আখতারের টেনিস তারকা হয়ে ওঠার নেপথ্যে ছিলেন মহারানি গায়ত্রী দেবী

তখন লন টেনিস এখনকার মতো ‘পপুলার’ ছিল না। কারণ, এই খেলাটির গায়ে বরাবরই ‘অভিজাত’ তকমা লাগানো হয়েছে। এমনকি এখনও এ দেশে বেশিরভাগ সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরে ক্রিকেট আর ফুটবল ছাড়া অন্যান্য খেলায় বিশেষ আগ্রহ চোখে পড়ে না। তবে, টেনিস ধনীদের খেলা, সেই ধারণা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিলেন সদ্য প্রয়াত ‘ডেভিস কাপার’ আখতার আলি। দারিদ্রতার সঙ্গে যুঝতে-যুঝতেই নিজের গুণে ‘টেনিস তারকা’ হয়ে উঠেছিলেন তিনি।
সাধনা তো ছিলই, তাঁর 'লেজেন্ড' হয়ে ওঠার নেপথ্যে ছিলেন জয়পুরের মহারানি গায়ত্রী দেবী। নরম স্বভাবের হলেও আখতারের ভেতরে ছিল একজন যোদ্ধা। এলাহবাদের খুব দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে সেই যুগে লন টেনিস খেলা মোটেও সোজা ছিল না। তিনি যে অসাধ্য সাধন করেছেন, তা নিয়ে কোনও দ্বিধা নেই। ইংরেজ আমলে স্যাটারডে ক্লাবে টেনিস মার্কার ছিলেন আখতারের বাবা। সেই যুগে টেনিস কোচকে ‘মার্কার’ বলা হত। আখতারের বাবা যখন মারা যান, তখন তিনি খুব ছোট, পরিবারের সব দায়িত্ব ওর ওপর এসে পড়ে। দুই ভাইকে বড় করতে হবে। পাশাপাশি ছোট থেকেই দারুণ টেনিস খেলতেন। তাঁর সেই প্রতিভা জয়পুরের মহারানি গায়ত্রী দেবীর চোখে পড়েছিল। আর সেখানেই জীবনের মোড় ঘুরে যায় আখতারের। মহারানি নিজেও খুব ভালো লন টেনিস খেলতেন। আখতার যখন জুনিয়র উইম্বলডন জিতল, তখন তাঁকে আর্থিক সাহায্য করেছিলেন। নিজের টাকায় তাঁকে ইংল্যান্ডে পাঠান। সেটা সম্ভবত ১৯৫৫ সালের কথা। তাই আখতারও মহারানিকে মায়ের মত ভালবাসতেন।
(সহযোদ্ধাদের মধ্যমনি আখতার আলি)
৫ জুলাই, ১৯৩৯ সালে জন্মানো আখতার আলি ১৯৫৫ সালে ন্যাশনাল জুনিয়র চ্যাম্পিয়ন হন এ ছাড়াও জুনিয়র উইম্বলডনের সেমিফাইনালে পৌঁছান। আন্তর্জাতিক লন টেনিস তারকা ডোয়াইট ফিলি ডেভিস নামাঙ্কিত ‘ডেভিস কাপ’ নিয়ে এসেছেন ঘরে। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৪ সালের মধ্যে মোট আটটি ডেভিস টাইতে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইরান, মেক্সিকো, জাপান এবং মোনাকোর বিরুদ্ধে খেলেছেন। প্রেমজিৎ লাল, নরেশ কুমার, রামনথন কৃষ্ণন ও জয়দীপ মুখার্জিদের মতো তারকা খেলোয়াড়দের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে খেলেছিলেন। টেনিস ছাড়াও ১৯৬৮’তে ন্যাশনাল স্কোয়াশ চ্যাম্পিয়ন আখতার আলি ভারতীয় টেনিস সার্কিটে পরিচিত ‘কোচ’ হিসাবেই। ছেলে জিশান আলি ছাড়াও রমেশ কৃষ্ণাণ, বিজয় অমৃতরাজ, লিয়েন্ডার পেজদেরও প্রভাবিত করেছিল তাঁর কোচিং। প্রাক্তন কোচের প্রয়ানে বিজয় অমৃতরাজ লিখেছেন, ‘আখতার আলি ভয়ঙ্কর কোচ ছিলেন আমাদের জুনিয়র দল এবং ভারতীয় ডেভিস দলের। সবসময় চেষ্টা চালিয়ে যেতেন এবং খেলোয়াড়দের স্বস্তিতে রাখার চেষ্টা করতেন। ভারতীয় টেনিসের জন্য অনেকটাই করেছেন। জিশান এবং ওর পরিবারের জন্য সমবেদনা।’
অর্ধশতকেরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় টেনিস খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তিনি। নিজেদের ভাইস প্রেসিডেন্টের প্রয়াণে শোক প্রকাশ করেছে বেঙ্গল টেনিস অ্যাসোসিয়েশনও। ১৯৯০ সালে আখতার আলির থেকেই ভারতীয় ডেভিস দলের দায়িত্ব নিজের হাতে নিয়েছিলেন এনরিকো পিপার্নো। আখতার আলির প্রশিক্ষণে বেড়ে ওঠা পিপার্নো বলেছেন, ‘দশ বছর বয়সে, ১৯৭১ সালে যখন কলকাতায় এলাম আখতার আলি আমার প্রথম এবং একমাত্র কোচ ছিলেন। সাউথ ক্লাবে উনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটিয়ে দিতেন আমাদের স্ট্রোক ঠিক করার জন্য। সবাই ওঁর কোচিংয়ের কথা বলত।’ আখতার আলি প্রয়াণে মূহ্যমান তাঁর একদা সতীর্থ জয়দীপ মুখার্জিও। প্রায় ছয় দশকের পুরানো সতীর্থের চলে যাওয়াকে ‘অপূরণীয় ক্ষতি’ হিসাবেই উল্লেখ করেছেন তিনি।
শনিবার মধ্যরাতে নিজ বাসগৃহেই ৮১ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন প্রাক্তন টেনিস খেলোয়াড় তথা ‘কোচ’ আখতার আলি। শেষ কিছুদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন ভারতের বর্তমান ডেভিস দলের কোচ জিশান আলির বাবা। সম্প্রতি প্রস্টেট ক্যানসার ধরা পড়লেও, পার্কিনসন ও ডেমেনসিয়াও ভুগছিলেন তিনি। খিদিরপুরের ষোলা আনা কবরস্থানে সমাধিস্থ করা হয় ভারতীয় টেনিসের আবেগের একটি অধ্যায়, আখতার আলি-কে।