No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    হিউম্যান স্পেস টাইম হিউম্যান এবং একটি বিপন্ন জাহাজ

    হিউম্যান স্পেস টাইম হিউম্যান এবং একটি বিপন্ন জাহাজ

    Story image

    জাহাজ বললেই একটা লম্বা জার্নির কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে ভাসা বা উড়ে যাওয়ার কথা। সেই জাহাজ জলেও ভাসতে পারে, আকাশেও উড়তে পারে। একটা জাহাজ যদি হয় আস্ত চরিত্র আর তাতে একঝাঁক মানুষ অস্তিত্বের সংকটে লড়াই করছে। খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান, ভালোবাসা সবকিছুর সংকট। কিম কি দুক একজন প্রখ্যাত কোরিয়ান চলচ্চিত্র নির্মাতা। কিমের সিনেমায় শুরু আর শেষের রাস্তাটা একটু গুলিয়ে যাওয়ার মতো। ইমেজ আর রঙে ভরসা করেন কিম। ন্যারেশন পাল্টায় বারবার; সে ‘থ্রি আয়রন’ হোক বা ‘স্প্রিং সামার ফল উইন্টার অ্যান্ড স্প্রিং’—ঘটনাক্রম নতুন মোড় নেয়। ঠিক তেমনই কিম কি দুকের নতুন ছবি ‘হিউম্যান স্পেস টাইম অ্যান্ড হিউম্যান’। ২৪তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ইন্টারন্যাশনাল সেকশনে দেখানো হল এই কোরিয়ান ছবিটি।

    কিম কি দুক বারবার বলেন এই বিশ্বে আমরা বাস করি বাস্তবে নতুবা স্বপ্নে। তাই বারবার প্রতিবার পরাবাস্তবে ফেরা, কবিতায় আশ্রয় নেওয়া। তিনি বলেন, “মানুষ আমার সিনেমায় কী দেখতে চান, তা তাঁরাই পছন্দ করবেন, আমি পছন্দের বিষয়টি তাঁদের ওপর ছেড়ে দিয়েছি।’ ‘হিউম্যান স্পেস টাইম অ্যান্ড হিউম্যান’ মনুষ্যত্ব এবং আদিমের হাত ধরে চলে। গোটা ছবি জুড়ে আদিম বুনো গন্ধ দর্শকদের নাকে আসে। হিংস্র পৃথিবী, হিংস্র মানুষের মন, হিংস্র ভালোবাসা আমাদের গ্রাস করে। সিনেমার শুরুতে দেখা যায় একটি জাহাজ ভেসে চলেছে, তাতে রয়েছেন প্রচুর যাত্রী। আর সেখানেও বিভাজন, যাত্রীদের একদল শাসক শ্রেণির, আরেকদল শ্রমিক শ্রেণির। যিনি দেশ শাসন করেন, তিনি জাহাজও শাসন করেন নিজের নিয়মে। যাত্রীদের ধর্ষণ করেন, খুন করেন, খাবার বন্ধ করে দেন। বিকৃত মানুষ একসময় খেতে না পেয়ে নিজেদের মাংস খায়। অর্থাৎ মানুষ মানুষের মাংস খাচ্ছে। এইভাবে শরীরে বিষিয়ে যাচ্ছে অন্যের রক্ত। এই ছবিতে মোট চারটে অধ্যায় রয়েছে। হিউম্যান, স্পেস, টাইম এবং আবার হিউম্যান। ছবিতে দেখানো হয় আধুনিক সভ্য সমাজ থেকে অনেকখানি এগিয়ে আমরা পৌঁছে যাচ্ছি প্রাচীন অসভ্য সমাজে। সাক্ষী থাকছে একটা জাহাজ এবং একটি বোবা লোক। লোকটি শুধু হাসেন। মানুষকে খুন করা হলে তাদের শরীরের ক্ষত অংশে তিনি বাদামের বীজ দেন, তার উপর মাটি দেন। যাতে সেই ক্ষত অংশ থেকে গাছ তৈরি হয়। কিম কি দুক কী অদ্ভুতভাবে মৃত মানুষের শরীরে প্রাণের সঞ্চার করলেন। কী অস্বাভাবিক অথচ নির্মম সেই দৃশ্যগুলি। চারটে অধ্যায়ের প্রথমে আধুনিক সভ্য সমাজ, দ্বিতীয় অধ্যায়ে জাহাজ আর জলে নেই, আকাশে উড়ে গেছে। জলজাহাজ হয়ে গেছে উড়োজাহাজ। অর্থাৎ স্পেসের মধ্যে মানুষের জীবন সংগ্রাম। তাদের খেতে না পাওয়া কিংবা কাছের মানুষটিকে হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা কুরেকুরে খাচ্ছে। তৃতীয় অধ্যায়ে দেখানো হয় সময়। যে সময়ে কোনও মানুষ নেই, দিগ্বিদিক শূন্য। একমাত্র একটি মেয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে তার পেটের বাচ্চাটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। সে জানে না বাচ্চাটি কার, তার স্বামীর নাকি যারা তাকে দীর্ঘদিন ধর্ষণ করেছে তাদের। তবুও বাচ্চাটিকে পৃথিবীর আলো দেখানোর নেশা তাকে গ্রাস করছে। এবং শেষ অধ্যায়ে আবার ফিরে আসছে হিউম্যান। ছবির কাহিনি এগিয়ে যায় ১৭ বছর পর। বাচ্চাটি বড় হয়, এখন সে তার মাকেই ধর্ষণ করতে চায়। মা ছোটে, ছেলেটি ছোটে পিছন পিছন। সিনেমা শেষ হয় পরিণতিতে। যেখানে কিম কি দুক দেখান একটি জলে ভাসা জাহাজ আকাশে উড়ে গিয়ে সবুজ গাছপালায় ভর্তি হয়ে গেছে। সভ্যতা পৌঁছে গেছে আদিমে। সেখান থেকে দেখা যায় পৃথিবীর তিনভাগ জল, একভাগ স্থল—যার রং সবুজ। 

    কিম কি দুকের ছবিতে যৌনতা আসে নান্দনিক এবং সাবলীলভাবে। এই ছবিতে যৌন দৃশ্যগুলি দেখলে নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হয়। তবুও কাহিনির সঙ্গে দৃশ্যগুলি আরও ভয়াবহ এবং বাস্তবিক রূপ নিয়েছে। কবিতা বোঝার নয়, অনুভব করার। তেমনই সিনেমাও দেখার নয়, অনুভব করার। কিম কি দুকের ছবি দেখলে তাই-ই মনে হয়। সাউথ কোরিয়ান এই পরিচালক তাঁর মনের ভাব শব্দে প্রকাশ না করে ইমেজের মাধ্যমে প্রকাশ করার মুন্সিয়ানা দেখান। তা বিস্ময়কর, অসাধারণ এবং নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। ‘হিউম্যান স্পেস টাইম অ্যান্ড হিউম্যান’ ছবিটি অমানবিক আর মনুষ্যত্বের যে দ্বন্দ্ব, তার পাশাপাশি হাঁটে। কিম কি দুক, আপনি এইভাবে একের পর এক ছবি বানিয়ে যান। আর আমরা সেই কাজ দেখে আরও একটু বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা পাই। 

    ছবি- হিউম্যান স্পেস টাইম অ্যান্ড হিউম্যান (২০১৮) | পরিচালক- কিম কি দুক | সঙ্গীত পরিচালক- পার্ক ইন-ইয়ং | অভিনয়- মিনা ফুজি, জাং কিউন সুক, আন সুন কি প্রমুখ | শুভমুক্তি- ১৭ ফেব্রুয়ারি’১৮ (বার্লিন)

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @