No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    বর্ষায় বড়ো মোহময়ী আর বসন্তে তার রাজবেশ

    বর্ষায় বড়ো মোহময়ী আর বসন্তে তার রাজবেশ

    Story image

    জীবনপুরের পথিক রে ভাই, কোনও দেশে সাকিন নাই...”

    পলাতক সিনেমার সেই আশ্চর্য গান। দু’পাশে ক্ষেত, মাঝে সাদা-কালো ফ্রেমেই রঙিন হয়ে ওঠা একফালি কাঁচা রাস্তা। একটা খড়-বোঝাই গরুর গাড়িতে চেপে বসছেন অনুপ কুমার। আংটি চাটুজ্জের ভাই। এই দৃশ্য, দৃশ্যের গায়ে লেগে থাকা গান দর্শককে কতবার যে উড়িয়ে নিয়ে গেছে জীবনপুরে। অথচ, জীবনপুরের ঠিকানা জানা নেই কারও। বিশ্বযুদ্ধ-বিধ্বস্ত ইউরোপ যেমন কল্পনার স্বর্গরাজ্যের খোঁজ করেছিল শাংগ্রিলায়, অনেকটা তেমনই যেন বাঙালির এই জীবনপুর। সেখানে সবুজ মাটির ল্যান্ডস্কেপ নাকি নতজানু নদী ও পাহাড়? খানিক ভেবেই হয়তো আপনি হেসে উড়িয়ে দেবেন সব। ধুস, কল্পনা!

    এবার আপনি চলে আসুন বরন্তি গ্রামে। পুরুলিয়ার রঘুনাথপুর সাবডিভিশনে সাঁতুড়ির কাছে একটা ছোট্ট গ্রাম। এই অঞ্চলে সমতলভূমিতেই হঠাৎ-হঠাৎ নিজের খেয়ালে কুঁচকে উঠেছে মাটি। সেইসবই পেয়েছে টিলার গড়ন। আর, সেই টিলার গায়ে, টিলার নিচে ঘন হয়ে আছে প্রকৃতির কোঁকড়া চুল। শাল-সেগুন-পলাশের বন। মাঝে লালমাটির রাস্তা সোজা চলে গেছে বরন্তি গ্রাম ছাড়িয়ে মুরাডি পাহাড়ের দিকে। ডান দিকে মুরাডি লেক। লেকের উঁচু পাড় বরাবর রাস্তা। রাস্তার এইপারে দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ ক্ষেত। ক্ষেতের পিছনে দূরে আকাশের গায়ে টাঙানো বিহারীনাথ পাহাড়। লেকের ওইপারে পাঞ্চেত পাহাড়, সামনে ত্রিভুজাকৃতি বরন্তি টিলা। সেইসব পাহাড়ের গা বেয়ে, লেক ভাসিয়ে হঠাৎ উড়ে আসে আজানের সুর, এপাশে ক্ষেতের ওপর তখন মেঘের জলরঙ। এসবই ঝোলায় পুরে পলাতকের সেই গান গাইতে গাইতে ব্রন্তি গ্রাম ছাড়িয়ে খানিক এগোলেই দেখবেন সামান্য নিচু হয়ে এসেছে ভূমিখণ্ড। একপাশে জল, জলের ওপরেই মাথা তুলেছে সবুজ ঘাস। শালুক। সেই শালুক পাতায় এসে বসেছে ফড়িং। জলে পিছলে পিছলে বেড়াচ্ছে জল-মাকড়সা। দূরে সেই আবছা পাহাড়, একধারে ঢেউ খেলানো জমি। আপনার পিছনে আদ্যিকালের অরণ্য। সবটা মিলিয়ে ঘোর আরও খানিক ঘন হলেই আপনি দেখবেন পাশেই গ্রাম পঞ্চায়েতের একটা ফলক। গ্রামের নাম দেখে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করবে না আপনার। এরই খোঁজে কি এতদূর আপনাকে নিয়ে এল অবচেতন? নাকি এসবই সত্যি। গ্রামের নামটারই মতো। জীবনপুর!

    বরন্তি এখন আর মোটেই খুব অপরিচিত জায়গা নয় পর্যটকদের কাছে। এই লেখা পড়তে পড়তেও হয়তো অনেকে মিলিয়ে নিচ্ছেন সেই স্মৃতি, অভিজ্ঞতা। কিন্তু, সব জায়গারই এক-একটা ম্যাজিক থাকে। সেই ম্যাজিকের হদিশ পেতেই হয়তো সেখানে ছুটে যেতে হয় বারবার। বরন্তিও তেমন। আজ থেকে এগারো বছর আগে প্রথম বরন্তি গেছিলাম মেঘের টানে। শুনেছিলাম, বরন্তির বৃষ্টিতে অদ্ভুত নেশা। তখনও রিসর্ট বলতে হাতেগোনা দুটো কি তিনটে। পর্যটকদের ভিড় নেই। আসানসোল থেকে ভোরের প্রথম আদ্রাগামী প্যাসেঞ্জারে চেপে বসার খানিক পরেই বাঁহাতে দেখা গেল পাহাড়। মুরাডি স্টেশনে নেমে খানিক অপেক্ষা হাট চালু হওয়ার। তারপর হাট থেকেই সস্তায় আনাচ-সব্জি-দেশি-মুরগি-আমড়া কিনে একটা টেম্পোতে চেপে রওনা দেওয়া বরন্তির দিকে। মুরাডি ড্যামকে বেড় দিয়ে প্রায় চক্রাকার রাস্তা ঘুরে অবশেষে পৌঁছনো।

    বরন্তিকে বর্ষায় অলীক লেগেছিল। ভিজে মাটির রাস্তা, লেকের ওপর নেমে আসা মেঘ, হলুদ প্রজাপতির ঝাঁক, বনের গন্ধ, লেকের পাশে ত্রিকোণাকার সেই পাহাড়। এই রূপকথার মতো আবহেই সাজানো একটা ছোট্ট আদিবাসী গ্রাম। মাটির বাড়ির বাইরে আদিবাসীদের হাতে আঁকা মোটিফ, আলপনা, বাঘের ছবি। দরজা দিয়ে সামান্য উঁকিতেই চোখে পড়বে ভিতরে চাল-ভাঙার ঢেঁকি। ছোট্ট শিশুদের পিছনে দলবেঁধে টইটই ঘুরছে কতগুলো হাঁস। গ্রামের ভিতরেই মহুয়া গাছ। গাছের গায়ে একটা কাঠের মই হেলান দিয়ে রাখা। এক্কাদোক্কা খেলছে কয়েকটা মেয়ে। লাল ফিতে, ময়লা ফ্রক। পর্যটক দেখলে ওরা তখনও অপ্রস্তুত্ত হয়ে পড়ত ভারি। একটা অন্য পৃথিবীতে অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে ফেলেছি ভেবে দ্রুত পা চালাতে চালাতেই চোখে পড়ে যায় ঘরের বাইরের দেওয়ালেই টাঙানো ধামসা, মাদল...

    বর্ষার বরন্তিতে টিলার মাথায় ওঠা হয়নি প্রথমবার। দু’পাশে গা-ছমছমে বনের পথ, হঠাৎ হঠাৎ ঝেঁপে আসা বৃষ্টি, মেঘে ঢেকে যাওয়া পাঞ্চেত-বিহারীনাথ দেখতে দেখতেই দুটো দিন কেটে গিয়েছিল। টিলার ওপর ওঠা পরেরবার। তখনও বর্ষা। আমাদের গাইড হয়েছিল একটা স্থানীয় কুকুর। সারাটাদিন গায়ে-গায়ে লেগেছিল সে। টিঙটিঙে রোগা, খেতে দিলেও ভয়ে খায় না। কিন্তু আদর করে ডাকলেই হল। লেজ নেড়ে ছুটে এসে কত কী যে তার বলার... নামার সময় ঝুপ করে অন্ধকার, জোঁকের ভয়, বৃষ্টি চলে আসার আশঙ্কাকে পাশ কাটিয়ে সে-ই আমাদের নিয়ে আসে নিচে। পরের দিন ভোরে মুরাডি লেকের পাশের রাস্তায় যখন একপাশে জল ও অন্যপাশে ক্ষেতের বৈপরীত্য নতুন করে ফের বিস্মিত করছে, তখনও সামনে খেলে বেড়াচ্ছে আমাদের সেই ‘গাইড’।

    জীবনপুরের খোঁজ মিলেছিল সেইবারই। বরন্তির পরের গ্রাম। হেঁটে মিনিট পনেরো-কুড়ি। মাঝের রাস্তায় বিছিয়ে শাল-পিয়ালের বন, টিলা। হোটেল থুড়ি রিসর্টে ফিরে খেয়েদেয়ে ফের লেকের পাশে গিয়ে বসা জলে পা ডুবিয়ে। মেঘেরা তখন সান্ধ্যভ্রমণে বেরিয়েছে।

    এই বরন্তিকেই একদম অন্যরকম লেগেছিল শেষবার। মার্চ, ভরা বসন্ত। বরন্তি যাওয়ার রাস্তা জুড়ে শুধুই পলাশ। এ যেন রাজবেশ। বনের আগুন। বর্ষার রহস্যময়ী বরন্তির সঙ্গে একে মেলানো প্রায় অসম্ভব। মুরাডি লেকের পাড়েও পলাশের ঝাঁক। গোটা বরন্তি যেন রঙের উদযাপনে মেতেছে। আর পাখি। মাঝে ফের একপশলা বৃষ্টি নিয়ে হঠাৎ কালবৈশাখী। ধুলো উড়ছে, গরুর পাল নিয়ে দৌড়ে ঘরে ফিরছে আদিবাসী রাখাল। ক্ষেতের কাজ সেরে তড়িঘড়ি লেকের বাঁধ-রাস্তা ধরে ফিরছেন বাকিরা। আমি তখন সাইকেলে চেপে বাঁধরাস্তার মাঝামাঝি। ফেরার কথা মনেই পড়ছে না। একজন পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাড়া দিল, “বাবু ফিরুন। ভিজবেন নাহলে।” রিসর্টের কুক অভিরামদার সাইকেল ধার নিয়ে বেরিয়েছিলাম আশেপাশের গ্রামে ঘুরব বলে। সাইকেল চালাতে চালাতে পাশের আদিবাসী গ্রাম তালবেড়িয়া। রাস্তার ধারের স্বচ্ছ দিঘিতে শালুক, মহুয়া গাছ, কিচিরমিচির কচি-কাচা আর টিলা। সেখান থেকে ফেরার পথেই হঠাৎ ঝড়। ঘরে ঢোকার আগেই ভিজে জবজবে। আর, তারপর মেঘ কেটে এক অলৌকিক সূর্যাস্ত আর লেকের ঐপার থেকে ভেসে আসা আজানের সুর। পলাশ গাছের তলায় তখন কমলা বিছানা পেতেছে ঝরে যাওয়া ফুলেরা।  

    সেই রাতেই চাঁদ উঠল। একথালা। আদিবাসীদের পরব। স্থানীয় একজন বললেন আজ আমাদের সরস্বতী পুজো। সন্ধেবেলা মাথায় ঘটি নিয়ে সেজেগুজে ব্রত শেষ করতে চলেছেন আদিবাসী রমণীরা। তাদের গা বেয়ে পিছলে পড়ছে জ্যোৎস্না। পিছু নেওয়া মানা। আপনি বরং চন্দ্রাহত হয়ে এগিয়ে যেতে পারেন জল বা বনের দিকে। নেশা করা এক সাঁওতাল-বুড়োকে দেখে হঠাৎ চমকে উঠতে পারেন। তিনি প্রলাপের মাঝে আপনার কাছে বিড়ি ধরানোর আগুন চাইলে হয়তো কমতে পারে ভয়। দূরে ধামসা-মাদলের শব্দ। পরব শুরু হল। বহিরাগতদের প্রবেশ নিষিদ্ধ সেখানে। সেই দুঃখের কথা রিসর্টে ফিরে বলতেই আপনাকে ম্যানেজারবাবু বলবেন, চাইলে কালই এই উঠোনেই হতে পারে সাঁওতাল নাচ। সামান্য টাকা খসালেই, ব্যাস...


    অভাব বড়ো দায়। পর্যটকবাবুরা এলে দু’পয়সা রোজগার হয়। তার জন্য দাঁওয়ে তুলতে হয় নিজেদের সংস্কৃতিও। কোমর-বেড় দিয়ে শাড়ি পরে, হাতে-হাত ঢুকিয়ে, তালে তালে নাচে মহিলারা আর পুরুষগুলো সেদিন খুব মদ খায়। ‘বাবুরাও খায়। মজা পায়।” বলতে বলতে হেসে ওহে শ্যাম মাখোয়া। সেই হাসিতে এত বিদ্রূপ যে লজ্জায় চোখ না সরিয়ে উপায় থাকে না।

    আমরা, শহুরে বাবুরা, যেখানেই যাই সব কেমন তছনছ করে গিলে আসি। নষ্ট করে পাওয়াতেই আমাদের সুখ। আদিম বন-পাহাড়ের পাশে তাই ক্যাম্প-ফায়ারের নামে উত্তাল মজা চলে। বরন্তিও সেই নামতারই অংশ। তবু, এত নষ্টের আয়োজনের মধ্যেও এখানে এখনও ম্যাজিক বেঁচে। হলুদ প্রজাপতির ঝাঁক এখনও আপনাকে জলের সন্ধান চেনাবে, পলাশ, বৃষ্টি, মেঘ, হ্রদ—বরন্তিকে জীবনপুর ভেবে নিতে একচুলও অসুবিধে হবে না তখন আপনার।

    শুধু, পায়ে হেঁটে ঘোরাটা জরুরি। কিংবা সাইকেলে। নাহলে, আপনার কাছে নিজেকে ধরাই দেবে না এই বনপাহাড়ের গপ্পোরা।

    কীভাবে যাবেন?
    ট্রেনে আসানসোল। সেখান থেকে আদ্রাগামী প্যাসেঞ্জারে মুরাডি নেমে গাড়িতে বরন্তি। গাড়ি পাঠাবে রিসর্টই। তবে, টেম্পোও মিলবে মুরাডি থেকে। আসানসোল থেকেও গাড়িতে যাওয়া যায়।

    কোথায় থাকবেন?
    বরন্তিকে একাধিক রিসর্ট। শুধু আগে থেকে বুক করে যেতে হবে। থাকা-খাওয়া প্যাকেজেই।

    কখন যাবেন?
    বরন্তি যাওয়া যায় গ্রীষ্ম বাদে সারা বছরই। তবে, বর্ষা ও বসন্তে বরন্তি অপুর্ব সুন্দর।

    আর কোথায় কোথায় ঘুরবেন?
    নেহাতই ঘুরতে চাইলে গাড়ি চলে যান গড় পঞ্চকোট, জয়চণ্ডী পাহাড় কিংবা উল্টোদিকে বিহারীনাথ।   

     

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @