আজকের তারিখেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু

ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ
১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্র আত্মপ্রকাশ করেছিল – ভারত এবং পাকিস্তান। পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভূখণ্ড ছিল দু’ভাগে বিভক্ত। এক অংশ ভারতের উত্তর-পশ্চিমে, আরেক অংশ ভারতের পূর্বে। দুই ভূখণ্ডের দূরত্ব ছিল দেড় হাজার মাইলের কাছাকাছি। ভৌগোলিক দূরত্ব ছাড়াও ভাষা, সংস্কৃতি এবং অন্যান্য নানা বিষয়ে দুই অংশের পার্থক্য অনেক। নামে স্বাধীন দেশের অংশ হলেও পূর্ব বাংলা বাস্তবে পশ্চিম পাকিস্তানের উপনিবেশে পরিণত হয়েছিল। অর্থনৈতিক শোষণের পাশাপাশি বাঙালির ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির ওপরও আঘাত নামিয়ে আনা হয়। উদুর্কে পাকিস্তানি প্রশাসন একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করে তোলার প্রচেষ্টা শুরু করলে পূর্ব বাংলার বাঙালিরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলন শুরু হয় দিকে দিকে।
মাতৃভাষা বাংলার সম্মান রক্ষা করতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরে প্রাণ দেন রফিক, জব্বার, বরকত-সহ কয়েকজন। পূর্ব বাংলার জাতীয়তাবাদের সলতে পাকানো শুরু হয় তখন থেকেই। ১৯৫৫ সালে পূর্ব বাংলার নাম বদলে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ রাখা হয়। রাষ্ট্রপতি ইস্কান্দর মির্জা সামরিক আইন জারি করলেন ১৯৫৮ সালে। সামরিক শাসক আইয়ুব খান হয়ে ওঠেন গোটা পাকিস্তানের সর্বেসর্বা। আওয়ামি লিগের পক্ষ থেকে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৬৬ সালে ৬ দফা দাবি পেশ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই অভ্যুত্থানের ফলেই আইয়ুব খান সরকারের পতন ঘটে।
১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে জাতীয় এবং প্রাদেশিক পরিষদে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে আওয়ামি লিগ। যদিও সামরিক প্রশাসন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে রাজি ছিল না। এই নিয়ে শুরু হয় টানাপোড়েন। সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে বিক্ষোভ চলতে থাকে। ১৯৭১-এর মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হরতাল এবং অসহযোগের ডাক দেন। সরকার কার্ফু জারি করলেও জনগণ রাজপথেই অবস্থান করতে থাকে। ৭ মার্চ ঢাকার এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী শুরু করল অপরেশন সার্চলাইট। এই গণহত্যা অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল ঢাকা। সারা পূর্ব পাকিস্তান জুড়েই ব্যাপক হত্যালীলা চলতে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপরও নেমে আসে প্রবল নির্মমতা।
২৬ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরকে গ্রেপ্তার করে। তার আগেই রাত্রির প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন বঙ্গবন্ধু। যাতে বলা ছিল, “এটাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের মানুষকে আহ্বান জানাই, আপনারা যেখানেই থাকুন, আপনাদের সর্বস্ব দিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যান। বাংলাদেশের মাটি থেকে সর্বশেষ পাকিস্তানি সৈন্যটিকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের আগে পর্যন্ত আপনাদের যুদ্ধ অব্যাহত থাকুক”। পরবর্তীকালে এই দিনটিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করা হয়।
সেদিনই দুপুরবেলা বেতারে ওই ঘোষণার সম্প্রচার করা হয়। তবে, খুব কম মানুষই এই সম্প্রচার শুনতে পেরেছিলেন। ২৭ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান কালুরঘাট থেকে শেখ মুজিবের পক্ষে বেতারে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন, যা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম প্রচার করে। সারা বিশ্ব জানতে পারে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার কথা।
পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন বাংলাদেশের ছাত্র এবং জনগণ। সঙ্গে যোগ দেন পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি এই স্বাধীনতা যুদ্ধকে সমর্থন করেন এবং অত্যাচারিত মানুষদের আশ্রয় দিতে সীমান্ত খুলে দেন। এপ্রিলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার গঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের তীব্রতায় কোণঠাসা হয়ে পাকিস্তান ঘটনার গতি অন্যদিকে ঘোরাতে ৩ ডিসেম্বর ভারতের ওপর বিমান হামলা চালায়। ভারত জড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে । ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী যুক্ত হয়ে তৈরি হল যৌথ বাহিনী। তারা দ্রুত পূর্ববঙ্গের দখল নিতে থাকে। এই সম্মিলিত বাহিনীর আক্রমণে পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে পাকিস্তান। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন জেনারেল নিয়াজি। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ ঘটে।