মানুষের বদল হয়, শুধু বদলায় না হাওড়ার কারখানা-জীবনে বিশ্বকর্মা

পুকুরের ধারে ঘর। জানলার ঠিক নিচেই গায়ে গা লাগিয়ে জল ছিল এত দিন। মাঝে মাঝে সাপ উঠত। টানা বর্ষায় পুকুরের ভরা গর্ভ। ধারে ধারে বিছানো কচুরি পানা, সে দিকে তাকিয়ে মালতি ভাবে কচুরি পানায় ঠিক কবে যেন ফুল ধরে! ভাবতে ভাবতে বটিতে ফল কাটতে থাকে সে। বর্ষার মেঘ কেটে ঘর আজ ঝলমল করছে রোদে। দু চারটে ফল সম্বল। বেশি কিনবে রেস্ত কই! দামের ঝাঁজে হাত পুড়ে যায়; বিশ্বকর্মা ঠাকুরের পট তাক থেকে নামিয়েছে স্বামী শ্রীকান্ত। পটের বিশ্বকর্মাকেই মালা চন্দনে পুজো করবে। তারপর সেই প্রসাদ মালতি দিয়ে আসবি ঘরে ঘরে। কেউ যেন বাদ না পড়ে! এ তাদের সম্বৎসরের নিয়ম। পুজো করেই শ্রীকান্ত দৌড়বে কারখানায়। এই একটা দিনেই তার পড়শিরা বলে ‘শ্রীকান্ত পুজো করে’। মালতি এই একটা দিন বলে ‘আমরা চক্কতি’। তার স্বামী ভোর থেকে একবেলা কাঠের কাজ করে। তক্তা, দেরাজ, আলনা বানায়। বাকি বেলা লেদ মেশিনের লেবার। লোকে বলে ‘শ্রীকান্ত মিস্ত্রি’। দেশ থেকে এসেছে শহরে।
বুড়ো নিমগাছের তলায় মালতিদের ঘরের গায়ে এমন পর পর ঘর। লাল টালির চাল, দরমার দেওয়াল, মেঝেতে মাটি। এ ঘরের বাসিন্দারা কেউ পুলি মিস্ত্রি। কেউ টুল মিস্ত্রি। কেউ বা ঢালাই কারখানার। ঘরে ঘরে আজ পুজো। এ ঘরের ফল যায় ওঘরে। পাল্টাপাল্টি চলতে থাকে। বাবুরা এই ঠিকানাকে বলে ‘ঘাট পাড়া’ একটি চেপে বস্তি।
বাবুদের ফ্যাক্টরিতে পুজো হয়। তাই নিজের ঘরের পুজো মিটিয়েই চলে আসতে হয় কাজের জায়গায়। মেশিন নাই বা চলল তা বলে কাজ আজ কম না! কয়েকদিন ধরে ফ্যাক্টরির অন্দরে চট আর শনের কী ডিম্যান্ড! তেলকালি মাখা ছেঁড়াখোঁড়া ন্যাতাপোতার স্তুপ জমতে থাকে কারখানার বাইরে রাস্তার ওপর। সারা বছর চলে ক্লান্ত মেশিনগুলো ঝকঝকে হয়ে ওঠে পুজো পাবে বলে। এক কণাও তেলকালির গ্লানি নেই। ফিস্টের মেনুর লিস্ট লেখা হয়। বিরিয়ানির অর্ডার। মিষ্টির প্যাকেট চাই। ডিজে বক্স এলিডি চুমকির চমকে চেনাই যায় না রোজকার সেই আধো অন্ধকার স্যাঁতস্যাঁতে জায়গাটাকে। মেশিনের এক ঘেঁয়ে আওয়াজের বদলে সারাদিন শুধু অরিজিত-শ্রেয়ার গলা। হস্তী বাহন দেবতার হাতে ধরা পেটকাঠি চাঁদিয়ালগুলোর দিকে তাকিয়ে বুকের মধ্যে চিনচিন করে ‘পুজোর বোনাস’!
শিল্পনগরী হাওড়ার উৎসব শুরু হয় যে এই দিনটা থেকেই। সকালে কল কারখানায় পুজো পর্ব মেটার পর আসে বোনাস পর্ব। সেই পর্ব আগের দিনও আসতে পারে। কর্মী শ্রমিকদের সাপ্তাহিক পারিশ্রমিক মিটিয়ে দেওয়ার বোনাস তাদের পুজোর আনন্দ।
কদমতলা অঞ্চল মূলত গ্রাম দিয়ে ঘেরা এক শহর। তার গায়ে পলাশীর ইতিহাসের দাগ আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লোহার চাহিদা বদলে দিয়েছিল কদমতলাকে। অঞ্চল বিখ্যাত হয়ে উঠল ‘কারখানা পাড়া’ হিসেবে।
হাওড়া শিল্পাঞ্চলের একেবারে মাঝখানটিতে কদমতলা অঞ্চল। হাওড়া ময়দানকে প্রাণকেন্দ্র ধরলে তার দু’দিকে দুই বাহুর মতো কদমতলা ও সংলগ্ন অঞ্চল এবং অন্যদিকে জিটি রোড বরাবর শিবপুর। একদিকে লোহা লক্কড়ের ঢালাই, লেদ ইত্যাদি ভারি শিল্পের আধিক্য অন্যদিকে পরপর জুটমিল, ফ্লাওয়ার মিল। গঙ্গার পাড় ধরে গড়ে ওঠা কল অঞ্চল। দুই অঞ্চলের চরিত্রের তফাৎও দেখা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ রাতারাতি বদলে দিয়েছিল এই জনপদকে। কদমতলা অঞ্চল মূলত গ্রাম দিয়ে ঘেরা এক শহর। তার গায়ে পলাশীর ইতিহাসের দাগ আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লোহার চাহিদা বদলে দিয়েছিল কদমতলাকে। অঞ্চল বিখ্যাত হয়ে উঠল ‘কারখানা পাড়া’ হিসেবে।
বড়ো বড়ো কারখানা, তার ফাঁকে সরু সরু গলি, বেলা থেকে বিকেল লোহাচুরের গন্ধ, ট্রলি ভ্যানের দাপাদাপি চিনিয়ে দেয় এই সেই শেফিল্ড শহর!
মার্টিনের লাইট রেল বিপ্লব এনেছিল এ শহরে। আজও শহরের বুকে কান পাতলে শোনা যায় সেই গল্প।
রোগ, বন্যা, দুর্বিপাকে বিপন্ন গাঁ ঘরের মানুষ সেই রেলপথ ধরেই কর্ম সংস্থানের দায়ে শহরে এসেছিল একদিন। বাচ্চা থেকে বুড়ো। দেশভাগ নয়, পেট আর জীবিকার দায়ে ছিন্নমূল। শহরে এলে কিছু একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। কোনও উপায় না হলে ভরসা লেদ মেশিনে হাতের কাজ। দেশে পড়ে থাকত জমি জিরেত, হাল, বলদ, গোধূলি জীবন। এসব তখন ফি শনিবারের স্বপ্ন। অনেকের স্বপ্ন বদলে যেত ‘নিজের কারখানা’র স্বপ্নে। মানুষের বদল হয়, শুধু বদলায় না কারখানার জীবনে বিশ্বকর্মা।
সময় বদলেছে। বদলেছে শহরের মানচিত্র। কিন্তু বিশ্বকর্মা পুজোর আয়োজন এ অঞ্চলে এখনই আগের মতোই। বিশ্বকর্মা পুজোর বাজার বসে। সিংহবাহনের দেবী নয়, হস্তী বাহনের জন্য। ভিড় আর ভিড়। কোথাও জাঁক বেড়েছে, কোথায় কমেছে তবে সে আছেই। মাঠের কাশফুল অর্ঘ্য হয়ে সেজে ওঠে দেবশিল্পীর আরাধনায়। শিফট শুরুর সাইরেনের বদলে আজ শুধুই কাঁসর ঘণ্টা বাজার দিন।
বুড়ো রান্নার প্রসাদ খেয়ে সদ্য পাওয়া বোনাসের টাকায় পরিবার নিয়ে পুজোর বাজার করতে যায় শ্রীকান্ত। কাছেই হাওড়া ময়দান। রোজ তো দুঃখ আছেই, বছরের এই একটা দিন সত্যি সত্যিই ভালো থাকতে চায় সে...