ইতিহাসের আর্মানি ঘাট: কলকাতা যেন আজও শোনে প্রাচীন গির্জার ঘণ্টা

দেখতে দেখতে শহরের বয়স কম হল না। শৈশব যৌবন পেরিয়ে এ তার প্রৌঢ়দশা। বার্ধক্যও হতে পারে। তবে বার্ধক্য বলতে নিজেদেরই বাধে। কলকাতার (kolkata) গল্প ঠিক কোথা থেকে শুরু করা যায়? নদীর গল্প দিয়ে? রাস্তা? কোনো জাতি-গোষ্ঠী? নাকি এই সমস্ত কিছুই? নদীপথে কলকাতায় এসেছিল ভিনদেশি মানুষ। এসে বসতবাটি, পথনির্মাণ কত-কীই না করলে। সেইসব নিয়েই তো এককালের গ্রাম ফুলেফেঁপে উঠল শহরে। শুরু যদি করতেই হয়, তবে সেই ভিনদেশি মানুষদের কথা দিয়েই হোক।
নাম তাদের আর্মানি। ভারতবর্ষে সময়ের পর সময়ের সাঁকো পেরিয়ে তারা কেবলি এসেছে। এসেছিল বাণিজ্য করতেই। তারপর রয়ে গেছে। স্মৃতি হিসেবে না। জলজ্যান্ত বাস্তব হয়ে। বিশ্বাস না হলে, নদী ধরে বা সড়কপথে চলে যাও বড়োবাজারকে পুবে রেখে মল্লিকঘাটে। সেখান থেকে স্ট্র্যাইন্ড রোড ধরে আরেকটু এগোও। মনে মনে ভেবে নাও, তখনও সেতুতে বাঁধা পড়েনি স্রোতবতী গঙ্গা। হাওড়া (Howrah) পারাপারের জন্যে ফেরিঘাটের স্থান। যাকে বলা হত স্টিমফেরি। এরই দক্ষিণ পাশে আর্মেনিয়ান ঘাট (Armenian Ghat)। এই অঞ্চল থেকে ১৮৭৩ সালে প্রথম ট্রাম চলা শুরু করে। ঘোড়ায় টানা ট্রাম শিয়ালদহ- ডালহৌসি-কাস্টমস হাউজ হয়ে ভিড়ত আর্মেনিয়ান ঘাটে।
“ঘাটের কাছে গল্প বলে নদীর জল...”
কোন সে গল্প? কলকাতার ‘দাদামশাই’দের গল্প। যে গল্প। এক-যে ছিল রাজাদের আমলের যারা। সমস্ত যেন আজও জানে। আর্মেনিয়ান ঘাট তৈরি করেছিলেন একজন বিত্তবান আর্মানি। নাম ম্যানুয়েল হাজারমালিয়াঁ। এই ঘাটের পাশ থেকে স্টিমার ছেড়ে, পৌঁছে দিত তমলুক কোলাঘাট ঘাটাল (Ghatal)। এখন অবশ্য সেসবের চিহ্ন নেই। এই ঘাটটির পাশে একসময় ছিল বিবি রসের ঘাট। প্রাচীন কলকাতার মানচিত্রে এই ঘাটের কথা মেলে। কিন্তু তার হালহকিকত খুব একটা জানা যায় না। আর্মানি ঘাটের কাছে পায়ে-হাঁটা পথে পৌঁছে যাওয়া যায় গির্জায়। যে গির্জার কথা রূপকথার মতো সবাই পড়ে চলে সহজপাঠে। সেখানে আজও শায়িত আর্মেনিয়ান বণিক সুকিয়াসের স্ত্রী রেজাবিবি। সেই ১৬৩২ সাল থেকে৷ তাহলে কি তাঁর নামাঙ্কিতই ঘাট ছিল কোনো? এই ঘাটের অপর পারেই কি ছিল আর্মানিদের সুরম্য বাগান-ঘেরা অনুপম সব দালানকোঠা।
বিবি রসের ঘাটের পারে নাকি একদা ছিল ব্যারেটো ঘাট৷ পর্তুগিজ মহাজন ব্যবসায়ী জোসেফ ব্যারেটোর নামাঙ্কিত। তাঁর নাকি ব্যাংক ও বসতবাড়ি ছিল ম্যাংগো লেনে। স্ট্র্যা ন্ড রোড তৈরির সময় সে ঘাট লুপ্ত হয়ে যায়। আর্মেনিয়ান ঘাট পেরিয়ে মতিলাল শীলের ঘাট। সেখানে করিনথিয়ান রীতির স্তম্ভ ঘেরা কাঠামোটি আজও রয়ে গেছে ঠিকই। তবে এই ঘাটটি আর মতিলাল শীল ঘাট (Motilal sheel Ghat) নামে কেউ চেনে না। চেনে আর্মেনিয়ান ঘাট হিসেবেই।
মতিলাল শীলের ঘাট
কলকাতা (Kolkata) শহরের রক্তে মিশে আছে আর্মানিদের অস্তিত্ব। শুধু কলকাতাই বা কেন, এদেশে মুঘল বা ইংরেজ- সবার সঙ্গেই তার বন্ধুতা। শোনা যায়, ঔরঙ্গজেব নাকি খুবই তুষ্ট ছিলেন আর্মেনিয়ানদের প্রতি। মুর্শিদাবাদের (Murshidabad) কাছে সৈয়দাবাদে বসবাসের ছাড়পত্র মিলেছিল আর্মানিদের। শুধু তাই নয়, মুঘল সম্রাট তাদের বাণিজ্য বাবদ খাজনা ৫% থেকে কমিয়ে করেছিলেন ৩.৫%।
আবার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির (East India Company) সঙ্গে ১৬৮৮ সালে একটি চুক্তি হয় খোজা সারহাদ ও খোজা ফানুস নামের দুই আর্মানির। সেই চুক্তি অনুযায়ী তৈরি হয় কাঠের গির্জা। আজকের আর্মানি গির্জার জায়গাতেই। আগুনে তা পুড়ে গিয়েছিল ঠিকই৷ কিন্তু সেই পুরোনো আদলটি নাকি আজও লেগে আছে গির্জার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে। পরবর্তীকালে এই গির্জার বাইরের অংশ মেরামত ও সাজসজ্জার খরচ দিয়েছিলেন ধনী ব্যবসায়ী আরাথুন স্টিফেন। কলকাতার গ্র্যাবন্ড হোটেলের প্রতিষ্ঠাতা ও মালিক।
এভাবেই কলকাতার রন্ধ্রে মিশে আছে আর্মানি অস্তিত্ব। গির্জা বা হোটেল তো বটেই। সুপ্রাচীন ঘাটে আজও যখন নদীর জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে বয়ে চলে, তখন সেই স্মৃতিকথাই বাহিত হয় কি...?
সূত্র: ‘কীর্তিবাস কলকাতা’ - তারাপদ সাঁতরা