No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    সুমনের গানে কত জন্মের স্মৃতি, বিপ্লব, প্রেম, দ্রোহ

    সুমনের গানে কত জন্মের স্মৃতি, বিপ্লব, প্রেম, দ্রোহ

    Story image

    বীর সুমনের গান তাহলে আমি কোন বয়সে প্রথম শুনি? কোথায় শুনি? এই কথা আলাদা করে মনে নেই। বাড়িতে ছিল অন্যরকম আয়াসহীন গানের পরিবেশ। ঠাকুমা-দাদিমার অনর্গল গানের ঝরনাতলা ছিল গলায়। আর ছিল এক বেতারযন্ত্র। পথেঘাটের মানুষজনের গানের গলা। এরা স্বজন।

    গান শোনার এই ভুবনের দুয়ার পেরোইনি খুব একটা। নিজে নিজেই নিজের উঠোনে গানের গাছপালা লাগিয়েছি। সেই উঠোনের বেড়া বাঁধার কাজে সুতো এগিয়ে দিতে নতুন কোনো গান আসেননি, আপনমনে থেকেছি, গান শুনে শুনে ঘোর কাটত না বলে মানুষের থেকেও গানের কাছে বেশি থেকেছি। গানের কাছেই ঘরবসতি।

    এর আগে সোনার কেল্লা দেখেছি, মুকুলের জাতিস্মর গল্প, ঠাকুমার মুখে শুনেছি মানুষের আগের জনমের গল্প, কিন্তু এমন আকুল হয়নি তো আগে, এমন বিধুর হইনি তো আগে, একটি গান দু-হাত দিয়ে ধরে আছে মঙ্গলকাব্য, জাতককাহিনী, সারা পৃথিবীর জল-হাওয়া-মাটি, কত কত জন্মের স্মৃতি, বেদনা, মৃত্যু, বিপ্লব, প্রেম, দ্রোহ।

    এর মধ্যে সুমনের গান কীভাবে জীবনে প্রবেশ করল? বড়ো একটা আয়না। শবরী সিনেমা হলের সেলুন। কাঠের চেয়ারে বসে চুল কাটছেন নরসুন্দর। পাশে পরোটার দোকানের সুবাস। লটারি বিক্রি হচ্ছে। এমএম চ্যানেলে শোনা দুটি গান স্মরণীয় হয়ে আছে। এক, ও গানওয়ালা। দুই, পেটকাটি চাঁদিয়াল। বেজে ওঠা প্রথম সুমন। খুন হলাম।

    এই দুটি গান আমার চোখে নতুন স্বপ্ন এনেছিল। যেভাবে ভেবেছিলাম একদিন কবিতা লিখে সমাজ বদলাব, তেমন। কেমন রক্ত মৃদু-জ্বালা ধরিয়ে দেওয়া গান। কিন্তু উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষে গ্রীষ্ম বিধুর সন্ধেয় জাতিস্মর শোনার অভিজ্ঞতা আমার সর্বস্ব বদলে দিয়েছিল। এ এক অন্যরকম বদল। তখন আমরা বন্ধুরা বৈকালের গঙ্গায় গিয়ে বসি। এদিক ওদিক ঘুরি। গল্পগুজব করি। রাত বাড়লে ফিরে আসি।

    তখন ছোট্ট ছোট্ট ফোন। ঝাপসা ঝাপসা ছবি ওঠে। অল্প কিছু গান শুনি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। সামান্য মেমোরি। অল্পই গান রাখতে হয় ফোনে, কিন্তু বারে বারে শুনতে হয়। কেমন একটা হাওয়া ওঠে বয়ঃসন্ধির ওই সময়ে। একজনের কাছ থেকে অন্যজনের গান নিতে হলে ব্লু-টুথ ভরসা। গান চুপচাপ পাঠাতে বসিয়ে অপেক্ষা করতে হত। এই অপেক্ষাটা জরুরি এখন, বুঝি, হাড়েহাড়ে বুঝি, মজ্জায়-মজ্জায় বুঝি।

    সুমনের জাতিস্মর গানটি ডাউনলোড করিয়েছি। ভিক্ষা চেয়ে নিয়েছি গান। তিনজন বন্ধু বসে আছি একটি নৌকায়, বাঁধা নৌকা, নলখাগড়া বন পাশে। একটু দূরে শ্মশান। ওরা তিনজন নৌকার ওধারে। একপাশে আমি একেবারে একলা। শুরু হল গান। গান চলছে। এতদিনের শোনা সমস্ত গানে লাগছে টান। বুকের ভিতর কেমন যেন করে উঠছে। এর আগে সোনার কেল্লা দেখেছি, মুকুলের জাতিস্মর গল্প, ঠাকুমার মুখে শুনেছি মানুষের আগের জনমের গল্প, কিন্তু এমন আকুল হয়নি তো আগে, এমন বিধুর হইনি তো আগে, একটি গান দু-হাত দিয়ে ধরে আছে মঙ্গলকাব্য, জাতককাহিনী, সারা পৃথিবীর জল-হাওয়া-মাটি, কত কত জন্মের স্মৃতি, বেদনা, মৃত্যু, বিপ্লব, প্রেম, দ্রোহ।

    “দুঃখ পেয়েছ যতবার জেনো আমায় পেয়েছো তুমি
    আমি তোমার পুরুষ আমি তোমার জন্মভূমি।
    যতবার তুমি জননী হয়েছ ততবার আমি পিতা
    কত সন্তান জ্বালালো প্রেয়সী তোমার আমার চিতা।”

    ওমন গলায় সুমন যখন গাইছেন এই কটি লাইন, তাকিয়ে দেখি শ্মশানে প্রকৃত অর্থেই হলুদ রঙের চিতা জ্বলছে। বুকের ভিতর ধুয়ে যাচ্ছে। রক্তে পৌঁছচ্ছে ঢেউ। গানের চাকা চলে যাচ্ছে আত্মার ভিতর দিয়ে।

    “তোমাকে চেয়েছি ছিলাম যখন অনেক জন্ম আগে
    তথাগত তার নিঃসঙ্গতা দিলেন অস্তরাগে
    তারই করুণায় ভিখারিনী তুমি হয়েছিলে একা একা
    আমিও কাঙাল হলাম আরেক কাঙালের পেতে দেখা।”

    ওমন কাঙালপনার কথা ওমন করে কেউ বলেনি আগে। দূরে চিতার দাউদাউ শিখা। সন্ধ্যাতারা উঠেছে। সেই প্রথম দিন শোনা এই গানটির আশ্চর্য অনুভব এতদিন পরেও ম্লান হয়নি, আকাশের দিকে থাকে থাকে উঠে যাওয়া সোনার রথের মতো মেঘ, আর তার নীচে বসে যে অনুভব হয়েছিল তা আজও ধরে রেখেছে মন। প্রেক্ষিত বদলে শুধু নতুন নতুন স্তর এসে জুড়েছে।

    পরে শুভময় নামের এক বন্ধু বলেছিল, জাতিস্মর গানের নদীদের কথা। নদীর পাশে পাশে কবিদের বসতি। গাঙুরে মনসামঙ্গলের কবি, কাবেরীজলে ভেলা ভাসানোর কারিগর নজরুল, কোপাইতীরে রবীন্দ্রনাথ, কপোতাক্ষর ধারে মধুসূদন। বন্ধুরা এভাবে নতুন দৃষ্টি দেয় দেখার। প্রথম ভালোবাসার সময়ে, প্রথম বিচ্ছেদে উভয় সময়েই এই গান আয়ুধ ও বর্মের মতো ব্যবহার করেছি নিজেকে বাঁচাতে।

    ক্যানিং সংলগ্ন অঞ্চলে বেশ কিছুদিন ছিলাম। তখন ঘুম না আসা রাতে জাতিস্মর গান জন্মান্তরের আঙুলে আমায় ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। কাঙাল মানুষের ভর জাতিস্মর গান। গানটি থাকবে আমার সাথে, জীবনভর।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @