গরম ভাতের খিদে এবং সাধুদার হোটেল...

বাড়ি, মিশন এইরকম সবকিছুর কাছাকাছি পাট চুকিয়ে যখন জীবন মেসের দিকে ঝুঁকে পড়ে, সেখানে এই হোটেলগুলোই অগোচরে খেয়াল রাখে সেসব ছেলেমেয়েদের। যেন মায়েদের কোনও গোপন আঁতাতে শহরজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া আছে সন্তানদের খেয়াল রাখার গুপ্তঘাঁটি, তথা ভাতের হোটেল। দূর থেকে মুখ দেখে এঁরা বুঝে যান কার পেটে কিচ্ছুটি পড়েনি কিংবা কে বিস্কুট কেক খেয়ে ভাবছে আজকের বেলাটা চালিয়ে দেবে। আর মফঃস্বলীয় মুখ দেখলে তো কথাই নেই। উপরি প্রলোভন, ঝিমে গলায় ফিসফিস করে- ‘গ্রম ভাত! গ্রম ভাত!’।
পেটে হাত বুলোতে বুলোতে আপনি যত জাকির হোসেন হয়ে উঠছেন, বুঝতে হবে, আপনার গলা থেকে আমির খাঁ সাহিব তত সরে যাচ্ছে। কারণ, আপনার গলায় তখন আওয়াজ মারার শক্তি কই! সুতরাং, পেট কেমন ভাত ভাত করে, ও বঁধূ রে…
অফিস–কাছারির ব্যস্ত এলাকা কেষ্টপুর। তার লাগোয়া সল্টলেক। মাঝে খাল। সেখানে মানুষ দুই সেকেন্ড দাঁড়ালেই বুঝতে পারে, প্রবাদ ভুল, খাল কেটে কুমির নয়, মশক আসিয়াছে! তা যা হোক, বৈশাখী ফুটব্রিজের চেয়েও ব্যস্ত ফুটব্রিজ ২০৬। বাসরুটের নামে। ছোট্ট বাসস্ট্যান্ড ২০৬–এর। তারই এককোণায় ভাতের হোটেল, তার সামনে যিনি দাঁড়িয়ে, একইরকম হাসিমুখ, যা বাসের ভিড়ে খেয়ালই পড়বেই না সহজে। সাধুর হোটেল। আরও বিস্তারে সাধুদার ভাতের হোটেল। ভালো নাম– সুপ্রজিৎ মিস্ত্রী। ভাই শিবাজী। দুই বাউণ্ডুলে, যাঁরা দুশো ছয় মাতিয়ে রেখেছেন। টেকনোপলিসের দিকে মহিষবাথানে বাড়ি, ২০৬–এর সাধু দা আর ওঁর মা সুচিত্রাদেবী দুপুরবেলা হোটেল সামলান। প্রায় ৪০ বছরের পুরনো এই হোটেল। ’৭১–এর মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ ছেড়ে প্রাণ হাতে নিয়ে চলে এসেছিলেন এপারে। ছোট্ট ১০–১২ বছরের সুচিত্রা। সঙ্গে বাবা। দৌড় থামল মহিষবাথানে এসে। সেখানেই বাড়ি। তারপর ব্যবসার খোঁজ।
সল্টলেক তখনও লবণ হৃদ ব্যতীত কিচ্ছু না। উলুবন আর মশার কামড়। ভবিষ্যতের হইহই আর প্ল্যানিং কিছু তো আন্দাজ করেইছিলেন নিশ্চয় সুচিত্রার বাবা! সল্টলেকের পত্তনে যে সব শ্রমিক সম্প্রদায় আসছে, তাদের পেটের ব্যবস্থার কথা ভেবে এই হোটেল শুরু। এখনও মাথার উপর পাখাহীন, হাতপাখার আড়ম্বর। কিন্তু রান্নার মান, খাবারের স্বাদ নিয়ে যে কোনও মানুষকে বোবা করে দিতে পারেন সুচিত্রাদেবী। প্রতি রোববার হয় খাসির মাংস। সে রান্নার সুবাস নিতে নিতে বিভিন্ন রুট থেকে আসা বাস ধুঁকতে ধুঁকতে ঘ্রাণ নিয়ে থামতে বাধ্য হয়। লোক নেমে পড়ে। কন্ডাক্টর বাসভাড়া চায় না। ড্রাইভার, বাসকে একসাইড করে হাতা গোটাতে গোটাতে টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়, ক্ষুধার কাছে পাঞ্জায় ডাহা হারবে বলে। দিনে প্রায় ২০০ জনের নিয়মিত খাওয়া–দাওয়ার আয়োজন।
আরও পড়ুন
বুদ্ধির গোড়ায় ফেলুদার সরবত
বাস স্ট্যান্ডের পাশে ড্রাইভার–কন্ডাক্টর–যাত্রীদের ‘পেট–রোল পাম্প’ বটে এই সাধুদার দোকান। যদিও সাধুদা, নিজের নামে দোকান বলতে রাজি নন। ‘দোকান তো মায়ের। আমরা কর্মী মাত্র’। এই ছিল তাঁর একমুখ পান নিয়ে লালকেল্লা হাসি।
ভাতের সঙ্গে এক–একদিন এক–এক রকম মাছ তো থাকেই, তার সঙ্গে সর্ষে বাটা স্পেশাল। কিন্তু দাম আপনার হাতের এতটাই মুঠোয় যে, মনে হবে আঙুলের ফাঁক দিয়ে গলে গেল বুঝি। খিদের চোটে আর খাবারের সুবাস আপনাকে প্ররোচিত করবে সেদিকে এগিয়ে যেতে। বাঙাল–ঘটি মিলেমিশে একাকার সাধুদার হোটেলে। সাধু শান্ত হয়ে খেতে বসতে বাধ্য আপনাকে করাবেই। কারণ, দরমা দেওয়া দেওয়ালের গায়ে কালী ঠাকুরের ক্যালেন্ডারের পেছনে ফোন ঝুলিয়ে রাখা। আর শ্যামা সঙ্গীত বাজছে– রসনা রসনা কেমন শ্যামা নামে তে…
আপনি কোন রসনা খুঁজে নেবেন, আপনার দায়িত্ব।
কত কী বলার ছিল যে–
রাস্তার হোটেল মানেই– অম্বুজা সিমেন্টের আটা, তারই রুটি বা বুলেটপ্রুফ পরোটা, ঠান্ডা হয়ে গেলে বিগবাবুল, গান ফ্যাক্টরি থেকে আসা চানা ছোলা– বমি হলেই ঠাঁই ঠাঁই ক’রে বেরোবে, হার্ডওয়ার স্টোর্স থেকে আসা চাল– খেতে গিয়ে মনে হবে এর চেয়ে বালিও সেদ্ধ হয়ে যেত ইত্যাদি। নিশ্চয় মনে হচ্ছে, খাবার না স্যুররিয়ালজম!
তা বন্ধুরা, সালভাদোর শুধু ডাল–ই, আমরা তো ভাত-ডালও। সাধুদার হোটেল সেসব ধারণা আর সুররিয়ালিটিকে নোড়ার একঘায়ে পিষে দেন। ঢিলছোঁড়া দূরত্বেই ওদেরই পান গুমটি। সাধুদার ঠাকুমা বসেন এখনও। খাওয়ার শেষে পান, পান মশলা, সিগারেট নামক হজমি, এইসেই তো রইলই।