ধর্মতলা নামের আড়ালে তিনটি ধর্মের গল্প

কলকাতা শুধু ব্রিটিশ ভারতের পূর্বতন রাজধানীই ছিল না, আধুনিক ভারতের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে সবার আগে চলে আসে এই মহানগরীর নাম। গোটা দেশের মধ্যে এই শহরের মানুষই প্রথম গ্রহণ করেছিলেন পাশ্চাত্য আধুনিকতা। তা বলে আমাদের পুরোনো উত্তরাধিকারগুলোকেও এই শহর ত্যাগ করেনি। বরং ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতাকে সফলভাবে মিশিয়ে হয়ে উঠেছে ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী। সৃজনশীলতার উপযোগী মুক্ত বৌদ্ধিক চর্চায় কলকাতা সারা ভারতের অন্য সব জায়গার থেকে এগিয়ে। এই শহরের একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল পাড়া সংস্কৃতি। এখানকার একেকটা পাড়ায় একেক রকম আমেজ, একেকরকম পরিবেশ। শ্যামবাজারের যে ফ্লেভার, তা আপনি কলেজ স্ট্রিটে পাবেন না, আবার কলেজ স্ট্রিটের যে পরিবেশ, তার বিকল্প পাবেন না গড়িয়াহাটে। আজ কলকাতার একটা বিশেষ অঞ্চলের গল্প আপনাদের বলব। জায়গাটার নাম ধর্মতলা, যা আবার এসপ্ল্যানেড নামেও পরিচিত।
কলকাতার অন্যতম পরিচিত আর জমজমাট অঞ্চল এই ধর্মতলা। জায়গাটা কিন্তু খুবই পুরোনো। একটা সময়ে লালমুখো সাহেবরা বাস করতেন এখানে। তবে এখনকার মতো ঘিঞ্জি ছিল না এই এলাকা। বরং ছিল পরিকল্পিতভাবে সাজানো-গোছানো আর পরিষ্কার। তবে জায়গাটার নাম ‘ধর্মতলা’ হল কীভাবে? এই নিয়ে প্রচলিত আছে অনেকগুলো মত। একটি মত জানিয়েছিলেন রেভারেন্ড জেমস লং। সেই পাদ্রি সাহেব, যিনি ইউরোপিয় হয়েও রুখে দাঁড়িয়েছিলেন ইংরেজ শাসকদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে। লং সাহেব মনে করতেন, এখন যেখানে ধর্মতলায় এখন যেখানে টিপু সুলতান মসজিদ, আগে তার পাশে একটা ঘোড়ার আস্তাবল ছিল। সেই আস্তাবলের জমিতে আরেকটা মসজিদ বানানো হয়েছিল, যেটা আর নেই। সেই মসজিদের প্রথম কারবালার সমাবেশ হত মহানগরে। এরকম ধর্মীয় পরিবেশ ছিল বলেই জায়গাটার নাম ধর্মতলা হয়েছে। সেই মসজিদ এখন আর নেই। অন্যদিকে ডাঃ হর্নেল সাহেব একটা অন্য ব্যাখা দিয়েছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, জানবাজার এলাকায় বৌদ্ধদের একটা বসতি ছিল। তারা বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান করতেন, সেখান থেকেই ধর্মতলা নামটা এসেছে।
তবে এখনকার গবেষকদের অনেকেই মনে করেন, ধর্মতলা নামের সঙ্গে গ্রামবাংলার উপাস্য দেবতা ধর্মঠাকুরের একটা যোগ আছে। তিনি রাঢ় অঞ্চলের দেবতা। একটা সিঁদুর মাখানো এবড়োখেবড়ো পাথরের টুকরোতে পুজো হয় তাঁর। বাউড়ি, বাগদি, হাড়ি, ডোম জাতির মানুষেরা এই দেবতার উপাসক। একদল নিন্মবর্গের মানুষ জানবাজার অঞ্চলে বসবাস করতেন একসময়ে। তাঁরা ধর্মঠাকুরের পুজো করতেন, সেই দেবতার একটা মন্দিরও বানিয়েছিলেন সেখানে। পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী দেখেছিলেন সেই মন্দির। বিনয় ঘোষ জানিয়েছেন, এখানে মহাসমারোহে ধর্মঠাকুরের পুজো হত, গাজন হত, মেলা বসত – সব মিলিয়ে একটা জমজমাট উৎসব এখানে চালু ছিল।
আরও পড়ুন
প্রথম বাঙালি কোটিপতির গল্প
ধর্মতলা জায়গাটার একদিকে ছিল ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ, আরেকদিকে ছিল জনবসতি। দুর্গ আর শহরের মাঝখানের জমিকে ইংরেজিতে বলে এসপ্ল্যানেড। যে কারণে ধর্মতলা সাহেবদের মুখে এসপ্ল্যানেড নামেও পরিচিত হয়ে উঠেছিল। এখানে আগে মেম্বা পিরের বাজার ছিল বলেও জানা যায়। পরে হগ সাহেবের বাজার চালু হলে পুরোনো এই বাজারের প্রতিপত্তি কমে যায়।
তথ্যঋণ – Bangla Live, The Bengal Story.
ছবি কৃতজ্ঞতা – সুমন সাধু