বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব: প্রতীক্ষার ১০০ দিন

নতুন ক্যালেন্ডার পেয়েই চট করে দুর্গাপুজোর ছুটিতে চোখ বুলিয়ে নেওয়ার অভ্যাসটা এখনও গেল না বাঙালির। তবে বাঙালির সেন্টিমেন্টে কোনো বদল না এলেও, উদযাপনে ফারাক এসেছে তো বটেই। স্বদেশী আমলের পুজো থেকে আজকের কার্নিভালপুজো- মাঝে পড়ে রয়েছে প্রায় তিনশো বছরের ইতিহাস। শোনা যায়, পলাশীর যুদ্ধে নবাবদের হারানোর পরে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানাতে চেয়েছিলেন রবার্ট ক্লাইভ। তখন ক্লাইভের ব্যক্তিগত সচিব নবকৃষ্ণ দেব তাঁর বাড়িতে দুর্গাপুজোয় ক্লাইভকে আমন্ত্রণ জানান। ধুমধাম করে পুজো হয় কলকাতায় শোভাবাজারে নবকৃষ্ণের বাড়িতে। পুরোনো কলকাতার ইতিহাস ঘাঁটলেই দেখা যায় শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপুজোকে ‘কোম্পানির পুজো’ বলেই উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ ঘোষণার পরে দুর্গাপুজোয় গুরুত্বপূর্ণ বদল আসে। স্বদেশী আন্দোলনের ব্যাপ্তি বাড়াতে এই উৎসবই বিপ্লবীদের কাছে হাতিয়ার হয়ে ওঠে। সকলের জন্য পুজো- এই ধারণা নিয়ে শুরু হয় সর্বজনীন দুর্গাপুজো। ১৯২৫ সাল। জেলে বসেই বন্ধুকে চিঠি লেখেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু। জেলের মধ্যে থেকেও নাকি পুজোর আয়োজনের অনুমতি মিলেছে। এই ইতিহাস আসলে শেষ হবার নয়।
অবশেষে কাউন্টডাউন শুরু। পুজোর বাকি আর গোনাগুন্তি ১০০ দিন। কলকাতার কুমোরটুলিতে শুরু হয়ে গিয়েছে রাত জাগার উল্লাস। কিছুদিন পর থেকেই শহরে হোর্ডিং পড়বে। উত্তর আর দক্ষিণের লড়াই, বাড়ির পুজো কী বলবে? আমন্ত্রণপত্র আর নতুন পোশাকে ভিড় জমবে এ-দোকান থেকে সে-দোকান। হাতে হাতে বিলি হবে এবার পুজোর থিম। টেলিভিশনে ভেসে উঠবে কলা-বৌ, ভেসে আসবে ‘এই প্রাণ ভরা উৎসবে বারবার, আলো-আশা ভালোবাসা মিলে একাকার’... তারপরেই ছেলেবেলার খুব চেনা একটা কণ্ঠ বলে উঠবে ‘শালিমার, শালিমার’।
বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো। যে উৎসবকে নিয়ে বাঙালির নাওয়া-খাওয়ার শেষ নেই। শিল্পীরা পুরোদমে কাজে লেগে পড়বেন আর কিছুদিন পরেই। জোর কদমে চলবে মিটিং। নাকতলা উদয়নের কী খবর মশাই? মুদিয়ালি, শিবমন্দির, বাবুবাগান, এসবি পার্ক, সেলিমপুর পল্লি, একডালিয়া এভারগ্রিন, চেতলা অগ্রণী, সুরুচি সংঘ, ত্রিধারা সম্মেলনি কী বলছে? ওদিকে উত্তুরে হাওয়া কতটা জমাটি হবে জানেন? বৃন্দাবন মাতৃমন্দির, নলিন সরকার স্ট্রিট, চালতাবাগান, কুমোরটুলি সর্বজনীন, আহিরীটোলা, বাগবাজার সর্বজনীন, হাতিবাগান সর্বজনীন, তেলেঙ্গাবাগান, টালা পার্ক-এর খবর কী?
বাড়িতে বাড়িতে রঙিন পর্দা উড়বে, বিছানায় পাতা হবে নতুন চাদর, বাহারি ফুলে মিশে থাকবে এ-ঘর ও-ঘর। শোভাবাজার রাজবাড়ি, সাবর্ণ রায়চৌধুরী বাড়ি, ভবানীপুর মল্লিকবাড়ি, ছাতুবাবু লাটুবাবু, লাহা বাড়ির পুজো এবার যেন কততম? ওদিকে জেলার পুজোর কী অবস্থা? বর্ধমান, জলপাইগুড়ি, দুর্গাপুর, হুগলি, মালদা, চব্বিশ পরগণা, মুর্শিদাবাদ- পুজোর হাওয়া কদ্দুর?
আষাঢ় মাস শুরু হলেও দক্ষিণবঙ্গে এখনও ঠিকমতো বর্ষা ঢোকেনি। এরপরেই পুজোর গন্ধ নিয়ে ঢুকে পড়বে শরৎ। কলকাতায় আবার পুজো শুরু হয়ে যায় মহালয়ার পুণ্যলগ্ন থেকেই। এবছর পুজো ঢুকবে অনেকটা আগে। অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহেই। ক্যালেন্ডার বলছে ৩ অক্টোবর অর্থাৎ ১৫ আশ্বিন মহাপঞ্চমী। আজ থেকে হিসাব করলে ঠিক একশো দিন বাকি থাকছে পুজোর। মহালয়া ২৯ সেপ্টেম্বর অর্থাৎ ১০ আশ্বিন।
আমাদের ক্রমশ পাল্টে যাওয়া শহরে বছর বছর জাঁকজমকভাবে পালিত হয় দুর্গাপুজো। বাঙালির ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’ প্রবাদের সবচেয়ে উজ্জ্বল এই দিনগুলি। ইতিহাস দরজায় এসে কড়া নাড়ে। এখনকার থিমপুজোর ইন্সটলেশনের গায়ে লেখা থাকে ফেলে আসা তিনশোটি বছর। পুজো শেষের কান্না বাঙালিদের ভাবায়। এই ‘আসছে আসছে’ ভাবই যেন আমাদের বাঁচিয়ে রাখার সংজ্ঞা যোগায়। পুরোনো বন্ধুটির সঙ্গে দেখা হচ্ছে কবে? পুরোনো প্রেম? এই বদলে যাওয়া আর ব্যস্ততার মধ্যেই আমরা দিন গুনব- ১০০, ৯৯, ৯৮...