বরানগরের নামে লুকিয়ে বিক্রমাদিত্যের রাজসভার গল্প

“অতীতে মহাপ্রভু বরানগরেই
নিজের পাদুকাখানি রাখলেন যেই
ধন্য ধন্য বলি উঠিলেন রঘু
এমন দৃশ্য কেউ ভুলবে কি কভু?
বারুণীর দিন সেই শুভাগম তিথি
মহাপ্রভুতে লীন হইবার রীতি”।।
এক অজানা ছড়াকার এই ছড়াটি বেঁধেছিলেন। বরানগরের কথা রয়েছে ছড়াটায়, আছে চৈতন্যদেবের কথা। বোঝা যাচ্ছে, রঘু নামের কারো বাড়িতে গিয়েছিলেন চৈতন্যদেব। বরানগরের ইতিহাস যে কত পুরোনো, তা মালুম হচ্ছে এই ছড়াটা থেকেই। যতদূর জানা যায়, ১৫১১ সালে চৈতন্যদেব পা রেখেছিলেন বরানগরের মালিপাড়ায়, রঘুনাথ উপাধ্যায়ের বাড়িতে। সেই বাড়িতে এখন রয়েছে পাঠবাড়ি আশ্রম। তিন দিন সেখানে থেকে চৈতন্যদেব রঘুনাথের ওপর এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে তাঁর খড়ম জোড়া দিয়ে যান রঘুনাথকে। পাঠবাড়ি আশ্রমে সেই খড়ম এখনও দেখতে পাওয়া যায়। রঘুনাথের ভগবত পাঠ চৈতন্যদেবের খুব পছন্দ হয়েছিল। তাই রঘুনাথকে তিনি ‘ভগবতাচার্য’ উপাধি দেন। বরানগরের মোটামুটি পাঁচশো বছরের ইতিহাসে এরকম অনেক মণিমুক্তো ছড়ানো আছে। চৈতন্যদেব থেকে রামকৃষ্ণ, রবীন্দ্রনাথ থেকে স্বামী বিবেকানন্দ, সুভাষচন্দ্র বসু, শশীপদ বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, শিশির ভাদুরী থেকে হালের সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় – নানা ধরনের কর্মবীর এই জায়গার স্মৃতিতে জায়গা করে নিয়েছেন। প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশের উদ্যোগে তৈরি ভারতের প্রথম সংখ্যাতত্ত্ব গবেষণার প্রতিষ্ঠান ‘ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইন্সটিটিউট’ এখানেই রয়েছে।
কলকাতার উত্তরে গঙ্গার তীরের এই জনপদের নাম কীভাবে ‘বরানগর’ হল, তা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। কেউ কেউ দাবি করেন, খুব প্রাচীন কালে এখানে ‘বরাহ’ নামের এক মুনি থাকতেন। তাঁর নাম অনুসারেই জায়গাটার নাম হয় ‘বরাহনগর’, তারপর, ‘বরাহনগর’ থেকে আসে ‘বরানগর’। কিছু লোকের মতে, এই বরাহ মুনি আর কেউ নন, খোদ সম্রাট বিক্রমাদিত্যের সভায় নবরত্নের এক রত্ন – বরাহমিহির। আরেকটা ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘বরহা’ মানে ময়ূরের লেজ। কয়েকশো বছর আগে এই জনপদে ময়ূর এবং ময়ূরের লেজ বিকিকিনি হত। মনে করা হয় ‘বরহা’ শব্দটাই ‘বরানগর’ নামের উৎস। ঔপনিবেশিক যুগে এখানে বিশাল কসাইখানায় বছরে প্রায় ৩,০০০ শুয়োর জবাই করা হত বলেও শোনা যায়। তবে শুয়োর বা বরাহ থেকেই এই জায়গার নামকরণ হয়েছে কিনা তা স্পষ্ট নয়। যাই হোক, বাংলায় যখন একে একে ইউরোপীয় বণিকরা আসছিলেন ব্যবসা করতে, সবার প্রথমে পর্তুগিজরা নিজেদের কুঠি তৈরি করেন বরানগরে। ১৮৬২ সাল পর্যন্ত এখানে পর্তুগিজদের একটা প্রভাব ছিল। এর আগেই ওলন্দাজরা ১৬৫৮ সালে নিজেদের কুঠি তৈরি করে ফেলেছিলেন এখানে।
অর্থাৎ, বাংলায় ইউরোপীয় উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার আদিপর্বেও বরানগর একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। ডাচদের থেকে এই জায়গাটা একটা সময় ইংরেজদের হাতে চলে যায়। ইতিহাসবিদ অজিত সেনের মতানুসারে, ১৭৫৯ সালে চুঁচুড়া আর চন্দননগরের মাঝখানে বিদরার যুদ্ধে ইংরেজরা ডাচদের হারিয়ে দেন। সে বছর ২০ নভেম্বর ইংরেজ বাহিনী কর্নেল ফোর্ডের নেতৃত্বে বরানগরে ডাচ কুঠির দখল নেন। ১৭৬১ সালে দু’পক্ষের সন্ধির শর্ত অনুযায়ী বরানগর ইংরেজদের হাতে চলে যায়। এরপর আবার ডাচেরা বরানগর দখল করে। ১৭৮১ সালে আবার ইংরেজরা বরানগর ছিনিয়ে নেয়, ১৭৮৩ সালে আবার ফিরিয়ে দেয় ডাচদের, তারপর ১৭৯৫ সালে আবার দখল করে ইংরেজরা। এর মধ্যে কোনো একটা সময়ে আবার বরানগর ডাচদের হাতে চলে গেছিল। বার্ষিক ৬৫০০ টাকায় ডাচরা তাদের বাংলা আর ওড়িশার যাবতীয় উপনিবেশ তুলে দিয়েছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে ১৮১৪ সালে। ১৮১৭ সালে আবার বরানগর ডাচদের হাতে তুলে দেয় ইংরেজরা। ১৮২৫ সালে ডাচ বণিকরা পুরোপুরি ভারত ছাড়লে এখানে পাকাপাকিভাবে ব্রিটিশদের শাসন শুরু হয়। তার মানে একটা ব্যাপার বোঝা যাচ্ছে যে বরানগর ছিল তখনকার যুগে বাণিজ্যিক এবং অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট সমৃদ্ধ জায়গা। ব্যবসার জন্যই এখানে কুঠিঘাট তৈরি করা হয়েছিল গঙ্গার পাড়ে। সিরাজদৌল্লার সঙ্গে ইংরেজদের বিবাদের সময়েও বরানগর দু’পক্ষেরই একটা টানাপোড়েনের জায়গা হয়ে উঠেছিল।
১৮৬৯ সালে একটি পৌরসভা এলাকা হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল বরানগর। তখন উত্তর শহরতলি পৌরসভা অঞ্চল বলেই জায়গাটার পরিচয় ছিল। ১৮৮৯ সালে জায়গাটার নাম অফিসিয়ালি বরানগর রাখা হয়। এবছর বরানগর পৌরসভা তার পথ চলার ১৫০ বছর পূর্ণ করল। গত ১ এপ্রিল সেই উপলক্ষ্যে কালীতলার মাঠ থেকে প্রগতি সংঘের ময়দান পর্যন্ত এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার আয়োজন করেছিল বরানগর পৌরসভা। ২৪ আগস্ট বরানগরের প্রিয়কজন ক্লাবের পক্ষ থেকে মহিলা ফুটবল টুর্নামেন্টও হয়েছিল একই অনুষঙ্গে। গোটা বছর ধরেই এই সার্ধশতবর্ষকে উদযাপন করবেন বরানগরবাসী।
তথ্যসূত্র –
১) বরানগর পৌরসভা
২) সায়ন্তনকথা
৩) অন্যকথা (ব্লগ)
৪) বরানগর একটি প্রাচীন জনপদ (ফেসবুক পেজ)
৫) নবদিন
৬) Baranagar : History & News
ছবি সূত্র –
১) বরানগর পৌরসভা
২) ভারতীয় রেল
৩) ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইন্সটিটিউট