No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    গড়িয়ার সঙ্গে জুড়ে আছে চৈতন্যদেবের স্মৃতি

    গড়িয়ার সঙ্গে জুড়ে আছে চৈতন্যদেবের স্মৃতি

    Story image

    বাড়ির কাছেই আরশি নগর। তবু তাকে চেনা বড়োই মুশকিল। আর এখন তো সে পুরোনো সবকিছুকেই মুছে দিয়ে ঝাঁ-চকচকে। শুধু নামগুলো রয়ে গেছে, এই যা। সেটাও যদি কোনোদিন বদলে যায়, তো একটা সুদীর্ঘ সময় পুরোটাই উপড়ে যাবে। আরশি নগরটির নাম গড়িয়া। নামটুকুতে আজও মধ্যযুগ জুড়ে আছে নিবিড়ভাবে। 

    কলকাতার কাছের জায়গা ছিল বটে। কিন্তু এখন তো গ্রেটার কলকাতার যুগ। বিশাল বপু কলকাতা আশেপাশের সবকিছুই গিলে ফেলছে। তো গড়িয়াও কলকাতা। নিত্যদিনের যাতায়াত এইপথে। নিত্যদিনই দেখা যায়, বাতিল আসবাবের মতো উপড়ে ফেলা হচ্ছে বড়ো বড়ো গাছ। রাস্তা আরো চওড়া হবে৷ হোটেল শপিংমল সিনেমা হল রেস্তোরাঁ তো কত। বিশাল বিশাল অ্যাপার্টমেন্ট। মেট্রো স্টেশন, রেল লাইন। সব তো এই গড়িয়া অঞ্চল জুড়ে। কলকাতা যদি তিলোত্তমা হয়ে থাকে, তো গড়িয়া অঞ্চল তিলোত্তমাতর হয়ে উঠতে চলেছে। কিন্তু মুশকিল হল, ‘কলকাতা’র আড়ালে গড়িয়ার প্রাচীনত্ব যেন চাপা পড়ে যায় বারবার। পুরোনো কলকাতা নিয়ে আলোচনা চলে। কিন্তু এই ঐতিহাসিক স্থানগুলো নতুনের দাপটে বড্ড বেশি ম্লান। 

    গড়িয়া একার্থে ঐতিহাসিক স্থানই। গড়িয়ার ডানা বিছানো রয়েছে বৈষ্ণবঘাটা পাটুলি জুড়ে। মজে যাওয়া আদিগঙ্গার তীরে গড়িয়া। কেউ কেউ বলেন, জরাজীর্ণ যে গড়িয়াখাল, সেটাই আদিগঙ্গার হারানো স্রোতের কিয়দংশ। আজকাল অবশ্য তাকে দেখলে সে কথা কল্পনাতেও আসে না। গড়িয়া নামটির সঙ্গে জুড়ে আছে শ্রীগৌরাঙ্গের স্মৃতি। ১৫১০ সালে শ্রীচৈতন্যদেব শান্তিপুর থেকে রওনা দিয়েছিলেন নীলাচলের পথে। তাঁর যাত্রাপথ ছিল আদিগঙ্গার তীর ধরে। শোনা যায়, গড়িয়া ও পদ্মশ্রীর মাঝামাঝি কোনো এক বিশাল পুকুরের পাড়ে তাঁবু পড়েছিল শ্রীচৈতন্যের। সেখানে গ্রামের ভিতর দিয়ে রথতলায় এসে নদীতে স্নান সেরেছিলেন তিনি। সেখানে নদীতীরেই নাকি ছিল এক মহাশ্মশান। আজ অবশ্য তার অস্তিত্ব মেলে না। 

    মুঘল সম্রাট আকবরের সচিব ছিলেন টোডরমল। সুবাহ বাংলার জরিপ করেছিলেন তিনি। ভাগীরথী নদীর পূর্বতীর থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিশাল এই অঞ্চলকে চব্বিশটি পরগণায় ভাগ করেছিলেন  টোডরমল। সেখানে মেদনমল্ল পরগণার অন্তর্গত ছিল, গড়িয়া, মহামায়াপুর, কামালগাজী - এই অঞ্চলগুলি। এইসব অঞ্চলে বৈষ্ণবপ্রভাব একসময় ভালোই কার্যকর ছিল। বৈষ্ণবঘাটা নামটিও তার সাক্ষ্য দেয়। মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গলে বৈষ্ণবঘাটার নাম মেলে। বণিক ধনপতির পুত্র শ্রীমন্ত সওদাগর যাচ্ছেন বাণিজ্যযাত্রায়। সাগরপাড়ি দিতে, ভাগীরথী নদী ধরে এগোচ্ছে তার তরী। সাগর পেরিয়ে সিংহলের উদ্দেশে যাত্রা। সেখানে পাওয়া যায় –

    “নাচনগাছা বৈষ্ণবঘাটা বামদিকে থুইয়া।
    দক্ষিণেতে বারাসত গ্রাম এড়াইয়া।। 
    ডাইনে অনেক গ্রাম রাখে সাধুবালা।
    ছত্রভোগে উত্তরিল অবসানবেলা”।।

    প্রাচীন জনপদের বর্ণনা। এখনকার মানচিত্রের সঙ্গেও তার মিল পাওয়া যায়। এমনি সুপ্রাচীন ইতিহাস নিয়ে গড়িয়া ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ। গড়িয়া নামের অন্য এক উৎসও অবশ্য কেউ কেউ দিয়ে থাকেন। একসময় সুন্দরবন নাকি বিস্তৃত ছিল একেবারে শিয়ালদহ পর্যন্ত। তো ম্যানগ্রোভ জাতীয় উদ্ভিদ গুরিয়ার আধিক্য ছিল এই অঞ্চল জুড়ে। তা থেকেই নাকি গড়িয়া শব্দের উৎপত্তি। 

    আজও প্রচুর প্রাচীন মন্দির ইমারত এখানে রয়ে গেছে। গড়িয়ার নিকটবর্তী বোড়াল। আদিগঙ্গার তীর সংলগ্ন৷ এখান থেকে উদ্ধার হয়েছিল, ত্রয়োদশ শতকের ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দির। মন্দিরের পূর্বসীমা ধরে কোনো একসময় নদী বয়ে যেত। সেন বংশের কোনো এক সম্রাট এই মন্দির তৈরি করেছিলেন। ১৯৪০ সালে মন্দিরের খননের সময় যেসব প্রত্নসামগ্রী পাওয়া গিয়েছিল, তা খ্রিস্টীয় সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীর। ব্রহ্মপুর বোরাল পাটুলি – এইসমস্ত অঞ্চলই মধ্যযুগের স্মৃতিচিহ্ন বহন করে চলে। তবে মুশকিল হল, প্রাচীন জনপদের স্বীকৃতি  তেমনভাবে মেলে না। যেভাবে এই গোটা এলাকা ‘নতুন’ হয়ে উঠছে, তাতে পুরোনো গল্পগুলোও আর থাকবে কিনা- সন্দেহ হয়।  অন্যদিকে, কলকাতার সীমা বাড়তে বাড়তে কতদূরই না চলে গেল। কিন্তু ‘পুরোনো’ কলকাতার চৌহদ্দির বাইরে এই নতুন কলকাতারও তো সুপ্রাচীন  ইতিহাস আছে। তাতে ঔপনিবেশিকতার স্পর্শও নেই। কিন্তু তা  নিয়ে তেমন আবেগ কাজ করে না- এটা হয়তো আমাদেরই এক দুঃখজনক পরিণতি।
     

    Tags:

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @