No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    শতবর্ষে পা রাখলো হাওড়ার ঐতিহ্যবাহী ৫২ নম্বর বাস

    শতবর্ষে পা রাখলো হাওড়ার ঐতিহ্যবাহী ৫২ নম্বর বাস

    Story image

    থায় বলে, “পুরোনো চাল ভাতে বাড়ে”! নতুন জিনিস কেনায় আমাদের আগ্রহ যতোই থাক, পুরোনোর প্রতি অমোঘ টান কমেনি কোনোকালেই। ভাঙাচোরা হোক অথবা ধ্যারধ্যারে, পুরোনো কিছু মানেই স্মৃতির ঝুলি! উপরন্তু যদি তার শতবর্ষের ঐতিহ্য থাকে, তবে তো কোনো কথাই নেই! না, এ কোনো স্মৃতিসৌধ অথবা সাহিত্যের পথচলা নয়। এ গল্প আক্ষরিক অর্থেই শতবর্ষ ধরে চলার গল্প। ১৯২৩ সালে ব্রিটিশ বদান্নতায় প্রথম প্রস্তাব পাশ হয় হাওড়ার এই বাসটির, তাই ২০২২ সালেই এই রুটের প্রাক শতবর্ষ শুরু হয়ে গেছে। রীতিমত কেক কেটে উদযাপন করা হচ্ছে সময়ের।

    সময়টা ১৯২৩ সাল। একদিকে জার্মানিতে নাৎসি অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন অ্যাডলফ হিটলার, অন্যদিকে ভারতে তখন পুরোদস্তুর ব্রিটিশ শাসন। পরাধীন ভারতের ব্রিটিশ কাউন্সিলে প্রস্তাব পাশ হল একটি বাস রুটের। প্রথমে হাওড়া স্টেশন (Howrah Station) থেকে রামরাজাতলা (Ramrajatala), পরে তা ধর্মতলা (Dharmatala) পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। প্রথমে কোনও নাম ছিল না রুটের। বাসের সংখ্যাও ছিল হাতে গোনা। সেই থেকেই যাত্রা শুরু। পরবর্তীকালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই রুটের নাম দেওয়া হয় ৫২ নম্বর রুট! সেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে আজকের রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ, প্রায় ১০০ বছরের সমস্ত পরিবর্তনের সাক্ষী এই রুট।

    কিন্তু, হঠাৎ রুট নম্বর ৫২-ই বা কেন? প্রশ্নটা মনে আসা খুবই স্বাভাবিক। তখন হাওড়ার অন্যপাড়ে, ব্রিটিশ রাজধানী কলকাতায় ট্রামের রুট ছিল ৫০ নম্বর পর্যন্ত। পিঠোপিঠি চালু হয়েছিল ৫১ নম্বর রুটও, হাওড়া থেকে বালিখাল। তাই পরবর্তী নম্বর হিসেবে বিবেচিত হয় ৫২।

    ইতিহাস বলছে, ১৭৫০-৫৫ সালে রামঠাকুর বা রামরাজা মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রাজা অযোধ্যারাম চৌধুরী। রামরাজা মন্দিরের নাম অনুযায়ী জায়গাটির নাম হয় রামরাজাতলা। সেই সময় রামঠাকুরের প্রাচীন মন্দিরে পূর্ণ্যার্থীদের যাতায়াতের জন্য ৫২ নং বাস রুট চালু করা হয়। ৫২ নং বাস রুট চালু করেছিলেন স্বয়ং রাজা অযোধ্যারাম চৌধুরী। যদিও পোশাকি পরিষেবার শুরু হয় ব্রিটিশ আমলে। প্রাথমিক ভাবে ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে ৫২ নং বাস রুটের প্রস্তাব পাশ করানো হলেও পরে স্বাধীন ভারতে গেজেটের মাধ্যমে পাশ হয় রুটটি।

    ব্রিটিশ আমলে কয়লার ইঞ্জিন দিয়ে শুরু হয়েছিল এই বাসের যাত্রা। মাটির রাস্তা দিয়ে বাস চলত ঢিমে গতিতে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টেছে বাসের যন্ত্র থেকে অবয়ব। মাটির রাস্তা পরিবর্তিত হয়েছে আধুনিক পিচের রাস্তায়। কয়লার ইঞ্জিনের জায়গায় এসেছে পেট্রল-ডিজেলের চল। ১৯৮০ সালে রামরাজাতলা থেকে হাওড়া স্টেশন পর্যন্ত ৫২ নম্বর বাস রুট (52 No Bus Route) সম্প্রসারিত হয়ে ধর্মতলা পর্যন্ত করা হয়। পরবর্তীকালে এই রুটের আরও বিস্তৃতি ঘটে। একদিকে খটিরবাজার থেকে হাওড়া স্টেশন, অন্যদিকে ইছাপুর থেকে হাওড়া স্টেশন পর্যন্ত চলাচল শুরু করে ৫২ নম্বর বাস। ১৯৮৫ সাল থেকে মধ্য হাওড়ার সুরকিকল থেকে ধর্মতলা এবং চ্যাটার্জিহাট-ধর্মতলা রুটে শুরু হয় পরিষেবা।

    কিন্তু, হঠাৎ রুট নম্বর ৫২-ই বা কেন? প্রশ্নটা মনে আসা খুবই স্বাভাবিক। তখন হাওড়ার অন্যপাড়ে, ব্রিটিশ রাজধানী কলকাতায় ট্রামের রুট ছিল ৫০ নম্বর পর্যন্ত। পিঠোপিঠি চালু হয়েছিল ৫১ নম্বর রুটও, হাওড়া থেকে বালিখাল। তাই পরবর্তী নম্বর হিসেবে বিবেচিত হয় ৫২।

    ৫২ নম্বর রুটের বাসমালিক সমিতির সম্পাদক ভোলানাথ চৌধুরী জানান, “২০১১ সালে রামরাজা মন্দির সংলগ্ন ঘিঞ্জি এলাকা থেকে ঐতিহাসিক বাসস্ট্যান্ড তুলে নিয়ে আসা হয় কিছুটা দূরে রামরাজাতলা বাজারে। সরকারি তহবিলের টাকায় তৈরি হয় নতুন বাসস্ট্যান্ড। যদিও বর্তমানে টোটো-অটোর চাপে বাসের বাজার মন্দা, উপরন্তু ডিজেলের দাম বৃদ্ধি, বাস মালিকেরা বাধ্য হয়েই তুলে নিচ্ছেন বাস।”

    নিত্যযাত্রী স্বপন গঙ্গোপাধ্যায় জানান, “আমি রোজই এই বাসে অফিস যাই, ধর্মতলা থেকে ফিরিও এই বাসেই। তবে, রাতের দিকে বাস পাওয়া যায় না। পুরোনো ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে গেলে সবার আগে উচিৎ পরিষেবা উন্নতির দিকে নজর দেওয়া।”

    ঐতিহ্যের ভারে যেমন গর্ব আছে, তেমনই ঐতিহ্য বহনে দায়ও আছে বিস্তর। জানা যায়, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে এই রুটে ৪২টি বাস চলত। এখন সেই সংখ্যা ২৯টিতে এসে ঠেকেছে। একদিকে মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে নতুন যানবাহনের আধিক্য, এসবের চাপেই আজ ধুঁকছে শতাব্দীপ্রাচীন বাসটি। কিন্তু তবুও থামেনি পথ চলার গতি। করোনার দোলাচল ছাড়া ১০০ বছরে একবারও বন্ধও হয়নি এই বাস রুট। ঐতিহ্য আর আধুনিকতার দ্বন্দ্বে টিকে থাকার লড়াইয়ের পথে আজও ৫২ নম্বর বাস রুটের একটাই মন্ত্র “চরৈবতি, চরৈবতি”।

    ছবি সৌজন্যে – কলকাতা-বাস-ও-পিডিয়া ফেসবুক গ্রুপ।

    Tags:

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @