No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    পানিহাটি নামের ইতিহাস নিয়ে কতই না ধন্দ

    পানিহাটি নামের ইতিহাস নিয়ে কতই না ধন্দ

    Story image

    সেই ব্রিটিশ আমলের কলকাতা। ডেঙ্গুর বিভীষিকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে গোটা শহরে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বয়স তখন মাত্র দশ বছর। দেবেন্দ্রনাথ তাঁর গোটা পরিবারকে কলকাতার বাইরে নিয়ে এলেন। উঠলেন পানিহাটির এক বাগানবাড়িতে। গঙ্গা দেখা যায় বাড়ি থেকেই। এটাই রবীন্দ্রনাথের প্রথম কলকাতার বাইরে আসা। মহানগরের ঘিঞ্জি কোলাহলময় পরিবেশ থেকে প্রথমবারের মুক্তি। অনেক পরে ৭৬ বছর বয়সে চন্দননগরের মোরান সাহেবের বাগানে রবীন্দ্রনাথ জানিয়েছিলেন যে পানিহাটির বাগানেই তাঁর মন বাইরের প্রকৃতির মধ্যে যথার্থ মুক্তির সন্ধান পেয়েছিল। কখনও জালিয়ানওয়ালাবাগের নরহত্যায় বিক্ষুব্ধ মনকে শান্ত করতে, কখনও বা দেশীয় কটন মিলের উদ্বোধনে প্রধান অতিথি হিসেবে, কখনও বিয়ের নেমন্তন্নে, এখানে রবীন্দ্রনাথ বার বার এসেছেন। শুধু রবীন্দ্রনাথ কেন, চৈতন্যদেব, রামকৃষ্ণ পরমহংস, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি, সুভাষচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায় – কত যে গুণী মানুষ এই জনপদে পা রেখেছেন, তার ইয়ত্তা নেই।

    পানিহাটির ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। বিপ্রদাস পিপলাইয়ের ‘মনসামঙ্গল’, জয়ানন্দের ‘চৈতন্যমঙ্গল’, বৃন্দাবন দাসের ‘চৈতন্য ভাগবত’, কৃষ্ণদাস কবিরাজের ‘শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত’-র মতো পুরোনো সাহিত্যে পানিহাটির নাম পাওয়া যায়। তবে এই জায়গার নামটি কীভাবে এল, তা নিয়ে ধন্দ আছে বিস্তর। কেউ বলেন, পানিহাটির আদি নাম ‘পণ্যহট্ট’। যেহেতু এই জায়গা খুব প্রাচীন কাল থেকেই ব্যবসা বাণিজ্যের এক জমজমাট কেন্দ্র ছিল, তাই ‘পণ্যহট্ট’ নামটি খুব বেশি অসমীচীন ঠেকে না। বর্ধমানের কাটোয়া, দাঁইহাট, কালনা, হুগলির, চুঁচুড়া, ফরাসডাঙা, সপ্তগ্রাম, মেদিনীপুরের তাম্রলিপ্ত – এইসব জায়গা থেকে বড়ো বড়ো মহাজনি নৌকো এসে ভিড়ত পানিহাটির আমদানি ঘাটে। অনেকে মনে করেন, যশোরের বিখ্যাত পেনেটি ধানের সরবরাহ এখান থেকে করা হত বলে, ‘পেনেটি’ থেকেই ‘পানিহাটি’ নামটা এসেছে। আরেকটা মত হল, ‘পণ্যহট্ট’ নয়, পানিহাটির নাম এসেছে ‘পুণ্যহট্ট’ থেকে।

    খুব প্রাচীন কাল থেকেই পানিহাটি ঈশ্বরানুরাগী মানুষজনের কাছে পুণ্যভূমি। গৌড়ের রাজা বল্লাল সেনের আমলে এই অঞ্চল ছিল বৌদ্ধ তান্ত্রিক উপাসনার একটি কেন্দ্র। তারপর শৈব সাধক, তান্ত্রিক কাপালিক, নাথপন্থী ভক্তদের সাধন-ভজনের জন্যও প্রসিদ্ধ ছিল এই জায়গা। চৈতন্যদেবের সময় এই পানিহাটিতে বৈষ্ণব আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পরে। পানিহাটির যে ঘাটে প্রথম চৈতন্যদেব পা রেখেছিলেন, সেটা শ্রীচৈতন্য ঘাট নামে পরিচিত। ১৯০৫ সালের ভূমিকম্পে এই ঘাট ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। তবে যে গাছের নিচে চৈতন্যদেব এবং নিত্যানন্দ বসে ধর্মপ্রচার করেছিলেন, এই ‘অক্ষয় বটবৃক্ষ’ এখনও কালের গর্ভে তলিয়ে যায়নি। গঙ্গার তীরে প্রত্যেক বছর জৈষ্ঠ মাসে দণ্ড মহোৎসব মেলা আর কার্তিক মাসে স্মরণ মহোৎসব মেলা এখনও চৈতন্যদেবের স্মৃতিকে লালন করে চলেছে।

    চৈতন্যদেব সেদিন প্রথম এই পানিহাটিতে এসেছিলেন, তার স্মৃতিতেই বসে স্মরণ মহোৎসবের মেলা। আর দণ্ড মহোৎসবের তো আরেক গল্প। হুগলির সরস্বতী নদীর তীরে কৃষ্ণপুরের জমিদার গোবর্ধন দাসের ছেলে রঘুনাথের অল্প বয়স থেকেই আধ্যাত্মিকতার প্রতি ঝোঁক ছিল। এক সময় তিনি বাবা-মা এবং সবে মাত্র বিয়ে করা বউকে ছেড়ে চৈতন্যদেবের খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে থাকেন। অবশেষে পানিহাটিতে তিনি চৈতন্যদেবের দেখা পান এবং তাঁর কাছে দীক্ষা নেওয়ার আবদার করেন। কিন্তু চৈতন্য তাঁকে দীক্ষা নয়, দণ্ড (শাস্তি) দেন, পরিবারকে দুঃখ দিয়ে সংসার ছেড়ে চলে আসার অপরাধে। কী সেই শাস্তি? ভক্তদের পেট পুরে খাওয়াতে হবে চিঁড়ে-দই-ফল। প্রত্যেক বছর দণ্ড মহোৎসবের মেলায় সেই অভিনব শাস্তিরই উদযাপন হয়। 

    নানা ধর্মের প্রাচীন মিলনভূমি হিসেবেও পানিহাটির খ্যাতি রয়েছে। কাঠিয়া বাবার আশ্রম, ভোলানন্দ গৌড়ীয় মঠ, বালক ব্রহ্মচারী আশ্রম যেমন রয়েছে এখানে, পাশাপাশি রয়েছে মোল্লাহাট মসজিদ, ঘোলাবাজার মসজিদ, মানিক পির কিংবা খোনকা পিরের আস্তানা। বেগম রোকেয়ার সমাধি রয়েছে এই পানিহাটিতেই। গঙ্গার তীরে অনেক অনেক ঘাট পানিহাটির আরেক আকর্ষণ। জহর সাধুখাঁর ছোটো ঘাট, গৌরীমণি দাসের ঘাট, মালাপাড়া ঘাট, শ্রীগৌরাঙ্গ ঘাট, মদন বসুর ঘাট, তাঁতপটি ঘাট, প্যারি বোষ্টম ঘাট – নাম বলে শেষ করা যাবে না। এত বেশি ঘাট রয়েছে এখানকার গঙ্গায়, যে ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকায় যতীন্দ্র মোহন দত্ত লিখেছিলেন, পানিহাটির মতো এতগুলো গঙ্গার ঘাট সম্ভবত বারাণসী ছাড়া আর কোথাও নেই। 

    ছবি সূত্র – পানিহাটি পৌরসভা 

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @