No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    জাহাজডুবির স্মৃতিতে পাথরের ফলক বসল কলকাতায়

    জাহাজডুবির স্মৃতিতে পাথরের ফলক বসল কলকাতায়

    Story image

    বাঙালির অবসরযাপনের সবচেয়ে প্রিয় ঠিকানা পুরী। শুধু হালেই নয়, আজ থেকে দেড়শো-দুশো বছর আগেও জগন্নাথধামই ছিল মধ্যবিত্ত ও পুণ্যলোভাতুরদের সহজ লক্ষ্য। তখন সমুদ্রপথে যেতে হত বালেশ্বর। আর সেখান থেকে ফের জলপথে কটক হয়ে পালকি-ডুলিতে পুরী যাওয়াই ছিল দস্তুর। কারণ অতটা রাস্তা রেলগাড়িতে যাওয়ার রেওয়াজ তৈরি হয়নি তখনও। আর তাই, পুণ্যলোভাতুর যাত্রীদের সমুদ্রপথে বালেশ্বর নিয়ে যাওয়ার জন্য যাত্রী পরিবহনের ব্যবসা ফেঁদে বসল গণ্ডা কয়েক বিদেশি কোম্পানি।

    তেমনই একটি জাহাজ কোম্পানি হল ‘ম্যাকলিন অ্যান্ড কোম্পানি’। ইংলিশম্যান কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে তারা বুক ফুলিয়ে প্রচার করত তাদের বাহাদুরির কথা। তাদেরই এক যাত্রাকালে, বিধির বিধানের একটি ফলক সবার অলক্ষ্যে পড়ে আছে গঙ্গার ঘাটে। হাওড়া ব্রিজের তলায় ফুলবাজারের ব্যস্ত পথে প্রায় অজানা একটি ঘাট হল ছটুলাল-দুর্গাপ্রসাদ ঘাট। তারই এক সিঁড়ির কোণে আবছা ফলকে পূর্ণ যাত্রীর বিধির বিধান। এক জাহাজডুবির মর্মান্তিক কাহিনি।

    ২৫ শে মে, ১৮৮৭। প্রবল ঝঞ্ঝায় ৭৫০ জন যাত্রী নিয়ে বঙ্গোপসাগরে ডুবে গেল ম্যাকলিন কোম্পানির গর্ব ‘সার জন লরেন্স’। যাত্রীদের অধিকাংশই মহিলা। এদিকে, প্রায় প্রত্যেকদিন দুর্যোগের হুঁশিয়ারি। জাহাজিরা সে-কথায় কর্ণপাত করল না। জাহাজ কয়লাঘাট থেকে রওয়ানা দিল রাতের বেলা। তারপর?

    প্রত্যাশিত দিনে জাহাজ আর ফেরে না। শুরু হয় লোক জমায়েত। জাহাজ কোম্পানি ক্যাপ্টেন আরভিং-এর সাহসিকতার প্রচার করে জানায়, এমন ক্যাপ্টেন যে জাহাজের, সে-জাহাজ তো ফিরবেই! কিন্তু ২৭ মে একটি টেলিগ্রাম এল। চাঁদবালির স্টিমার অফিস থেকে লেখা হল ‘সার জন লরেন্স’ এখনও সেখানে নোঙর করেনি। ম্যাকালিন কোম্পানি তাতেও কান না দিয়ে জন লরেন্স জাহাজের পরবর্তী যাত্রার বিজ্ঞাপন দিয়ে দিল।

    এভাবে কেটে গেল আরও কটা দিন। কিন্তু ২রা জুন ১৮৮৭ ইংলিশম্যান পত্রিকা যে খবরটি লিখল, তাতে বোঝা গেল - সব শেষ। রেসলিউট নামের একটি জাহাজ কলকাতায় ফেরার পথে সাগর মোহানায় দেখতে পেয়েছে ভাসমান মৃতদেহের সারি। যাদের বেশিরভাগই স্ত্রীলোক। তোলপাড় পড়ে গেল কলকাতায়। রবীন্দ্রনাথ কবিতা লিখলেন ‘সিন্ধুতরঙ্গ’। খামখেয়ালিপনার এমন পরিণতি ইংরেজ রমণীদেরও বিচলিত করল। 

    ওদিকে জাহাজ কোম্পানির তরফ থেকে শোকপ্রকাশ তো পরের কথা, চলল আবার বিজ্ঞাপন। আর তখনই, একদল ইংরেজ রমণী হতভাগ্য জাহাজ যাত্রীদের স্মরণে গঙ্গার ঘাটে লাগিয়ে এলেন এই ফলক। তাতে লেখা –“ইং ১৮৮৭ সালের ২৫-এ মে তারিখের ঝটিকাবর্ত্তে সার জন লারেন্স বাষ্পীয় জাহাজের সহিত যে সকল তীর্থ যাত্রী, অধিকাংশ স্ত্রীলোক, জলমগ্ন হইয়াছেন তাহাদিগের স্মরণার্থে কয়েকটি ইংরাজ রমণী কর্তৃক এই প্রস্তর ফলকখানি উৎসর্গীকৃত হইল।” পাশে কথাগুলির ইংরেজি তর্জমা।

    This stone is dedicated by a few English-women to the memory of those pilgrims, mostly women, who perished with ‘Sir John Lawrence’ in the cyclone of 25th May 1887.

    আজ পাথর আবছা, রঙের ছোপ কেড়ে নিতে চেলেছে অক্ষরগুলিও। ব্যস্ত পথচারী বা স্নান যাত্রীর সেদিকে ফিরে তাকানোর অবকাশ নেই। কিন্তু কলকাতা আজও বুকে ধরে রেখেছে এই কান্নাভেজা পাথরটিকে। যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে জাহাজডুবির মর্মান্তিক এক কাহিনি।

    Tags:

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @