুধুই কাজের ঠাসবুনুনি থাকলে সে হত এক যান্ত্রিক সভ্যতা। সেই সঙ্গে আমরা হয়ে উঠতাম বাস্তবিক রামগরুড়ের ছানা। বাংলার শ্যামলিমার মতোই এককালে আড্ডার উচ্ছ্বাস ছিল। আড্ডা নিরর্থক অলস কালহরণের বিলাস নয়, তার মধ্যেই আমাদের নাগরিক-জীবনের প্রমাণ ও পরিচয়।
বিগত নয় বছর ধরে ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানীতে সৃজন ও মননের নতুন নতুন দিগন্ত আবিষ্কার করে চলেছে ‘মায়া আড্ডা’। অতিমারিতে, দুর্ভাবনায়, অনিশ্চয়তায়, অবিশ্বাসের মধ্যেও কোনও এক সময়রেখা আমাদের মনে করিয়ে দেয় একন্নবর্তী জীবনযাপন, আক্ষেপমথিত সুবিখ্যাত গানটাকে। দুরত্বের গড্ডালিকা শ্রোতে ভেসে না গিয়ে মায়া আড্ডার সদস্যরা চেয়েছিলেন একটা আধটা সন্ধে একটু কাছাকাছি থাকি, কথা বলি, শুনি। সরাসরি, সামনাসামনি। শুরুটা হয়েছিল এখান থেকেই। তারপর সাড়া পাওয়া যায় কত গুণীজনের, ঝরে পড়ে আশ্চর্য, অপ্রত্যাশিত নক্ষত্রাংশ, বিচিত্র অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ কথোপকথনে আলোকিত হতে থাকলো কত বুধসন্ধ্যা। মায়া আড্ডার মূল ভাব হল সংস্কৃতি ও শিল্পকে আপামর জনসাধারণের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া। বাঙালিদের মধ্যে আড্ডা দেওয়ার যে সহজাত প্রবণতা ছিল, যা এককালে শিক্ষা-শিল্প-সংস্কৃতি চর্চাকে সমৃদ্ধ করতো, তা পুনরোজ্জীবিত করা এই আড্ডার মূল উদ্দেশ্য। মুখোমুখি আলাপ-আলোচনায় বক্তা ও শ্রোতার মধ্যে যাতে হার্দিক সেতুবন্ধন ঘটে, জ্ঞানের পরিধি বাড়ে, মায়া আড্ডার উদ্যোক্তারা সেবিষয়ে সব সময় সচেতন থেকেছেন। এবং তারই ফলস্বরূপ দশ, কুড়ি, পঞ্চাশ পেরিয়ে গতকাল, নিয়মমতো এক বুধ-সন্ধ্যেতেই মায়া আড্ডা ১০০ ছুঁলো।
আড্ডার যেটুকু প্রাণরস এখনও অবশিষ্ট আছে, ‘রকের’ সিমেন্টের মতো যা শুকিয়ে মরে যায়নি, মায়া আড্ডা সেই অবশিষ্টাংশটুকু হৃদয় দিয়ে আঁকড়ে বাঙালির কাছে ফিরিয়ে দিচ্ছে। দিতে পারছে মানুষের জানার ইচ্ছে এবং স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহনের জন্যই। “মায়া আড্ডার সফলতা এখানেই যে, যাঁরা আড্ডা দিতে আসেন, তাঁরাই বুঝিয়ে দেন এই আড্ডার গুরুত্ব কতখানি। শিল্প-সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার নিরন্তর প্রয়াসের নাম হয়ে উঠুক ‘মায়া আড্ডা’, আমাদের চাওয়া এটুকুই।” বলছিলেন মায়া আড্ডা যাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত, সেই মধুছন্দা সেন। শুরু থেকে এই আড্ডার আসরে যে যে গুণী ব্যক্তি অংশগ্রহণ করেছেন, তাঁদের বেশিরভাগই উপস্থিত ছিলেন এদিন। সংবর্ধনা জানানো হয় মায়া আড্ডার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক গুণীজনকে। ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে একটি পুস্তিকার মোড়ক উন্মোচন হয়। দেখানো হয় ৭ মিনিট দৈর্ঘের একটি বিশেষ ভিডিও।
অনুষ্ঠান শুরুর মাত্র দুয়েক-ঘণ্টা আগে পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রীসভায় যখন নতুন করে দায়িত্ব-বণ্টনের গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা চলছে, তখন গ্রীনরুমে বসে আছেন রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি এবং প্রযুক্তিবিদ্যা-প্রশিক্ষণ দক্ষতা উন্নয়ণ দপ্তরের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন। মঞ্চে উঠে প্রথমে ব্যস্ততার কথা উল্লেখ করলেও ‘গায়ক’ ইন্দ্রনীল মুহূর্তের মধ্যে আবহ পাল্টে দিলেন হাসি-ঠাট্টা-গানে। এত বছর পর, বড়ো মঞ্চে বিপুল সংখ্যক শ্রোতার সামনে কখনও কালজয়ী হারানো দিনের গান, কখনও বাংলা গানের দল ‘নগর ফিলোমেল’-এর স্মৃতি উস্কানো গান, কখনও লোকগান আবার কখনও নিজস্ব মৌলিক অ্যালবামের গান গেয়ে দর্শকদের বুঁদ করে রাখতে পারলেন তিনি। প্রশাসনিক কাজকর্ম থেকে কয়েক ঘণ্টার বিরতি নিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিলেন এভাবেও ঘরে ফেরা যায়। ঘর—তাঁর শিকড়, গান।
ছবিঃ নিজস্ব