No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    শিক্ষক যদি ছাত্রদের ভালো না বাসেন, তবে তিনি কীসের শিক্ষক : চিন্ময় গুহ-র সাক্ষাৎকার

    শিক্ষক যদি ছাত্রদের ভালো না বাসেন, তবে তিনি কীসের শিক্ষক : চিন্ময় গুহ-র সাক্ষাৎকার

    Story image

    ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের জন্মদিন তথা ৬১তম জাতীয় শিক্ষক দিবস (61st National Teachers Day)। মানবসভ্যতার ইতিহাসের অন্যতম অঙ্গ হলো শিক্ষা। আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কথা উঠলে, উঠে আসে বহু চরিত্র- কেউ শিক্ষক, কেউ ছাত্র, কেউ আবার শিক্ষাকর্মী। তাঁদের ওতোপ্রত সম্পর্কে বয়ে চলে শিক্ষা। কিন্তু শিক্ষক কি শুধুই প্রতিষ্ঠানের? বারবার প্রমাণিত হয়েছে, তা নয়। বরং বিশিষ্ট শিক্ষক, তাঁদের ছাত্ররা বারবার প্রমাণ করেছেন, শিক্ষা, শিক্ষক, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠান ছাড়িয়ে বিশ্বজগতের মহাকাশতলে দাঁড়িয়ে পূর্ণতা পায়। শিক্ষক দিবসের প্রাক্কালে বঙ্গদর্শন.কম কথা বলল এই সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, চিন্তক, ফরাসি ভাষার সুপণ্ডিত, লেখক চিন্ময় গুহ (Chinmoy Guha)-র সঙ্গে। তাঁর কথায় উঠে এল ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের সেকাল-একাল, তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা, আর অমোঘ ছন্দে এলেন রবীন্দ্রনাথ– যিনি ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক আর শিক্ষার এপিটোম। সম্ভবত সর্বোচ্চ। প্রসঙ্গত, এই মাসেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসাবে চিন্ময় গুহের কার্যকালের মেয়াদ ফুরোচ্ছে। তাই গলায় ধরা পড়ল আবেগও, যা বলে দিল- যতই প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব ফুরোক, শিক্ষক হিসাবে তাঁর যাত্রা ফুরোবে না। বোধহয় ছাত্র হিসাবেও নয়।

    __________________

    প্রথমেই জানতে চাইব, আপনার কাছে জাতীয় শিক্ষক দিবসের তাৎপর্য কী?

    চিন্ময় গুহঃ আমি গত সাড়ে তিন দশকের উপর শিক্ষকতা করছি। তরুণ থেকে প্রবীণ হয়েছি। ঘটনাচক্রে এই মাসেই আমার অবসর। তাই এই শিক্ষক দিবসই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রূপে আমার কাছে শেষ শিক্ষক দিবস। কিন্তু সত্যি কথা বলতে, আমি শিক্ষক দিবস নিয়ে কোনোদিন আলাদা করে কিছু ভাবিনি। শিক্ষক দিবস মানে আসলে ছাত্র দিবস। এর তাৎপর্য হলো ছাত্রদের যোগ্য হয়ে ওঠা। তাই আমার কাছে প্রতিটি দিনই আমার কাছে শিক্ষক দিবস। আলাদা করে একটা দিন তার জন্য বরাদ্দ থাকায় আমার কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু এর তাৎপর্য যেন আমরা সারা বছরই বহন করতে পারি। 

    জাক দেরিদার সঙ্গে

    আদর্শ শিক্ষক আপনার মতে কেমন হওয়া উচিৎ?

    চিন্ময় গুহঃ শিক্ষক হতে গেলে ছাত্রদের যোগ্য হয়ে উঠতে হয়। আমি এখনও রোজ ক্লাসে ঢোকার সময় মনে মনে আমার মা-কে স্মরণ করি, মনে মনে বলি- আমি যাতে ছাত্রদের যোগ্য হয়ে উঠতে পারি। এইটা যাঁরা মনে করেন না (অর্থাৎ ছাত্রদের যোগ্য হয়ে ওঠা), তাঁদের আমি শিক্ষক বলে মনে করি না। আমি যখন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদায় নিয়েছিলাম, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠতম থেকে কনিষ্ঠতম, সব ছাত্রই বিমর্ষ হয়েছিল। কারণ তাঁরা জানত, এই শিক্ষক তাদের স্নেহে-ভালোবাসায় ভরিয়ে রাখতেন। আমি আমার ক্লাসের প্রতিটি মুহূর্ত স্বপ্নমুহূর্ত হিসাবে গড়ে তুলতে চাই। সেটাই একজন শিক্ষকের মূল দায়িত্ব বলে মনে করি। কারণ ছাত্রদের জীবন শিক্ষকের হাতে। তাঁদের সিদ্ধান্ত, ব্যবহার একজন ছাত্রের জীবন তৈরি করে দেয়। বহুবার শুনেছি, অনেক শিক্ষক বলেন, ছাত্ররা কিছু পারছে না। তাঁরা কতটা শেখাতে পারছেন, সেদিকেও তো নজর দিতে হবে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আদর্শ শিক্ষক কি একেবারেই দেখা যায় না? তা নয়। পবিত্র সরকার, শোভনলাল দত্তগুপ্ত, গৌতম ভদ্র, সৌরীন ভট্টাচার্য, শঙ্খ ঘোষ.....আরও বেশ কিছু নাম করা যায়। এঁরা ছাত্রদের আত্মাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করেন, করেছেন। আমিও সেই চেষ্টাই করি। আমার মতে এটাই শিক্ষকতার মূল কথা। 

    আপনার ছাত্রজীবন থেকে অধ্যাপক জীবন। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে?

    চিন্ময় গুহঃ কাঁধে হাত রাখার মতন শিক্ষকের বড়োই অভাব এখন। আমি প্রতিদিন দুঃখ পাই যে, একটা বিষয় যত গভীরে গিয়ে ছাত্রদের বোঝানোর কথা, তা আমি পারিনি। প্রখ্যাত চিন্তক, লেখক ও শিক্ষক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক একবার আমাকে বলেছিলেন, ‘আমি ছাত্রের ভৃত্য’। এই কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্রদের জন্যই তো শিক্ষকরা আছেন। এখন ভালোবাসাহীনতা, সম্মানহীনতার জায়গাটা এই সম্পর্কে বড়ো হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার পিছনে অন্যান্য কারণ, রাজনৈতিক কারণ থাকলেও আমার মতে প্রধান দায়ী একাংশের শিক্ষকরাই। যে শিক্ষকদের ছাত্ররা ভালোবাসেন না, তাঁরা ছাত্রদের পড়াবেন কীভাবে?

    এই প্রসঙ্গে বলতে চাইব রবীন্দ্রনাথের কথা। কারণ তিনি শিক্ষা নিয়ে গত শতাব্দীর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাটি করেছিলেন। বিশ্বভারতীতে প্রকৃতির মাঝে নিগড়মুক্ত করেছিলেন শিক্ষাকে। আমরা যদি ‘জীবনস্মৃতি’ পড়ি, তাহলে দেখবো তাঁকে ছাত্রাবস্থায় শিক্ষাঙ্গনে অনেক লাঞ্ছনা ভোগ করতে হয়েছিল। তা তিনি ভোলেননি কখনও। তিনি শিক্ষাকে মুক্ত (Liberate) করতে চেয়েছিলেন। শিক্ষায় মুক্তচিন্তার প্রসার ঘটানোর জন্য তিনি যে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছিলেন, আর কেউ করেননি। উনি যা বরাবর পালন করে গেছেন- তা হলো ছাত্রদের সম্মান করা, তাদের কাজ, চিন্তাকে গুরুত্ব দেওয়া। তা আজ বৃহৎ অর্থে হারিয়ে গেছে। শিক্ষকরা ছাত্রদের ভালবাসতে না পারলে, প্রকৃত শিক্ষা সম্ভব নয়।

    এই যে নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি, সেসব তো তৈরি করেছেন একদল শিক্ষকেরাই। কিন্তু এই শিক্ষানীতি ভারতবর্ষকে, তার দৈন্যতাকে, তার দুঃখ আর দুঃখভরা মায়াকে না চেনার ফসল। আমার সঙ্গে কথোপকথনে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ তপন রায়চৌধুরী বলেছিলেন, ‘দেশ স্বাধীন হওয়ার পর উচ্চশিক্ষায় প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ হয়…বিনিয়োগের কর্তা নেতাবাবুরা, যাঁদের শিক্ষাদিক্ষা খুব প্রবল নয়। ভারতবর্ষে হাত কচলানোর সংস্কৃতি স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছে। এই ব্যাপারে যাঁর যত পটুত্ব, তাঁর তত পোয়াবারো’। শিক্ষক হতে গেলে পৃথিবীর সঙ্গে সংযুক্ত হতে হয়, পৃথিবীর সেম্যান্টিক কালচারের সঙ্গে সংযুক্ত হতে হয়। আমার শিক্ষক শ্রদ্ধেয় জ্যোতিভূষণ চাকী শিখিয়েছিলেন কীভাবে পৃথিবীর সঙ্গে সংযুক্ত হতে হয়। নিজের কথা বলতে পারি, আমি এখনও রোজ যোগ্য হওয়ার চেষ্টা করি। বিশ্বাস করি, সেই চেষ্টা করেন আরও অনেকেই। আরেকটা কথা বলতে চাই। আমি যখন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করতে গিয়েছিলাম, দেখেছিলাম, বিশাল বড়ো বিল্ডিং, আকাশছোঁয়া ছাদ, কিন্তু দরজাগুলো নিচু নিচু। অর্থাৎ, ছাত্র বা শিক্ষক সবাইকেই মাথা নিচু করে ঢুকতে হবে। নম্র হওয়ার, বিশালত্বের সামনে নতমস্তক হওয়ার এই শিক্ষা খুব জরুরি। 

    আর আমাদের ছাত্রজীবনের কথা সাধারণভাবে বলতে গেলে একটা কথা বলতে হয় যে, আমাদের সময়ে শিক্ষকরা ছাত্রদের থেকে একটু যেন দূরে দাঁড়াতেন। একটা উঁচু ডায়াসে, গোটা ক্লাসের থেকে আলাদা হয়ে। ব্যতিক্রম অবশ্যই ছিল। তবে একটা গাম্ভীর্যময় দূরত্ব বয়ে যেত যেন ছাত্রদের বেঞ্চ আর শিক্ষকদের ডায়াসের মধ্যে। আমি প্রথম থেকেই ছাত্রবন্ধু হতে চেয়েছি। আগের প্রজন্মের থেকে বেশি ভালোভাবে গাছের চারায় জল দিতে চেয়েছি, চেষ্টা করেছি। আমি মনে করি, সত্যিকারের ছাত্রদের সঙ্গে আর সত্যিকারের শিক্ষকদের সম্পর্ক কখনও নষ্ট হয় না। 

    অ্যাকাডেমিক ফ্রেঞ্চ নাইটহুড প্রাপক চিন্ময় গুহ

    অনেকে বলেন আগে শিক্ষকরা ছাত্রদের শাসন করতেন, মারধরও করতেন। তাতে নাকি আখেরে ছাত্রদের ভালো হতো। এখন সেই পরিসর প্রায় না থাকায় ছাত্রদের আখেরে ক্ষতিই হয়েছে? এই ব্যাপারে কী বলবেন?

    চিন্ময় গুহঃ সেটা যে খুব ভালো ছিলো তা নয়। আমি জগদ্বন্ধু ইন্সটিটিউশনে পড়তাম। সেখানকার দোর্দণ্ডপ্রতাপ শিক্ষকদের কাউকে মনে নেই। কিন্তু যাঁরা স্নেহ করতেন, তাঁদেরকে মনে আছে। শাসন থেকে ফুল ফোটে কিনা বলতে পারবো না। আসল আলো দেয় স্নেহ, ভালোবাসা আর একাত্মতা। 

    শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্ক নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। কিন্তু শিক্ষাকর্মীদের নিয়ে তেমন কথা হয় না। একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তো তাঁদের গুরুত্ব অনস্বীকার্য!

    চিন্ময় গুহঃ অবশ্যই। তাঁরা ছাড়া তো শিক্ষাঙ্গন অসম্পূর্ণ। আমি সব সময়েই শিক্ষাকর্মীদের কাছ থেকে আন্তরিক ব্যবহার পেয়ে এসেছি। নিজেদের কাজে, ব্যবহারে তাঁরা মনে করিয়ে দেন, যে তাঁরা আপনার লোক। 

    এখন তো প্রতি ক্ষেত্রেই আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্সের দাপট। ভবিষ্যতে যদি মানব শিক্ষকের জায়গায় হিউম্যানয়েড শিক্ষক চলে আসে, তা কি আদৌ ভালো হবে?

    চিন্ময় গুহঃ পৃথিবী তো নিজের ছন্দে এগিয়ে যাবেই। তাকে তো আটকানো যায় না। তবে এটা হলে মানব-সংযোগের জায়গাটা হারিয়ে যাবে। তাতে আখেরে ক্ষতি হবে বলেই মনে হয়। 

    প্যারিসের মমার্তে মার্টিন কেম্পশন-এর সঙ্গে

    বর্তমান সময়ের শিক্ষক বা ছাত্রদের উদ্দেশ্যে কোনও বার্তা দিতে চাইবেন?

    চিন্ময় গুহঃ আমি মনে করি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘শিক্ষার মিলন’, ‘সত্যের আহ্বান’, ‘ছাত্রদের প্রতি সম্ভাষণ’ ‘তোতাকাহিনী’- এই প্রবন্ধ আর গল্পগুলি নতুন করে আবার পড়া দরকার। শিক্ষাকে বাঁচানোর জন্যে। একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ শিক্ষক হিসাবে এটাই বলার।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @