No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    শপিংমলের যুগে প্রতি বুধবার ভদ্রেশ্বরের গঙ্গাপাড়ে বসছে সাংস্কৃতিক হাট 

    শপিংমলের যুগে প্রতি বুধবার ভদ্রেশ্বরের গঙ্গাপাড়ে বসছে সাংস্কৃতিক হাট 

    Story image

    কদা বাঙালির শৈশব কেটেছে রবি ঠাকুর বা যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের ‘হাট’ কবিতা পড়ে। তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি আজ সেই ‘বক্সীগঞ্জের পদ্মাপাড়ে’র শিকড় থেকে অনেক দূরে। বাঙালির সংস্কৃতিতে এখন ঢুকে গেছে স্মার্ট সিটি, শপিংমল, মেগা সিরিয়াল আর সোশ্যাল মিডিয়ায় রিল বানানোর দুরন্ত হাতছানি। প্রশ্ন ওঠে, নিজের সংস্কৃতি বাঙালি কতটা মনে রেখেছে? পঁচিশে বৈশাখ আর দুর্গাপুজো ছাড়া আর কী কী টিকে আছে বাঙালির?

    ঠিক এইরকমই একটা বিষণ্ণ সাংস্কৃতিক সময়ে হুগলি জেলা-র ভদ্রেশ্বরবাসীরা দেখলেন, গত ১৭ এপ্রিল থেকে গঙ্গার পাড়ে ভদ্রেশ্বরের শ্রীমানিঘাটে সাপ্তাহিক হাট বসছে বুধবারে। সংস্কৃতির এই প্রত্যাবর্তন রীতিমতো চমক জাগায় বৈকি!

    ‘ভ্রমণ আড্ডা’ সংগঠন এবং ভদ্রেশ্বর পৌরসভা-র যৌথ উদ্যোগে শান্তিনিকেতনের সোনাঝুরির হাটের ধাঁচেই অনেকটা এই তটিনী হাটের সাংস্কৃতিক সফর শুরু হয়েছে।

    ৫২৫ বছরের প্রাচীন লোকালয় এই ভদ্রেশ্বর এলাকা। মনসামঙ্গলে চাঁদ সদাগরের বাণিজ্যযাত্রায় ভদ্রেশ্বরের কথা উল্লিখিত ছিল। সে সময় সরস্বতী নদীর তীরে সপ্তগ্রাম বন্দরের অবনতির পরপরই ভদ্রেশ্বরগঞ্জ ব্যবসায় নাম ছড়ায়। বলা হতো, কলকাতা থেকে কালনা পর্যন্ত ভদ্রেশ্বরের মতো এত বড়ো গঞ্জ নাকি কোথাও ছিল না। ১৭ শতাব্দীতে হুগলি নদীর তীরে তখন জমজমাট জনপদগুলিতে পর্তুগিজ, ফরাসি, জার্মান, ইংরেজ, ডেনমার্কীয়, ওলন্দাজ বণিকরা ঘাঁটি গেড়েছে, একে একে বাংলার বাণিজ্যে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে চন্দননগর, চুঁচুড়া, শ্রীরামপুর, কোন্নগর প্রভৃতি জনপদ। ভদ্রেশ্বরগঞ্জের তখন বিরাট নাম ডাক। সে যুগের ভদ্রেশ্বরের লক্ষ্মীগঞ্জ, মহাজনপট্টি, শোনপট্টি, শ্রীমানি ঘাট, নুনগোলাতে বিপুল কারবার। চাল, গুড়, ঘি, লবণ, সোরা, রেশম, পাট নিয়ে বিপুল ব্যবসা। নদীর ধারেই ছিল জিনিস মজুত রাখার গুদামঘর। বন্দরের মতোই এখানেও বড়ো বড়ো নৌকো দাঁড়িয়ে মাল তুলতো আর নামাতো।

    স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বিদেশি বণিকদের সঙ্গে ব্যবসা করতেন এই ভদ্রেশ্বরগঞ্জে। তারপর জলপথের থেকে স্থলপথের বাণিজ্যে মানুষ আগ্রহী হয়ে উঠলো। কলকাতা নগরীর পত্তন সমস্ত ব্যবসা বাণিজ্যকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করল। কাছাকাছি শেওড়াফুলির মতো নতুন গঞ্জের আবির্ভাব ঘটল। ফলে কালের নিয়মে মানুষ ভুলে যেতে লাগলো ভদ্রেশ্বরগঞ্জের বিপুল মহিমার কথা।

    সেই ফেলে আসা ইতিহাস যাতে আর মানুষ না ভুলে যান, সেজন্যই একদল ইতিহাসপ্রেমী মানুষ আয়োজন করেছেন বুধবারের নদীর ধারের হাট। যার আনুষ্ঠানিক নাম – তটিনী হাট। আপাদমস্তক শহুরে হয়ে ওঠা ভদ্রেশ্বর নামক মফস্‌সলটির এককালের গঞ্জ কি আবার স্বমহিমায় ফিরে আসবে? ভদ্রেশ্বর গবেষক তথা ইতিহাসপ্রেমী প্রাক্তন শিক্ষক শক্তিপদ ভট্টাচার্য বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “পুরোনো দিনের গঞ্জ হয়তো ফিরে আসবে না। কিন্তু আমরা চেষ্টা করছি সেই সময়কার গঞ্জের রূপ যাতে মানুষকে দেখাতে পারি। আমাদের হারিয়ে যাওয়া লোকশিল্প, খাবার-দাবার নিয়ে পুরোনো ফ্রেম তৈরি করার চেষ্টা করছি। যখন মানুষ শপিংমলে যেতে চাইছে, তখন আমরা গ্রামীণ হাটের দিকে ফিরতে চাইছি। বাঙালি যে একসময় ব্যবসায় দক্ষ ছিল, তার নজির এই গঞ্জ বা গোডাউনগুলো। সেই ইতিহাসই ঘুরে দেখানোর ব্যবস্থা করেছি। মানুষ এই হাটে এসে রোমন্থন করছেন ফেলে আসা গঞ্জ আর তার ইতিহাসের। এটাই প্রাপ্তি।”

    ৫২৫ বছরের প্রাচীন লোকালয় এই ভদ্রেশ্বর এলাকা। মনসামঙ্গলে চাঁদ সদাগরের বাণিজ্যযাত্রায় ভদ্রেশ্বরের কথা উল্লিখিত ছিল। সে সময় সরস্বতী নদীর তীরে সপ্তগ্রাম বন্দরের অবনতির পরপরই ভদ্রেশ্বরগঞ্জ ব্যবসায় নাম ছড়ায়।

    ‘ভ্রমণ আড্ডা’ সংগঠন এবং ভদ্রেশ্বর পৌরসভা-র যৌথ উদ্যোগে শান্তিনিকেতনের সোনাঝুরির হাটের ধাঁচেই অনেকটা এই তটিনী হাটের সাংস্কৃতিক সফর শুরু হয়েছে। গালার পুতুল, ডোকরা, তালপাতার পাখা, অগ্রদ্বীপের পেঁচা, মশলা, শাড়ি, চারাগাছ, রঙিন মাছ, পরিবেশ বান্ধব ব্যাগ, ধূপ, মোমবাতি, হস্ত নির্মিত গয়না, শিল্পীদের নির্মিত হস্তশিল্প, ছবি থেকে বুটিকের কাজ সবই হাটের বিক্রয়যোগ্য জিনিস।

    প্লাস্টিক বিরোধী, শব্দদূষণহীন পরিবেশবান্ধব এই হাটে ফাস্ট ফুডের কালচার গড়ে ওঠেনি। বরং আমাদের মা ঠাকুমাদের হাতে তৈরি নানা খাবার দাবার, (যেমন, মুড়ির মোয়া, নারকেলের তক্তি, জিলিপি, আচার, ঘুগনি, আলুর দম, আমপোড়ার শরবত, বড়ি) সবই মিলছে বুধবার বিকেল চারটে থেকে সাতটার ভেতর। বৈচিত্র্যের মাঝে কোনো জিএসটি বা ট্যাক্সের চোখরাঙানি নেই। এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়নও ঘটছে বেশ।

    এই হাট উপলক্ষে মহিলারা স্বনির্ভরতার একটা লক্ষ্য খুঁজে পেয়েছেন। ‘ভ্রমণ আড্ডা’ সংগঠনের অন্যতম কর্মকর্তা শক্তিপদবাবু বলেন, “৩০-৪০ জন মহিলা বিক্রেতা দিয়ে শুরু করা হাটে এখন ১২৫ জন মহিলা বিক্রেতা। আরও ৫০ জন অপেক্ষায়। মহিলারা খুবই উৎসাহ পেয়েছেন। মাস গেলে নিজের হাতে কিছু পয়সা আসছে। ভদ্রেশ্বরের মতো মফস্‌সলে এভাবে মহিলারা আগ্রহী হয়েছেন, এটা খুবই আনন্দের। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারাও এতে আগ্রহ নিয়ে আসছেন।”

    তাঁর কথায়, “পুরোনো মানেই ফেলে দেওয়া নয়, পুরোনোর মধ্যেও অনেক কিছু গ্রহণ করার আছে। যেগুলো আমাদের স্বস্তি, শান্তি দিতে পারে, স্থিতধী করে।” তাই বাড়ির বাড়তি বই, পুরোনো পোশাক এনে রাখা হচ্ছে হাটে। যার যা দরকার, নিয়ে যাচ্ছেন বিনামূল্যে। শহর, মফস্‌সলগুলো যখন একরকম সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ে ডুবে যাচ্ছে, সে সময় ভদ্রেশ্বর পেয়েছে সংস্কৃতির হাট। বিস্মৃতির অতল থেকেও ভদ্রেশ্বরগঞ্জের নাম মানুষের মুখে মুখে ফিরুক, সেটাই কামনা হাট ও হাটপ্রেমী নাগরিকদের।

    “খোলা আছে হাট মুক্ত বাতাসে/ বাধা নাই ওগো- যে যায় যে আসে,/ কেহ কাঁদে, কেহ গাঁটে কড়ি বাঁধে ঘরে ফিরিবার বেলা/ উদার আকাশে মুক্ত বাতাসে চিরকাল একই খেলা।” – যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের হাট কবিতার মতোই ভদ্রেশ্বর অঞ্চলের মানুষজন ফের একবার ঘাঁটি গেড়ে বসেছে আনন্দের হাটে। স্টার্টআপের যুগে শুরু হয়েছে বাঙালির একান্ত আপন হাট। এবার গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরার পরিকল্পনার মতো হাট দিয়ে ঘিরে ফেলা হোক মফস্‌সল আর শহরকে। শক্তিপদবাবু বলেন, “শুধু আধুনিকতার পিছনে ছুটলেই মানুষ সব পেয়ে যাবে, এটা সঠিক নয়। পুরোনো দিন এবং সেই পুরোনো দিনের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার মধ্যে দিয়ে আমরা আধুনিক সমাজকে বলতে চাইছি যে আমাদের সবকিছু এখনও হারিয়ে যায়নি। বাঙালির সংস্কৃতি, শিল্প, বাঙালির খাবার-দাবার সবটাই ঐতিহ্যপূর্ণ এবং তার নিজস্বতা আছে।”  

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @