No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    বসন্তের আবাহনে কেমন প্রস্তুতি নিলো এবারের বোলপুর?

    বসন্তের আবাহনে কেমন প্রস্তুতি নিলো এবারের বোলপুর?

    Story image

    শীত শেষে মন কেমন করা দখিনা বাতাস জানান দেয় বসন্তের আগমন বার্তা । বসন্ত বলতেই আমাদের কানে- প্রাণে বেজে ওঠে সেই অমোঘ শব্দ গুচ্ছ, “বসন্ত আওল রে!/মধুকর গুন গুন, অমুয়ামঞ্জরী / কানন ছাওল রে”, আর এই কথা গুলোই আমাদের মনে করায় মায়াময় শান্তিনিকেতনের কথা। বাঙালির বসন্তোৎসবের (Basanta Utsab) সঙ্গে শান্তিনিকেতনের যোগাযোগ বড়োই নিবিড়। ১৯০৭ সালে রবীন্দ্রনাথের কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনের আশ্রমের বালক বালিকাদের নিয়ে খুব সহজ সরল ভঙ্গিতে বসন্তোৎসবের সূচনা করেন। এই ঘরোয়া বসন্তোৎসব ধীরে ধীরে বাঙালির প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়।

    ‘খোল দ্বার খোল’ দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা এবং তারপর মঞ্চের নাচ-গানের মধ্যে দিয়ে বসন্তকে আগমন করা হয় এবং শেষে ‘রাঙিয়ে দিয়ে যাও’ দিয়ে অনুষ্ঠান সমাপ্তি ও আবির খেলা হয়

    বসন্তোৎসব প্রসঙ্গে ‘বিশ্বভারতী’র প্রাক্তন ছাত্রী এবং ‘পাঠভবন’ -এর বর্তমান শিক্ষিকা শ্রীমতী চন্দ্রানী মুখোপাধ্যায় -এর মতামত আমরা তুলে ধরতে পারি, “আশির দশকে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলাম। তখন খুব ঘরোয়া ভাবে অনুষ্ঠানটা হতো। এখন যেমন সংগীতভবনের মঞ্চে মহড়া হয়। তখন এরকম কোন চল ছিল না। আমরা নিজেরাই বলতাম আমরা নাচ করবো এবং কোন বন্ধুর সঙ্গে নাচবো সেটাও নিজেরাই বেছে নিতাম। তারপর রঙিন কাগজ মুড়ে সুন্দর লাঠি তৈরি করে নিতাম। কিন্তু এখন সে রকমটা আর হয় না। শোভাযাত্রার নাচেরও মহড়া হয় এখন। সাজেও একটা পরিবর্তন আমরা লক্ষ্য করি আজকাল। ফুল কিংবা পাতার গয়না বদলে এসেছে আধুনিক পরিশীলিত ধরণ। তবে অনুষ্ঠান সূচির কোন পরিবর্তন তেমন দেখা যায়নি । ‘খোল দ্বার খোল’ দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা এবং তারপর মঞ্চের নাচ-গানের মধ্যে দিয়ে বসন্তকে আগমন করা হয় এবং শেষে ‘রাঙিয়ে দিয়ে যাও’ দিয়ে অনুষ্ঠান সমাপ্তি ও আবির খেলা হয়। বহিরঙ্গের নানান পরিবর্তন বারবার ঘটলেও মূল অনুষ্ঠানের কাঠামোটা মোটামুটি একইরকম থেকেছে।”

    সেকালের শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসব

    ২০২০ থেকে কোভিড -এর কারণে বিশ্বভারতীর মূল বসন্তোৎসব বন্ধ থাকলেও বসন্তোৎসবে সাধারণ মানুষের শান্তিনিকেতনে ভিড় করার কোনোও কমতি নেই। বিশ্বভারতীর (Visva-Bharati) বসন্তোৎসবের পরিপূরক হিসেবে বোলপুরের বিভিন্ন জায়গায় ছোটো করে বসন্তোৎসব পালিত হয়েছে গত বছর । এবছরেও সেই প্রস্তুতি চলছে জোরকদমে। জামবুনি সর্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটির পক্ষ থেকে দুর্গোৎসবের মাঠেই অনুষ্ঠিত হবে বসন্তোৎসব। এই বসন্তোৎসবের মূল অনুষ্ঠান পরিচালনায় আছেন সুকান্ত বাগদি এবং তাঁর ‘নটরাজ নৃত্য কলা মন্দির’ -এর সদস্যবৃন্দ। আছেন কৃষ্ণা হাজারা এবং তাঁর ‘নৃত্যায়ণ’-এর সদস্যরা। এবং সংগীত পরিচালনায় আরতি ঘোষ এবং তাঁর ছাত্রছাত্রীরা। এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী দেবিকা দাস কাহালি জানিয়েছেন, “শান্তিনিকেতনের ঐতিহ্যকে সামনে রেখেই আমাদের এই বসন্ত বন্দনা। সকাল সাতটা থেকে আমাদের অনুষ্ঠান শুরু। আবার সন্ধেবেলাও শান্তিনিকেতনের ঐতিহ্যকেই মাথায় রেখেই আমাদের এখানে নৃত্যনাট্য ‘মায়ার খেলা’ পরিবেশিত হবে।”

    একালের প্রস্তুতি

    বর্তমানে বোলপুর (Bolpur) শান্তিনিকেতনের মূল আকর্ষণের কেন্দ্র বিন্দু হলো সোনাঝুরি। সোনাঝুরিতেও চলছে বসন্তোৎসবের প্রস্তুতি। তবে এখানে বিশেষ কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন নেই। মানুষের আবির খেলা দিয়েই  এখানে বসন্তোৎসব পালিত হবে। তবে সোনাঝুরির মূল আকর্ষণ ‘সোনাঝুরির হাট’ও বসবে এইসময়। সোনাঝুরি (Sonajhuri) সংলগ্ন রিসর্টগুলিতে বাউল এবং আদিবাসী নৃত্যের আয়োজন করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। সোনাঝুরি সংলগ্ন একটি রিসর্ট-এর কর্মী রাকেশ যশ জানিয়েছেন, “আমাদের রিসর্ট-এর সমস্ত ঘর এই দোলের কয়েকদিন ভর্তি রয়েছে। শকুন্তলা, দুর্গাবাড়ি, রাম শ্যাম, ক্রিস্টাল, রোশনাই, এইসব রিসোর্টগুলিও পুরোপুরি ভর্তি রয়েছে। এই কদিনের মানুষের উপচে পড়া ভিড়ের ফলে যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে তার ব্যবস্থাও নিয়েছে হাটের কমিটি । গেস্টদের গাড়ি পার্কিং -এর ব্যবস্থাও করা হয়েছে আলাদা করে।”

    আবেগের আর উচ্ছ্বাসের বহিঃপ্রকাশে ক্ষতি হচ্ছে আমাদের চেনা প্রকৃতির। হারিয়ে যাচ্ছে পলাশ, শিমূল গাছ। ঐতিহ্যকে বয়ে নিয়ে যেতে প্রকৃতিকে বাদ দিলে যে লাভ হবেনা কিছুই, সেকথা জানাতে চেষ্টা চালাচ্ছে বিশ্বভারতীর ছাত্রছাত্রীরা।

    তাই বিশ্বভারতীর বসন্তোৎসব না হলেও মানুষের উৎসাহের কোনো কমতি এখানে দেখা যাচ্ছে না। এমনকি বাণিজ্যক দিক দিয়েও তেমন কোনো ক্ষতি হচ্ছে না এমনটাই বলা যেতে পারে। এইসব কিছুর পাশাপাশি কলকাতা নবনালন্দা এবং শান্তিনিকেতন নবনালন্দা ও  EZCC -এর যৌথ প্রয়াসে চারদিন ব্যাপী বসন্তোৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘সৃজনী, শান্তিনিকেতন’-এ। ‘শৈলী, শান্তিনিকেতন’-এর কর্ণধার শ্রী সুজিত ঘোষ জানিয়েছেন, “এই ধারাবাহিক অনুষ্ঠানের শেষদিনে আমরা রবীন্দ্রনাথের একটি রূপক ধর্মী নাটক ‘মায়ার খেলা’ পরিবেশন করছি। আমার গুরু শ্রীপর্ণা ভট্টাচার্য রয়েছেন সংগীত পরিচালনায় এবং নৃত্য পরিচালনার ভার রয়েছে আমার উপরেই।”  

    বসন্ত উৎসবের প্রস্তুতি চলছে জোরকদমে

    বিক্ষিপ্ত ভাবে বিভিন্ন জায়গাতে শান্তিনিকেতনের (Shantiniketan) বসন্তোৎসবের ট্রাডিশনকে ধরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে ঠিকই কিন্তু কোথাও গিয়ে যেন ছন্দ পতন ঘটেই যাচ্ছে। শুধুমাত্র কোভিড পরিস্থিতির কারণে বিশ্বভারতীর বসন্তোৎসব বন্ধ হওয়ায় এই ছন্দ পতন ঘটেছে এমনটা মোটেই নয়, প্রাচীন বসন্তোৎসবের যে উদ্যমটা ছিল, সেটাও যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে। বিশ্বভারতীর দুই যুগের দুই ছাত্রছাত্রীর কথাতে এই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশ্বভারতীর বিদ্যাভবনের প্রাক্তন ছাত্রী শ্রীমতী নীতা কাহালি জানিয়েছেন, “আমাদের সময় গৌরপ্রাঙ্গনে অনুষ্ঠান হতো, গাছের গুঁড়িগুলোকে ঘিরে প্রভাত ফেরি হত। তখন মানুষের মধ্যেও অনুষ্ঠান দেখার আগ্রহ ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাবীন্দ্রিক ব্যাপারটা যেন হারিয়ে যাচ্ছে।” বিশ্বভারতীর বাংলা বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র সৈকত বালা বর্তমানে রবীন্দ্র সংগীত নিয়ে সংগীতভবনে (SangitBhabana) পাঠরত। তিনিও জানাচ্ছেন, “মানুষ এখন শুধুমাত্র আসার জন্যেই শান্তিনিকেতনে বসন্তোৎসব কাটাতে আসে। এটাই যেন ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশৃঙ্খলার কথা আর নাইবা বললাম।”

    আবেগের আর উচ্ছ্বাসের বহিঃপ্রকাশে ক্ষতি হচ্ছে আমাদের চেনা প্রকৃতির। হারিয়ে যাচ্ছে পলাশ, শিমূল গাছ। ঐতিহ্যকে বয়ে নিয়ে যেতে প্রকৃতিকে বাদ দিলে যে লাভ হবেনা কিছুই, সেকথা জানাতে চেষ্টা চালাচ্ছে বিশ্বভারতীর ছাত্রছাত্রীরা। তবুও বিশৃঙ্খলা, ট্রেন্ড, ট্রাডিশন সব মিলিয়ে একটা বিক্ষিপ্ত বসন্তোৎসবের আয়োজন চলছে বোলপুর শান্তিনিকেতনে। আন্তরিকতা কতটা আছে তা বোঝা না গেলেও দিকে দিকে আয়োজনের যে কোনোও ত্রুটি নেই তা দিব্যি বোঝা যাচ্ছে। আর বাঙালির উৎসাহের অভাব যে একটুও নেই তা তো জানান দিচ্ছে উপচে পড়া ভিড়ের ছবিই।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @