বেলডাঙা নামের আড়ালে বর্গি আক্রমণের ইতিহাস

অনেক অনেক আগে মুর্শিদাবাদ জেলায় ভাগীরথীর পুব দিকে গোটা বাগড়ি অঞ্চল সমুদ্রের তলায় ছিল। পরবর্তীকালে প্রকৃতির খেয়ালে সমুদ্র দক্ষিণে সরে গেলে তৈরি হয় এই জায়গাটা। ওখানকার মাড্ডা গ্রাম থেকে ১৯৯৫ সালে পাওয়া গিয়েছিল জলহস্তীর মাথার খুলি, যেটা প্রত্নবিদদের মতে প্রায় ২০,০০০ বছরের পুরোনো। এখনও বাগড়িতে ছোটোবড়ো অনেক নদী আর জলাশয় দেখা যায়। ডুমনিদহ বিল, ভাণ্ডারদহ, পাটবিল, সুজাপুর দামোস, সুজাপুর বাঁওড়, প্যাঁচাই খাল, কুনির বিল, আঁইশঘাটি বিল, সেনদুরি বিল – কখনও স্পষ্ট, কখনও প্রচ্ছন্ন হয়ে গোটা জায়গায় রয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। বেলডাঙা এই বাগড়ি অঞ্চলেরই শহর ও পৌরসভা এলাকা। কিছু হারিয়ে যাওয়া কিংবা শুকিয়ে যাওয়া নদী দেখা যায় বেলডাঙাতেও।
যতদূর জানা যায়, একটা সময় বেলডাঙা পড়ত নাটোরের জমিদারি সীমানার ভেতরে। তারপর ১৭৬০ সাল পর্যন্ত আশেপাশের ১১৬১ বর্গমাইল নিয়ে এই এলাকা হয়ে উঠেছিল সেই সময়ের মুর্শিদাবাদ তথা বাংলায় সবথেকে ধনী ব্যবসায়ী পরিবার জগৎ শেঠদের খাসতালুক। বেলডাঙার পশ্চিমে এখনও দেখা যায় সুজাপুর-মির্জাপুর গ্রামের ওপর দিয়ে যাওয়া নবাবি সড়কের ক্ষয়িষ্ণু চিহ্ন। মুর্শিদাবাদের নবাব আলিবর্দি খাঁর শাসনকালে বাংলায় ঘটেছিল বর্গি আক্রমন। ১৭৪১ থেকে ১৭৫১ সাল পর্যন্ত বার বার মারাঠা বর্গিদের লুঠপাট বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনে এতটাই ধ্বংস এবং দুঃখ বয়ে এনেছিল যে ছোটোদের ঘুমপাড়ানি গানে তার প্রভাব রয়ে যায়, “ছেলে ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো, বর্গি এল দেশে”। এই রকম পরিস্থিতিতে ভাগীরথী গঙ্গার পশ্চিম তীরের রাঢ় অঞ্চল থেকে বেশ কিছু অবস্থাপন্ন পরিবারের মানুষজন বাঁচার তাগিদে নদী পেরোতে বাধ্য হন। আশ্রয় নেন চার কিলোমিটার পূর্বের একটা পরিত্যক্ত জলভূমির পাশে উঁচু এক জমিতে। এভাবেই জনবসতি গড়ে ওঠে এখানে। মুঘল আমলে ভাগীরথীর ধারে বাঁধ দিলে এখানকার জলাভূমি আলাদা হয়ে গিয়ে বিল তৈরি হয়েছিল। আগে এই ডাঙাজমিটা ছিল একটা বালির চড়া। মানুষের বসতি গড়ে উঠলে এই বালির ডাঙা অঞ্চলটি নাম হয় ‘বালিডাঙা,’ তারপর সেই নাম পাল্টে গিয়ে ‘বেলেডাঙা’ হয়। সেটা থেকে এখন মানুষের মুখে হয়ে গেছে ‘বেলডাঙা’।
দেশভাগের পর অবধি বেলডাঙা ছিল কাশিমবাজারের (বড়ো) রাজাদের জমিদারিতে। ১৯ শতকে বেলডাঙা অঞ্চলে ব্রিটিশ এল লায়েন অ্যান্ড কোম্পানি এখানকার সুজাপুর গ্রামে তৈরি করে নীলকুঠি। বেলডাঙা ছাড়াও সেই নীলকুঠিতে ভাগীরথীর পশ্চিমে কামনগর আর চৌরিগাছা থেকেও নীল আসত। এর সঙ্গে রেশম চাষের ওপর ভিত্তি করে রেশমকুঠিও তৈরি হয় এখানে। রেশমের ব্যবসাকে কেন্দ্র করে সমৃদ্ধ হতে থাকে এখানকার অর্থনীতি। ১৯০৫ সালে রানাঘাট-লালগোলা রেল লাইনের সম্প্রসারণ ঘটলে বেলডাঙার প্রাচুর্য আরও বাড়তে থাকে। দেবকুণ্ডু, ভাবতা, মির্জাপুর মোল্লা পরিবারের মতো বেশ কিছু ধনী পরিবারের উত্থান ঘটে এর সুযোগে। স্টেশনের পাশে বেলডাঙায় একটা চামড়া ট্যানারি কারখানা তৈরি হয়েছিল, সেটা পরে হয়ে যায় চিনি মিল। যদিও দেশভাগের সময় সে চিনিমিল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তা সত্ত্বেও স্থানীয় অর্থনীতিতে সেই মিল একটা সময় যথেষ্ট অবদান রেখেছে। গরু, ছাগল, চামড়ার পুরোনো হাটেও প্রচুর ব্যবসা হত। বেলডাঙার উত্তরে ১৮৯৭ সালে স্বামী বিবেকানন্দের গুরুভাই স্বামী অখণ্ডানন্দ প্রতিষ্ঠা করেন রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রম। এর পাশাপাশি বিখ্যাত দেবী ডুমনি মায়ের মন্দির, বিন্দুবাসিনীতলা, আদমগাদম রয়েছে বেলডাঙা শহরের আশেপাশে গ্রামগুলোতে।
তথ্যসূত্র – মুর্শিদাবাদ জেলা গেজেটিয়ার (২০০৩); মুর্শিদাবাদের ইতিবৃত্ত ১ম খণ্ড (অতিপ্রাচীন পর্ব), অরূপ চন্দ্র(সম্পাদিত); মুর্শিদাবাদের নদী-নালা-খাল-বিল, কমল বন্দ্যোপাধায়; বেলডাঙার অতীত ও বর্তমান, দীননাথ মণ্ডল।