No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    কলকাতার মিষ্টিকেও ‘অশেষ’ চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে হৃদয়পুরের এই দোকান

    কলকাতার মিষ্টিকেও ‘অশেষ’ চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে হৃদয়পুরের এই দোকান

    Story image

    “সবই তো হল দাদা, কিন্তু সেই মিষ্টির দোকানটা কোনদিকে?” সুদূর বেহালা থেকে বারাসত-মধ্যমগ্রামের বিখ্যাত কালীপুজো দেখতে আসা একদল মানুষ অচেনা মফঃস্বলে ভোরের রাস্তাঘাটে ঢুঁড়ে বেড়াচ্ছেন একটি দোকান। সারারাত ধরে এগরোল-চাউমিন ঠুসে বোঝাই যায় পেটে জায়গা নেই আর মিষ্টির জন্য। তবু খোঁজ চলে। এ যেন বেড়াতে এসে প্রসিদ্ধ দেউলে একবার মাথা ঠেকিয়ে যাওয়া। ‘অশেষ’-এর সন্ধান। এমন ছবি উত্তর চব্বিশ পরগণার এই অঞ্চলে দেখতে পাওয়া যায় সারাবছর। গনগনে রোদ মাথায় ডাকবাংলোর তিন মাথার মোড়ের ট্রাফিক সার্জেন্টকে প্রায় নিয়মিতই কাউকে না কাউকে বাতলে দিতে হয় হৃদয়পুরের ‘অশেষ সুইটস’-এর পথ। হৃদয়পুর স্টেশনের ঠিক সামনেই প্রায় চল্লিশ বছর ধরে এই দোকানের মিষ্টি যে বারাসত-মধ্যমগ্রাম-হৃদয়পুরের মানুষের বড্ড বেশি কাছের।

    ডাক্তারি শাস্ত্রে বলা হয় মানুষের শরীরে নানাবিধ রাসায়নিক উপাদানের মধ্যে প্রাধান্য রয়েছে মূলত শর্করার। আর বাঙালির স্বাদকোরক যে হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এই শর্করাজাত খাবারকেই থুড়ি মিষ্টিকেই বেশি উৎসাহে আপন করে নিয়েছে তা আলাদা করে বলবার প্রয়োজন নেই। মহাভারত, মনুসংহিতায় অপূপ ও সরস পায়েস নামের দুরকম মিষ্টির উল্লেখ রয়েছে বারবার। আসলে আগের অনেকটা সময় ধরেই অভিজাত বঙ্গবাসীর হেঁসেলেও আমিষ খাবার সেভাবে ঢুকতে পারেনি। তখন মিষ্টিই ছিল ভোজনবিলাসীর একমাত্র আশ্রয়। মিষ্টি তৈরিতে ও স্বাদের কারুকাজে আজকের বাঙালি অপ্রতিদ্বন্দ্বী। জন্ম-মৃত্যু-বিয়ে তো বটেই, এছাড়াও যে কোনও রকম ক্রিয়াকর্মের উপলক্ষেই মিষ্টির দরকার সবার আগে। কিছুদিন আগে পর্যন্তও এমন নানা অনুষ্ঠানে খাবারের দায়িত্ব পড়ত রাঁধুনি ও হালুইকরের উপর। রাঁধুনির ভাগে সমস্ত আমিষ রান্না, অন্ন-ব্যঞ্জন ইত্যাদি; আর হালুইকর তৈরি করতেন মিষ্টি। বাঙলাইর মিষ্টির ভাঁড়ার তার শব্দভাণ্ডারের মতোই জম্পেশ। রসগোল্লার বিশ্বজোড়া খ্যাতির কথা ছেড়ে দিলেও সীতাভোগ, মিহিদানা, ল্যাংচা, জিলিপি, বোঁদে, গজা, খাজা, মালপোয়া, লেডিকেনি, গোলাপজাম, কালোজাম, ক্ষীরমোহন, মনোহরা, কাঁচাগোল্লা, ছানাবড়া, রসমালাই, ছানার পায়েস, অমৃতি, জলভরা সন্দেশ, কালাকাঁদ, দানাদার—এরা কোনওটিই কারোর থেকে কম যায় না।

    মিষ্টি-সম্পর্কিত আমাদের নানান ভুল ধারণাও রয়েছে । তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর ভ্রান্তি এ-ই যে খাস কলকাতার বিশেষ কয়েকটি দোকান ছাড়া আর কোনও জায়গার মিষ্টি বাঙালিকে তৃপ্ত করতে পারে না। আসলে মফঃস্বলের বিভিন্ন মিষ্টির দোকানের মণি-মাণিক্যর সন্ধান প্রায় কেউই সহজে পাই না আমরা। ভুলে যাই নবদ্বীপের মিষ্টির কথা, বনগাঁর মাখা সন্দেশের কথা, হাবড়ার দই কিংবা বর্ধমানের ছানার মিষ্টির কথা। এরা চাইলেই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পারে কলকাতার বাঘা বাঘা মিষ্টির দোকানকে। খোড বড়লাটের কাছে নাকি যেত বনগাঁর সন্দেশ। সে যাহোক, মফঃস্বলের মিষ্টির এই উত্তরাধিকারই বহন করছে ‘অশেষ সুইটস’।

    ৭৯’- এর কাছাকাছি সময়ে ছোট্ট একটি একচালা ঘরে প্রথম এই দোকানের শুরু, তখন কিন্তু নাম ছিল ‘প্রসিদ্ধ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্রমশ অব্যাহত ছিল এর ‘হয়ে ওঠা’। এরপর ৯৩’ সালে নাম বদল হয়, ‘অশেষ সুইটস’-এর কর্ণধার তখন অশেষ বিশ্বাস। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পারিপার্শ্বিক অবস্থারও উন্নতি হয় এবং ক্রমশ এখানকার মিষ্টি বারাসাত এবং তার চারপাশের অঞ্চলে প্রসিদ্ধি পেয়ে যায়। আজ ‘অশেষের মিষ্টি’-র নাম শোনা যায় কলকাতার নানান মিষ্টিমিশুক মানুষজনের মুখেও। বেড়াতে এসে বা কোনও অনুষ্ঠানে এই দোকানটির মিষ্টি যাঁরাই চেখেছেন, প্রত্যেকে এর গুণমানের প্রশংসাই করেছেন একবাক্যে। কড়া মিষ্টিতে জিভের স্বাদ নষ্ট করে ফেলবার যে চলন ইদানিং বিভিন্ন দোকানে হয়েছে, অশেষের মিষ্টিতে তেমনটি একেবারেই ঘটে না। নির্দিষ্ট অনুপাতে এই দোকানের কারিগর চিনি বা গুড় মেশান ছানার মধ্যে। দুধও আসে নিজস্ব খাটাল থেকেই। ফলে রসনার তৃপ্তি যাকে ব’লে, এখানকার খাবারে যাতে তা মেলে, তার দিকে কড়া নজর রয়েছে কর্মী-কারিগরদের। হালের ফিউশন-মিষ্টির রমরমার থেকেও নিজেদের সযত্নে বাঁচিয়ে রেখেছে এই দোকান। মিষ্টির হলদে-সবুজ রং করা ওরাংওটাং-এর চাইতে খাঁটি মিষ্টির স্বাদ বুনে যাওয়া এঁদের কাছে বেশি দামি।

    রসগোল্লা ছাড়া এখানে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় কালাকাঁদ, কড়াপাকের সন্দেশ এবং অবশ্যই মিষ্টি দই। শোনা যায়, মেয়ের বিয়ের মিষ্টি দই-এর জন্য কলকাতার বিখ্যাত এক ডাক্তার অশেষে অর্ডার দিয়ে রেখেছিলেন চার বছর আগে থেকে। বনগাঁ লাইনের বহু যাত্রীই মাঝে মধ্যেই হৃদয়পুর স্টেশনে নেমে পড়েন অশেষ সুইটস এর মিষ্টির লোভে। আর ওঁরাও, প্রায় কাউকেই নিরাশ করেননি। সকাল সাতটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত এই দোকানের কর্মীরা দুই বা তিন শিফটে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে যান রোজই। ছুটির দিনে এই দোকানের ভিড় সামলাতে আট-দশ জন কর্মীকেও হিমসিম খেয়ে যেতে হয় তা ওদিককার বাসিন্দাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাও বটে।

    যতদূর জানা যায় আঠার শতকের আগে এদেশে মিষ্টির দোকান বলতে তেমন কিছুই ছিল না। কিন্তু তার পরেও বহুদিন পর্যন্ত দোকান-বাজারের মিষ্টি ঘরের মিষ্টির কৌলীন্য অতিক্রম করতে পারেনি। আর এখন দেখা যাচ্ছে মহানগরের দোকানপাটের হাতযশও ম্লান হয়ে আসছে মফঃস্বলের বিভিন্ন মিষ্টান্ন-বিপণীর কাছে। তবে, এমন দোকানের খোঁজ জানা না থাকায় অনেকসময় আমরা অল্পেই সন্তুষ্ট হয়ে পড়ি। কিন্তু, বারাসাত চত্বরে এসেও ‘অশেষ’-এ ঢুঁ না মারলে, সে হবে অশেষ ভুল। মিষ্টির সমঝদার হন্যে বাঙালি জাতি নিজেদের দেউল ঠিকই চিনে নিতে পারবে একসময়, এটুকু ভরসা থাক আপাতত।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @